২০০৯ সালে প্রতিমন্ত্রী থাকার পর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ বিনা ভোটে ক্ষমতা দখল করলে জাহাঙ্গীর কবির নানককে আর মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। ধারণা করা হয়, শেখ হাসিনা তার ব্যাপক সীমাহীন দুর্নীতির খবর জেনেছিলেন। এ কারণেই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হলেও জাহাঙ্গীর কবির নানক বিনা ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মন্ত্রী না হলে কী হবে, এমপি হিসেবে তিনি শুরু করেন ব্যাপক লুটপাট এবং ভূমি দখল। এ সময় জাহাঙ্গীর কবির নানক মোহাম্মদপুরের দিকে নজর দেন। দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত করেন নিজ নির্বাচনি এলাকাকে। মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন বাড়িঘর, জমিজমা দখলের দিকে মনোনিবেশ করেন। একের পর এক জমি দখল করতে থাকেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। আর এ সময় তার সহায়তাকারী হিসেবে আসেন আরেক আওয়ামী লীগের এমপি প্রয়াত আসলামুল হক। আসলামুল হক মূলত জমির দালালি ব্যবসা করতেন। সেই সূত্রে তিনি কোথায়, কোন জমি বিতর্কিত, কোথায় খাস জমি আছে কিংবা কোন জমির মালিকের অবস্থা দুর্বল ইত্যাদি তথ্যগুলো জাহাঙ্গীর কবির নানককে দিতেন। জাহাঙ্গীর কবির নানক সেই অনুযায়ী তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এসব জমিজমা এবং সম্পদ দখল করতেন। উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগের একমাত্র নেতা, যিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের পর্যায়ক্রমে নেতা হয়েছিলেন। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পর তিনি যুবলীগের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার সময় তিনি তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এ সময় নানকের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্রাট, খালেদসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যুবলীগের ছায়াতলে আসেন। জাহাঙ্গীর কবির নানক ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হরতাল, আন্দোলন ইত্যাদিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন। বিভিন্ন বাসে গানপাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে ফেলা এবং নারকীয়ভাবে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। বিশেষ করে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর বিএনপির ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন লগি-বৈঠা আন্দোলনের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। সেদিন সাপের মতো জামায়াতের লোকজনকে পেটানো হয়। এখান থেকেই নানক সন্ত্রাসীদের গডফাদার হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তার সেই অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগান দ্বিতীয় দফায় এমপি হয়ে। এ সময় তিনি মন্ত্রণালয় কর্তৃক নয়, বরং এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস শুরু করেন। শুরু করেন ভূমি দখল, চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন। মোহাম্মদপুরের অন্যতম একটি এলাকা জেনেভা ক্যাম্প। জেনেভা ক্যাম্প হলো মাদক এবং অবৈধ অস্ত্রের অভয়ারণ্য। এখানে নানারকম মাদক কেনাবেচা যেমন হতো, তেমনি অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার জায়গা। ২০১৪ সালের পর অল্প সময়ের মধ্যে নানক মোহাম্মদপুর এলাকার জেনেভা ক্যাম্প তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। জেনেভা ক্যাম্পের সব মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ আসে তার হাতে। এ সময় নানকের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী জেনেভা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ২০১৫ সালে মাদক এবং অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে নানকের ক্যাডারদের সঙ্গে জেনেভা ক্যাম্পবাসীর বিরোধ সৃষ্টি হয়। এখানে সহিংসতার ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়। সেই বিরোধে জাহাঙ্গীর কবির নানক পুলিশের সহায়তা নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এখানে মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান ব্যবসার মাসোহারা যেত নানকের পকেটে। নানকের দ্বিতীয় মনোযোগ ছিল বসিলা এলাকা। মোহাম্মদপুর পেরিয়ে বসিলার অনেক বিরান জমিজমা। যেখানে নিরীহ মানুষেরা বসবাস করতেন। বেশির ভাগ জমিই খালি পরে থাকতঅ সেই জমি জাহাঙ্গীর কবির নানক একে একে দখল করতে থাকেন। যেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, এসব দখলের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেয়েছে