মহানবী (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী মাগফিরাতের দশক শেষ হয়ে নাজাতের দশকের আজ শুরু হলো। তিরমিজি শরিফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাতে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, রমজানের প্রথম রাত এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। তারপর কোনো দরজা বন্ধ করা হয় না। আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর কোনো দরজা খোলা হয় না। একজন ঘোষণা করেন, কে আছো নেক আমলের প্রত্যাশী? তুমি এগিয়ে এসো। আর কে আছো অন্যায় কাজের প্রত্যাশী? তুমি পিছু হট। আহা! মহামূল্যবান সময়গুলো তো শেষ হয়েই গেল। হে সিয়ামের সাধক একটু ভাবুন! কতটা নেক আমল করতে পেরেছেন? আর কতটা নিবৃত্ত হতে পেরেছেন পাপ থেকে? মুমিন জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, মুমিন অহেতুক সময় ব্যয় করেন না। তাই রমজানের শেষ এ সময়ে মণেপ্রাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয় আল্লাহর প্রেমে। যখন কোনো কিছুই করার সুযোগ থাকে না তখন মনে মনে জিকির করা যায়। কোরআন মজিদে আল্লাহর জিকিরকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। (সূরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫) যে কোনো কাজের সময় আল্লাহকে স্মরণ রাখাই হলো প্রকৃত জিকির। ইবাদতের সময় একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা ও তাঁর হুকুম পালন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য না রাখা। লেনদেন ও কায়কারবারে সততা, সাধুতা ও আমানতদারি বজায় রাখা আল্লাহর স্মরণেরই ফল। কর্মস্থলে কর্তব্যপরায়ণতা ও দায়িত্বশীলতাই আল্লাহর জিকির। কেননা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা ও হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার চেতনা থেকেই কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়। সামাজিক ক্রিয়াকলাপে ইনসাফ ও পাপহীনতা ইমানদারির আলামত। অতএব, এটাও আল্লাহর স্মরণের ফল। এ সবই আল্লাহর হুকুম ও রসুলের আদর্শ। তাই একজন ব্যবসায়ী যখন বিশ্বস্ততা ও সততা নিয়ে কারবার চালান, তখন তার অন্তরে আল্লাহর স্মরণ অবশ্যই জেগে থাকে। একজন চাকরিজীবী নিজ দায়িত্ব পালনে তখনই নিষ্ঠা ও সততা পালন করেন, যখন তিনি বান্দার হক নষ্টের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কথা স্মরণ রাখেন। তেমনি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা একজন বিচারক ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ওপরে উঠে এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে নীরবে রায় দিতে পারেন, যখন তিনি দুনিয়াবি প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণের জন্য আল্লাহর কাছে হিসাব দেওয়ার কথা স্মরণে রাখেন। এটাই তো আল্লাহর জিকির। আর জিকিরকারীদের অপরিসীম পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়েছেন আল্লাহর রসুল (সা.)। বিশেষ করে প্রতিকূল পরিবেশে যিনি আল্লাহর স্মরণে উদাসীন থাকেন না, তার মর্যাদা অনন্য। হাদিসে ইরশাদ করা হয়েছে, উদাসীনদের মাঝখানে একজন জিকিরকারীর মর্যাদা বাগানের মরা গাছগুলোর মাঝখানে একটি তাজা গাছের মতো। আল্লাহর নবী আরও ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো। এক সাহাবি আরজ করেন, হে আল্লাহর রসুল, ইসলামের বিধান তো অনেক। আমাকে সহজ একটি কাজের কথা বলে দিন, যা আমি সর্বদা করতে পারি। তিনি বললেন, তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর জিকিরে সজীব থাকে। এই জিকির বলতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আন্তরিক জিকির আরও মর্যাদার। আর তা হলো দুনিয়াবি কার্যকলাপের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ করা। প্রতিটি কাজে ও ক্ষেত্রে আল্লাহর যে নির্দেশ রয়েছে, তা অনুসরণ করাই আন্তরিক জিকির। মোটকথা, আল্লাহর স্মরণ যখন ইবাদত, কায়কারবার, লেনদেন, পরিবার প্রতিপালন, সামাজিকতা, প্রশাসন পরিচালনা, রাষ্ট্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার সর্বক্ষেত্রে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, তখনই বান্দার খাঁটি ইমানের পরিচয় পাওয়া যায়। আর সব কিছুই তখন ইবাদতের মতোই সওয়াবের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, মুমিনকে প্রতিটি কাজের জন্য প্রতিদান দেওয়া হয় এমনকি সে তার স্ত্রীর মুখে যে খাবার তুলে দেয়, তাতেও। কারণ পরিবার প্রতিপালন আল্লাহর হুকুম ও রসুলের আদর্শেরই অন্তর্গত। সুতরাং এজন্য যে শ্রম ও অর্থ ব্যয় করা হয় তাও বিফলে যাবে না। মানুষের একান্ত জীবন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যা কিছুই করা হবে, যদি আল্লাহর বিধান ও রসুলের সুন্নাহ মোতাবেক হয় তা ইবাদতের সমান হয়ে যাবে এবং প্রতিদান পাওয়া যাবে। সিয়াম মাসের পবিত্র দিনগুলোতে আমরা যেন মুমিন বান্দা হওয়ার চেষ্টা চালাই।
লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
www.selimazadi.com