দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ দশা, অবৈধ দখল আর নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটার সেই চেনা দৃশ্যপট এখন অতীত। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সামনের ফুটপাত এখন সেজেছে এক রাজকীয় সাজে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিশেষ উদ্যোগে এ এলাকাটি এখন আর কেবল পথচারীদের পারাপারের পথ নয়, বরং পরিণত হয়েছে এক টুকরো নান্দনিক উদ্যানে।
একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে চানখাঁরপুল পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ পথটি ছিল হকারদের দখলে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পথচারীদের যাতায়াত ছিল দুর্বিষহ। বিশেষ করে হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য এ পথটুকু পাড়ি দেওয়া ছিল রীতিমতো যুদ্ধের মতো।
তবে সাম্প্রতিক পাইলট প্রকল্পের আওতায় পাল্টে গেছে পুরো দৃশ্যপট। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ ফুট এলাকার দেয়ালে এখন শোভা পাচ্ছে বর্ণিল ও নান্দনিক গ্রাফিতি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ ফুটে উঠেছে শিল্পীদের নিপুণ তুলির আঁচড়ে। ১৫ এপ্রিল পরীক্ষামূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এ রাস্তায় শুধু চিত্রকর্ম নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুরো এলাকায় লাগানো হয়েছে ৬৫০টি সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে ৫৫০টি ফুলের টব। ধুলোবালির নগরীতে এই সবুজের ছোঁয়া পথচারীদের দিচ্ছে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ। হাসপাতালে আসা স্বজনদের বিশ্রামের কথা চিন্তা করে ফুটপাতে বসানো হয়েছে ৫০টি আধুনিক আসন। পাহাড়ের আদলে তৈরি করা হচ্ছে দুটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, যা পুরো এলাকাকে নান্দনিক রূপ দেবে। সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে বিশেষ ডাস্টবিন এবং বর্জ্যব্যবস্থাপনার আধুনিক সরঞ্জাম।
এই অভাবনীয় পরিবর্তনের বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘এটি আমাদের একটি পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্প।
আমরা দেখতে চেয়েছিলাম মানুষের সদিচ্ছা থাকলে একটি জনাকীর্ণ এলাকাকে কতটা স্বাস্থ্যকর করে তোলা সম্ভব। জনগণের ইতিবাচক মনোভাব ও সহযোগিতা পেলে পর্যায়ক্রমে ঢাকা দক্ষিণ সিটির অন্য ব্যস্ততম ফুটপাতগুলোকেও একইভাবে দখলমুক্ত করে নান্দনিক রূপ দেওয়া হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এ উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের মুখমণ্ডল। একটি দেশের রাজধানীর পরিবেশ দেখে পুরো দেশের শৃঙ্খলা বোঝা যায়। বিশেষ করে হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও তাদের স্বজনরা এমনিতেই মানসিক চাপে থাকেন। তাদের একটু মানসিক প্রশান্তি দিতেই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এ সৌন্দর্য ধরে রাখা কেবল সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব যাতে কেউ ফুল না ছেঁড়ে বা গ্রাফিতিতে কোনো দাগ না দেয়।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকালে অনেক শিক্ষার্থী ও পথচারী দাঁড়িয়ে গ্রাফিতি দেখছেন। কেউ কেউ ছবি তুলছেন। নিয়মিত এই পথে যাতায়াতকারী সাগর আলী নামের এক পথচারী বলেন, আগে এখান দিয়ে হাঁটার সময় দম বন্ধ হয়ে আসত। এখন দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে মন ভালো হয়ে যায়। ফুটপাতে বসার জায়গা হওয়ায় অনেক বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের সুবিধা হবে।