তাকেই গুম করা হয়েছে অথবা বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীর কবির নানকের এই আগ্রাসি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকাবাসী এক ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে থাকতেন সব সময়। পুরো মোহাম্মদপুর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে জমি নিয়ে কিছু বিরোধ আছে, যেখানে জমি নিয়ে কিছু দুর্বলতা আছে সেখানেই জাহাঙ্গীর কবির নানকের কালো থাবা পড়ত। এ সময় গোটা মোহাম্মদপুরে ভূমি দখলদার হিসেবে আবির্ভূত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক। একের পর এক জমি দখল, বাড়ি দখল করে নানক এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এর ফলে নানক হয়ে ওঠেন এলাকার অঘোষিত গডফাদার। শুধু জমি দখল নয়, নানকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হয় বাজার দখল কার্যক্রম। যেখানেই নানক দেখেছেন বিভিন্ন রকম কাঁচা বাজার বা বড় বাজার বসেছে, সেই বাজারগুলোর দিকে নানকের নজর পড়ে। এ বাজারগুলো দখল করার জন্য নানক একের পর এক ক্যাডার বাহিনী নিয়োগ দেন। শুধু তাই নয়, মোহাম্মদপুর তার নির্বাচনি এলাকায় এ সময় যে কোনো উন্নয়ন কাজ হলে বাড়িঘর নির্মাণ বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ, দোকানপাট নির্মাণ হলে নানককে কমিশন দিতে হতো। নানক পুরো মোহাম্মদপুরে একটা বিকল্প সরকারব্যবস্থা কায়েম করেন, যেখানে তাকে টাকা না দিয়ে কোনো নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব ছিল না। প্রথম দিকে এ নিয়ে লোকজন আপত্তি করলে পরবর্তীতে দেখা যায় যে পুলিশ নানকের পক্ষে কাজ করেন। ফলে সাধারণ মানুষও প্রতিবাদহীন, অসহায় হয়ে পড়েন।
মোহাম্মদপুর এলাকা যে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছিল সেটি মূলত জাহাঙ্গীর কবির নানকের জন্যই। এর মাধ্যমে জাহাঙ্গীর কবির নানক পুরো এলাকার কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। নানক তার সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য একটি ক্যাডার বাহিনী করে ছিলেন। মোহাম্মদপুরের অন্তত পাঁচটি এলাকায় তৈরি করেছিলেন টর্চার সেল। যারাই নানকের বিরোধিতা করত, প্রতিবাদ করার চেষ্টা করত তাদের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো এবং নির্যাতন করা হতো। এ সময় নানকের বিরুদ্ধে কেউ টুঁশব্দ করা মানেই ছিল টর্চার সেলে নির্যাতন ভোগ। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানক মোহাম্মদপুর এলাকা, বসিলা এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘা জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন। এ জমিগুলোর ব্যাপারে তিনি দুটি কাজ করতেন। প্রথমত, এ জমিগুলোর কিছুটা তিনি আসলামুল হক এবং অন্যদের কাছে বিক্রি করে দিতেন। ভূমি পাওয়ার পর বিনিময়ে আসলামুল হক বাজারমূল্য দিতেন জাহাঙ্গীর কবির নানককে। দ্বিতীয়ত, তিনি কিছু কিছু জমি তার নিজস্ব ক্যাডারদের দিতেন। সেই ক্যাডারদের কাছ থেকেও তিনি অর্থ আদায় করতেন। এভাবেই জাহাঙ্গীর কবির নানক পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে যান। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানক শুধু মোহাম্মদপুর এলাকায় ২৮টি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে। এসব ফ্ল্যাট থেকে ভাড়া আহরণ করা এবং ফ্ল্যাটগুলো কেনার পর আবার অন্যজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার মাধ্যমে নানক অর্থ উপার্জনের নিত্যনতুন কলাকৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। জাহাঙ্গীর কবির নানকের পাঁচ বছরের রাজত্বে মোহাম্মদপুরবাসীর দম বন্ধ হয়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, এ সময় জাহাঙ্গীর কবির নানক মোহাম্মদপুরে নানারকম অপকর্মের মধ্যে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গিয়েছিলেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এ সাক্ষাতের সময় নানকের ক্যাডার বাহিনী ওই গাড়ির ওপর হামলা করে। নানকের নির্দেশে এ হামলা পরিচালিত হয়। লুণ্ঠন, দুর্বৃত্তায়ন, লুটপাট যেন শেখ হাসিনা ক্ষমা করে দেন সেজন্য শেখ হাসিনার প্রিয়ভাজন হতেই মার্শা বার্নিকাটের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। কিন্তু এ আক্রমণ পরিচালনা করে নানকের হিতে বিপরীত হয়। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপকভাবে। ফলে ২০১৮ সালে নির্বাচনে নানক আর মনোনয়ন পাননি। কিন্তু পাঁচ বছরে তিনি মোহাম্মদপুরে যে অত্যাচার, নিপীড়ন, ভূমি দখল, বাজার দখল, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তা এলাকার মানুষ এখনো ভুলতে পারে না।