Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:০৩

বন্ডের ভয়ঙ্কর অনিয়মে মেঘনা গ্রুপ

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে গ্রুপের ছয় কোম্পানি, দুটির অনিয়ম প্রায় ১৪ কোটি টাকা, ধরাছোঁয়ার বাইরে চার কোম্পানি, সিমেন্টশিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা

রুহুল আমিন রাসেল

বন্ডের ভয়ঙ্কর অনিয়মে মেঘনা গ্রুপ
প্রতীকী ছবি

শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আড়ালে ভয়ঙ্কর অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে মেঘনা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ছয় কোম্পানি বন্ড লাইসেন্স নিয়ে ফ্রিস্টাইলে চালাচ্ছে তাদের কর্মকান্ড । অন্যদিকে দুই কোম্পানির ১৪ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম ধরেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে এই গ্রুপের চার কোম্পানি। এ ছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে দেশের বিকাশমান সিমেন্টশিল্প ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে কাস্টমস। ফলে নামমাত্র অডিটেই খালাস পেয়েছে এই গ্রুপের আওতাধীন ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানিয়েছে, মেঘনা গ্রুপের ছয়টি কোম্পানির বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেডের ৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস। এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে আরও ৪ কোটি ১০ লাখ ২ হাজার ৪৯৮ টাকা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল একই কোম্পানির বিরুদ্ধে। মেঘনা গ্রুপের আরেক বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান তানভির ফুড লিমিটেডে অডিট করে ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৪ টাকার অনিয়ম পেয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম পাওয়া গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে মেঘনা গ্রুপের বন্ড লাইসেন্সধারী অন্য চার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সিমেন্টশিল্প খাতের একমাত্র বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অডিট চলতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি সম্পন্ন হয়। তবে মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে অনিয়ম উদ্্ঘাটন না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে অডিট থেকে খালাস দিতে বাধ্য হয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অডিট হয় না মেঘনা গ্রুপের দুই বন্ড লাইসেন্সধারী কোম্পানি ইউনাইটেড ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মেঘনা শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ড লিমিটেডের। ফলে কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি সহজেই আড়াল করতে সক্ষম হচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। আরেক বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান তানভির পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট এর অডিট সম্পন্ন হয়। তবে মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে কোনো অনিয়ম শনাক্ত না করেই তানভির পলিমারকে খালাস দেওয়া হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানির পর পরিশোধন করে ‘ফ্রেশ সুগার’ নামে প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করে থাকে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এই প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণের আড়ালে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের অপব্যবহার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি শুল্ক ফাঁকি দিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করেছে। এ বিষয়ে চলতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি এনবিআরে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১০ কোটি টাকার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের জন্য মজুদ করে রাখা হয়েছে, যার প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস। এর মধ্যে শুল্ককর প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ মেঘনাঘাটে অবস্থিত ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় শিল্পের বিকাশে প্রণোদনা প্রদানের অংশ হিসেবে ২০০৭ সালে ইউনাইটেড সুগারকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। বন্ড সুবিধায় একসঙ্গে কাঁচামাল এনে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড কমিশনারেটের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে তা পরিশোধন করার কথা। ওই সময় শর্ত দেওয়া হয়, শুল্ককর পরিশোধ করে তবেই এসব কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি শর্ত না মেনে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করে আসছিল। এ অভিযোগে ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনের পর বন্ডেড ওয়্যারহাউসে বন্ড রেজিস্টার অপেক্ষা ২ হাজার ৫৬৫ টন কাঁচামাল বেশি পাওয়া যায়। শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে অপসারণের জন্য এসব কাঁচামাল মজুদ করা হয়। এসব কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যার ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রিভেনটিভ টিম এ নিয়ে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে কাঁচামাল অপসারণ করছে কি না তা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়। শুল্ককর পরিশোধ ও কাঁচামাল মজুদ বিষয়ে বন্ড কমিশনারেট থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। জানা গেছে, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ছয়টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ১৪ হাজার ৫৭৭ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। ৮ ডিসেম্বর বন্ড কমিশনারেট থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ অর্ডার) নিয়ে কাঁচামাল অপসারণ শুরু হয়। এর মধ্যে প্রিভেনটিভ টিম বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিদর্শন করে দেখতে পায়, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড শুল্ককর ফাঁকি দিতে অবৈধভাবে কাঁচামাল মজুদ করেছে। পরে এ নিয়ে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা বন্ড কমিশনারেট ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেডকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদ- প্রদান করে। এ অর্থদ- প্রযোজ্য শুল্ককরের অতিরিক্ত হিসেবে পরিশোধ করার কথা বলা হয়। ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড একই কায়দায় আরও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে কি না এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির বন্ডিং কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাজারে বিশৃঙ্খলা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ভুল বুঝিয়ে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। ভোগ্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের হোতা মেঘনা গ্রুপ বন্ড সুবিধাকে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। ফলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা ও বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের নামে দেশি ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা কোনো বিশেষ মহল পেলে বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহকে দেশি ভোগ্যপণ্য (হোম কনজাম্পশন) উৎপাদনের জন্য বন্ড লাইসেন্স প্রদানের তাগিদ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে ২০ জুন পত্র প্রেরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১ মো. জিয়াউল হক। তার স্বাক্ষর করা পত্রে বলা হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চলের যে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভোগের জন্য দেশি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স গ্রহণ করে শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে।

এদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানসমূহকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড লাইসেন্স প্রদানের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের বন্ড সুবিধায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে। আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে একটি গোষ্ঠী বিদেশে অর্থ পাচার করতে পারে। এতে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে বেকায়দায় ফেলতে একটি বিশেষ মহল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অন্যান্য সরকারি দফতরকে ভুল বুঝিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির নীল নকশা করছে। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সিনিয়র সহ-সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত, ভোগ্যপণ্যের বাজার একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে বিশৃঙ্খলা কারও কাম্য নয়। আশা করছি এনবিআর অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সবকিছু পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশীয় বাজারের জন্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা প্রদানের প্রয়োজন নেই। এতে ব্যবসায় অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এখানে সমতা অবশ্যই দরকার। এটা না হলে ভোগ্যপণ্যের বাজার মনোপলি বা একচেটিয়া হয়ে যাবে।


আপনার মন্তব্য