শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ মার্চ, ২০২১ ২৩:৩৩

সিদ্ধিরগঞ্জে মাদরাসাছাত্রকে হত্যার অভিযোগে শিক্ষক সহপাঠীসহ গ্রেফতার ৭

নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় এক মাদরাসাছাত্রকে হত্যার অভিযোগে মাদরাসার শিক্ষক ও সহপাঠীসহ সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে রসুলবাগ মাঝিপাড়া এলাকার রওজাতুল উলুম মাদরাসা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। নিহত মাদরাসা ছাত্র হচ্ছে রূপগঞ্জ উপজেলার শান্তিনগর এলাকার জামাল হোসেনের ছেলে সাব্বির হোসেন (১৪)। সে রওজাতুল উলুম মাদরাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র। গ্রেফতাররা হলেন মাদরাসার শিক্ষক শওকত হোসেন সুমন (২৬), জোবায়ের আহম্মেদ (২৬) ও আবদুল আজিজ (৪২)। এ ছাড়া চারজন সহপাঠী।

এর আগে সকালে ভুক্তভোগী ছাত্রের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। পরিবারের দাবি, ‘হত্যার পর আত্মহত্যা বলে এবং মাদরাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন আওয়ামী লীগ নেতা বলে পরিচয় দিয়ে তাদের ভয় দেখানো হয়েছে।’

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এ এস এম শাহীন বলেন, ‘রওজাতুল উলুম মাদরাসায় আবাসিকভাবে থেকে পড়ালেখা করত সাব্বির হোসেন। ১০ মার্চ বেলা ১১টার দিকে মাদরাসার শিক্ষক জোবায়ের নিহতের পরিবারকে জানান, সাব্বির মাদরাসার ছাদে ওঠার সিঁড়ির পাশে ফাঁকা রডের সঙ্গে গলায় গামছা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, তার লাশ নিয়ে যান। নিহতের পরিবার লাশ নিতে এলে তাদের ভয় দেখানো হয়, থানায় অভিযোগ দিয়ে কিছু হবে না। পরে স্বজনরা পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ না দিয়ে মাদরাসা থেকে লাশ নিয়ে রূপগঞ্জে নিজ এলাকায় দাফন করেন। কিন্তু দাফনের আগে গোসলের সময় নিহতের শরীরে একাধিক স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এ অবস্থায় শুক্রবার থানায় এসে অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। তিনি জানান, মামলার পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজন মাদরাসার শিক্ষক ও চারজন সহপাঠীকে আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘অভিযোগ করেছে মারধর করে হত্যা করে আত্মহত্যার নাম দিয়েছে। ময়নাতদন্তের পরই বলা যাবে এটা হত্যা না আত্মহত্যা। এখন কবর থেকে লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আপিল করা হবে। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদে অসম্পূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তাই তিন শিক্ষককে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। আর চার সহপাঠী কিশোর হওয়ায় তাদের আদালতে কিশোর আইনে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে, বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’ নিহত সাব্বির হোসেনের বাবা জামাল হোসেন বলেন, ‘১০ মার্চ সকাল সোয়া ৯টায় আমার ছেলে মাদরাসার শিক্ষক জোবায়েরের মোবাইল ফোন থেকে তার মার সঙ্গে কথা বলে। ওই সময় সে সুস্থ ছিল। তার মাকে বিভিন্ন বিষয়ে বলেছে। শুক্রবার মাকে মাদরাসায় যেতে বলে। এর ঠিক এক ঘণ্টা পর মাদরাসার শিক্ষক জোবায়ের ফোন দিয়ে বলেন, সাব্বির ফোন করে আপনাদের কী বলেছে। ওর মা বলেন, ভর্তির অফারের বিষয় আর শুক্রবার মাদরাসায় যাওয়ার জন্য বলেছে। এ কথা শুনে শিক্ষক জোবায়ের ফোন রেখে দেন। পরে আবার সাড়ে ১১টার দিকে ফোন দিয়ে ওর মাকে বলেন, সাব্বির আত্মহত্যা করেছে, দ্রুত আপনারা মাদ্রাসায় আসেন।’ তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দ্রুত মাদ্রাসায় যাই। সেখানে যাওয়ার পর আমার সন্তানের লাশ আমাদের দেখতে দেওয়া হয়নি। তার আগে (মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি) আমাদের একটি আলাদা রুমে নিয়ে বসিয়ে বলে আগে কথা শোনেন পরে লাশ পাবেন। তখন তারা বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি। তোমরা যদি নিজের ছেলের লাশ নিয়ে যেতে চাও এবং নিজেরা ফাঁসতে না চাও চুপ করে লাশ নিয়ে যাও। কারণ আমি আওয়ামী লীগের সভাপতি আমার কিছু হবে না। এ এলাকার লোকজন আমার হুকুমে ওঠে বসে। থানায় মামলা করে কোনো লাভ হবে না। শুধু শুধু টাকা-পয়সা খরচ হবে। কারণ আমি যা বলব সেটাই হবে। তোমরা লাশ গোপনে নিয়ে যাও আর গোপনে মাটি দিয়ে দাও। এমন কোনো কিছু করবা না যাতে এ মাদরাসার ক্ষতি বা বদনাম হয়।’ তাদের হুমকিতে আমি ও আমার স্ত্রী ভয় পেয়ে যাই। পরে আমার বড় মেয়ে ও তার স্বামী মাদরাসায় গেলে মাদরাসার শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি আমাদেরকে বকাঝকা করেন। বলেন, ‘তোদের নিষেধ করেছিলাম আত্মীয়স্বজন কাউকে আনতে। এরপর আমরা তাদের কথায় রাজি হই যে, কোনো অভিযোগ করব না। এরপর তারা লাশ দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘লাশ এনে বাড়িতে গোসল করানোর সময় আমরা মহল্লাবাসীসহ সবাই দেখতে পাই সাব্বিরের মাথায়, চোখের উপরে, কপালে, ঠোঁটে ও দাড়ির নিচে, গলায় আঘাতের চিহ্ন। আর পায়ে মারধরের চিহ্ন। শরীরটা থেঁতলানো। তখন এলাকাবাসী বলতে থাকেন এটা আত্মহত্যা না, সাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে। আমার মনে হয় মারধরে আমার ছেলে বাথরুম করে দেয়। তখন তাকে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয়। কারণ তার শরীরে মলমূত্র লেগে ছিল। তারা আমার ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে হত্যা করেছে। ত্রিপল রশি গলায় বেঁধে মারা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

রওজাতুল উলুম মাদরাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি হচ্ছেন সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার স্ত্রী পরিচয়ে একজন বলেন, ‘তিনি এখন ঘুমিয়ে আছেন। ডাক দেওয়া যাবে না। পরে ফোন দিয়েন। এই বলে ফোন রেখে দেন। পরে আবারও ফোন দেওয়া হলে মহিউদ্দিনের ছেলের বউ (নাম না বলে) পরিচয়ে ফোন ধরে একই কথা বলে ফোন রেখে দেন।’

এই বিভাগের আরও খবর