শিরোনাম
প্রকাশ : ৩০ মার্চ, ২০২০ ১১:৫৩
আপডেট : ৩০ মার্চ, ২০২০ ১৭:১২

কেমন করে ভিয়েতনাম জিতছে করোনা ‘যুদ্ধ’?

অনলাইন ডেস্ক

কেমন করে ভিয়েতনাম জিতছে করোনা ‘যুদ্ধ’?

ভিয়েতনাম, চীনের প্রতিবেশী, জনবহুল দেশ। রয়েছে দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পর্যাপ্ত অর্থও নেই দেশটির। তাহলে তারা কোভিড-১৯ ঠেকাচ্ছে কী করে?

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীন থেকে শুরু হয়ে ১০ হাজার কিলোমিটার দূরে ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে ছড়িয়ে গেছে। অথচ ভিয়েতনামে তেমন কিছুই হয়নি।

শুধু জার্মানিতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় অর্ধলক্ষ হয়েছে। মারা গেছেন দুই শতাধিক। অথচ চীনের সঙ্গে ১১০০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকার পরও সেখানে মাত্র দেড়শ’ ছাড়িয়েছে। জানুয়ারি থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত কেউ মারা যাননি।

এর অর্থ করোনা মোকাবেলায় ভিয়েতনাম বেশ ভালো করছে।

গত জানুয়ারির শেষে টেট নববর্ষ উদযাপনের সময় ভিয়েতনামের সরকার করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, যদিও প্রাদুর্ভাব তখনও চীনেই সীমাবদ্ধ ছিল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এনগুয়েন জুয়ান ফুক বলেন, খুব দ্রুতই এই ভাইরাস এখানে এসে পড়বে। ‘‘এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা,’’ বলেন ফুক।

সর্বাত্মক ব্যবস্থা

বিষয় হল, ব্যবস্থা নিতে হলে দু’টো জায়গায় ভরসা রাখতে হবে। এক হল সরকারের অর্থ, আর দুই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, যে দুটিতেই ঘাটতি আছে ভিয়েতনামের।

দক্ষিণ কোরিয়ার মতো লাখ লাখ পরীক্ষা করার সাধ্য নেই তাদের। হো চি মিন শহরের মেয়র জানিয়েছেন, তার শহরের ৮০ লাখ লোকের জন্য ইনটেন্সিভ কেয়ার বেড আছে মাত্র নয়শ’টি৷ এ শহরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে সহজেই তা সামর্থ্যকে অতিক্রম করবে।

তাই করোনা মোকাবেলায় ভিয়েতনাম কড়াকড়িভাবে কোয়ারেন্টাইন নীতি গ্রহণ করে। যারা এই ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের সংস্পর্শে আসা সবাইকে খুঁজে বের করে। চীন সম্পূর্ণ লকডাউন করার আগেই তারা এ কাজগুলো করে।

যেমন, ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তিন সপ্তাহের জন্য হ্যানয়ের পাশে ১০ হাজার অধিবাসীর একটি শহর সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে তারা। সে সময় পুরো দেশে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন মাত্র ১০ জন।

জার্মানির মতো পশ্চিমা দেশগুলোও যেখানে আক্রান্ত ও তাদের সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে এমন লোকদের খুঁজে বের করছে, সেখানে ভিয়েতনাম আক্রান্তদের সরাসরি, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের সংস্পর্শে আসা মানুষদেরও খোঁজ রেখেছে। এদের সবার ওপর চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

আর একেবারে শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকি এলাকাগুলো থেকে যারাই ভিয়েতনামে এসেছেন, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে সব স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভিয়েতনামের নজরদারির অবস্থা

শুধু ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তির সহায়তায় করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর চেষ্টার পরিবর্তে ভিয়েতনাম তাদের সবার আস্থার সেনাবাহিনীর উচ্চমানের প্রযুক্তির নজরদারি সেবাটি কাজে লাগিয়েছে।

