শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মার্চ, ২০২১ ২১:৩৮

আবার প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হোক

অনুপম হায়াৎ

আবার প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হোক
সিনেমা হল হচ্ছে সিনেমা নামক কারখানাজাত বিনোদন পণ্যের বাজার। দর্শক অর্থের বিনিময়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন। আর তাদের থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রদর্শক-পরিবেশক হয়ে প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে ফেরত আসে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৯ বিতরণকালে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানার মতো চলচ্চিত্র তৈরির আহ্বান জানান প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পী-কুশলীদের প্রতি। সেই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, চলচ্চিত্র দিনে দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রেক্ষাগৃহ উন্নয়নের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা দেন। এ তহবিল থেকে অল্প সুদে টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সিনেমা হল বা সিনেপ্লেক্স বানাতে পারবেন।

চলচ্চিত্রবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপলব্ধি ও ঘোষণা যেমন গঠনমূলক, সময়োপযোগী তেমনি এর প্রভাব ও বিস্তার একেবারে শিকড়কেন্দ্রিক। কেননা সিনেমা হল ছাড়া সিনেমা বাঁচে না। সিনেমা হল হচ্ছে সিনেমা নামক কারখানাজাত বিনোদন পণ্যের বাজার। দর্শক অর্থের বিনিময়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন। আর তাদের থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রদর্শক-পরিবেশক হয়ে প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে ফেরত আসে। প্রযোজকরা তখন সে অর্থ দিয়ে নতুন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এভাবে ‘সাইক্লিক অর্ডারে’ চলচ্চিত্রের পুঁজিবাজার চলমান ও সক্রিয় থাকে। সুতরাং প্রেক্ষাগৃহ হচ্ছে চলচ্চিত্র পণ্য বাজারের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের স্থান। এখানে চলচ্চিত্র হিট হয়, সুপারহিট হয়; এখানে চলচ্চিত্রের রজতজয়ন্তী, সুবর্ণজয়ন্তী, হীরকজয়ন্তী পালিত হয়।

কিন্তু কোথায় সেই চলচ্চিত্র! আর কোথায় সেই প্রেক্ষাগৃহ বা সিনেমা হল! সারা দেশে যেখানে সিনেমা হল ছিল ১ হাজার ৪৫০টি, এখন তা কমতে কমতে ১৫০টির মতো আছে। আর সেই চলচ্চিত্রও নেই। কোথায় সেই ‘রাজধানীর বুকে’, ‘সুতরাং’, ‘চান্দা’, ‘রূপবান’, ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘ময়নামতি’ ইত্যাদি। অন্যদিকে হারিয়ে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে সেসব সিনেমা হল- রূপমহল, লায়ন, তাজমহল, গুলিস্তান, আশা, উল্লাসিনিসহ আরও কতশত হল।

২.

ইতিহাস সাক্ষী, একসময় ঢাকার তৈরি চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হয়ে চলত বিদেশি ছবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। মনে আছে সেই ‘রাজধানীর বুকে’র সেই গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’; অথবা হারানো দিনের ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’ কিংবা ‘সুতরাং’-এর নদী বাঁকা জানি, চাঁদ বাঁকা জানি বা রূপবানের ‘সাগর কূলের নাইয়ারে’- এসব ছবি ও গান প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে সারা দেশকে মাতিয়ে তুলেছিল। ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’ প্রেক্ষাগৃহের পর্দা জীবন মানসকে করে তুলেছিল শানিত। প্রেক্ষাগৃহ, দর্শক আর জনতা তখন এক হয়ে গিয়েছিল চলচ্চিত্রের বিষয় ও নির্মাণশৈলীর কারণে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘ওরা ১১ জন’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘সুজন সখী’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রেক্ষাগৃহে টেনেছিল দর্শকদের। এরপর আশির দশক থেকে চলচ্চিত্রে শনির দশা লাগে বিভিন্ন কারণে। এসবের মধ্যে ছিল প্রযোজক-পরিচালকদের স্বকীয়হীনতা, বিষয়বস্তুর পৌনঃপুনিকতা, নতুনত্বের অভাব, নির্মাণশৈলীর পঙ্গুত্ব, নকলের দৌরাত্ম্য এবং টিভি, ভিসিআর ও ডিশের সংক্রমণ। সেই সঙ্গে ছিল প্রেক্ষাগৃহের অসহনীয় পরিবেশ। সিনেমা স্থান করে নিল ঘরে ঘরে, পকেটে পকেটে, হাতে হাতে। দর্শকশূন্য হয়ে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ ক্রমে। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘মনপুরা’ হঠাৎ আবার ঝলকানির মতো প্রেক্ষাগৃহে উদয় হয় দর্শকধন্য হয়ে। এরপর বিধ্বস্ত-বিলোপ : কোথায় সেই শাবিস্তান, গুলিস্তান, রূপমহল, তাজমহল, ছায়াবাণী-চিত্রবাণী।

৩.

কিন্তু আমরা তবু আশাবাদী। একদিন সিনেমার এ কৃষ্ণসময় কেটে যাবে, নতুন নতুন প্রত্যাশা সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ আবার পূর্ণ হবে, পালিত হবে কোনো রজতজয়ন্তী, সুবর্ণজয়ন্তী, হীরকজয়ন্তী। সরকার তো নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। চলচ্চিত্রের উৎপাদন-নির্মাণ-শিক্ষা-সংগ্রহ-সংরক্ষণ-প্রদর্শনের জন্য অর্থের জোগান দিয়ে। প্রত্যাশা সিনেমার সুদিন, সিনেমা হলের সুদিন ফিরবে। আবার সাইনবোর্ড ঝুলবে : ‘প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ’।

 লেখক : ইতিহাসবিদ ও চলচ্চিত্র গবেষক।


আপনার মন্তব্য