নিরাপত্তা কর্মকর্তা বা কমিউনিস্ট পার্টির গোয়েন্দাদের প্রত্যেক সড়ক ও ক্রসিংয়ে অথবা প্রত্যেক গ্রামে মোতায়েন করা হয়েছে। মিলিটারিও তাদের সদস্য ও যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঠে যাচ্ছে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণের কারণে নিয়ম না মানা খুব দুঃসাধ্য সেখানে।

তবে সমস্যা হল, কোভিড-১৯ আক্রান্তরা সমাজে ও সামাজিক গণমাধ্যমে একঘরে হয়ে পড়েছেন। যেমন, এক নারী ইউরোপ থেকে ভাইরাস হ্যানয় শহরে নিয়ে গেছেন বলে চাউর হয়ে গেছে। তিনি কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন না হওয়ায় কিংবা কোয়ারেন্টাইনে না থাকায় তাকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক হেনস্থা করা হয়েছে।

এই নারীর ঘটনাটি ভিন্ন। তিনি যখন ভিয়েতনামে ফেরেন, তখন প্রথম ১৬ জন যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, সবাই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন। তাই তিনি ভাইরাসটি আবার নিয়ে এসেছেন এমনটিই সাধারণের ধারণা।

সামাজিকভাবে এমন একঘরে হয়ে যাবার ভয়ে অনেকেই অসুস্থ হলেই কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

জানুয়ারির শেষে ভিয়েতনাম সরকার করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা

ভিয়েতনাম করোনা পরিস্থিতিকে যুদ্ধের সঙ্গে অলঙ্করণ করছে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী ফুক বলেছেন, ‘‘প্রত্যেক ব্যবসা, প্রত্যেক নাগরিক, প্রত্যেক আবাসিক এলাকা এই প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে একেকটি দূর্গ।’’

এই তুলনা অনেক ভিয়েতনামিজের মধ্যে এক রকমের আবেগ তৈরি করেছে। তারা একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো ও ধৈর্য্যশীলতার পরিচয় দিতে গিয়ে গর্ববোধ করছেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ব্যাপক হারে তথ্য প্রচার করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাত ধোয়ার ওপর একটি ভিডিও ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছে, যা ভাইরাল হয়ে গেছে।

নিয়ম মানা

যদিও কোনও জরিপ করা হয়নি, তবে সামাজিক গণমাধ্যম ও ভিয়েতনামিজদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায় যে, তারা সরকারের উদ্যোগগুলোর সঙ্গে একমত।

ভিয়েতনাম অনেকের চেয়ে সংকট মোকাবেলা ভালোভাবে করছে বলে তারা গর্ববোধ করেন। দেশের সবচেয়ে বড় করোনাযোদ্ধা হিসেবে এরই মধ্যে ফেসবুকে ‘জাতীয় বীর' খ্যাতি পেয়ে গেছেন সহপ্রধানমন্ত্রী ভু দুক দাম।

তবে কিছু মানুষ ভিয়েতনামের এক দলীয় কমিউনিস্ট সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে বিষয়টি ভালোভাবে দেখছেন না। তাদের অভিযোগ সরকার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করেন।

এদিকে, মিডিয়ার ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণও মেনে নিয়েছেন মানুষ। এমনকি আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও যে বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে যাচ্ছে, তা-ও মেনে নিয়েছে জনগণ।

সরকারের হিসেবে ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে তিন হাজার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। ভিনগ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পর্যটকের অভাবে তাদের অনেকগুলো হোটেল ও রিসোর্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অনেক লোক চাকরি হারিয়েছেন। 

এই বাড়তি চাপ সামলাতে ভিয়েতনাম সরকার প্রায় ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থ বরাদ্দ রেখেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সংকটের কারণে কর আদায় অনেক কমে যাবে। সরকার জনগণের কাছে অর্থ চেয়েছে। তারাও যে যার মতো দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, এভাবেই সম্ভব করোনাভাইরাস মোকাবেলা। সূত্র: ডয়েচে ভেলে

বিডি প্রতিদিন/কালাম


আপনার মন্তব্য