খাদ্য অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবনধারণের জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য গ্রহণ ছাড়া কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। তবে মানুষের জন্য সে খাবার অবশ্যই হতে হয় বিশুদ্ধ। খাবারে ভেজাল মেশানো মারাত্মক অপরাধ, আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু তারপরও দেখা যায়, দেশে বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানো বাংলাদেশের জন্য একটি প্রকট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। এর মধ্যে মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। সব ক্ষেত্রেই এই ভেজালের ছড়াছড়ি, শাকসবজি কপার সালফেট পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় টাটকা ও তাজা দেখানোর জন্য। মৌসুমি ফল আম, লিচু ও জামে দেওয়া হয় কারবাইড ও ফরমালিন। ফল গাছে থাকতেই ছিটানো হয় হরমোন ও কীটনাশক। সিরিঞ্জ দিয়ে তরমুজের ভিতরে দেওয়া হয় তরল পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট। এর ফলে তরমুজের ভিতর থাকে লাল টকটকে। ক্যালসিয়াম কারবাইড দিয়ে পাকানো হয় কলা। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণের জন্য মাছে দেওয়া হয় ফরমালিন। ভেজালমুক্ত খাদ্য যেমন দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধিসাধন এবং রোগ প্রতিরোধ করে, তেমনি ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন বিপন্ন পর্যন্ত হতে পারে।
খাবার ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। শুধু খাবার খেলেই চলে না, খাবারের সঙ্গে পানিরও প্রয়োজন। মানুষের রোগব্যাধির মূলে আছে নিম্নমানের খাবার ও দূষিত পানি। রোগব্যাধি শুধু শারীরিক কষ্ট ও অসামর্থ্যরে হেতু নয়, অনেক সময় মৃত্যুরও কারণ। রাজধানীর সর্বত্র খাবারের দোকান। ফুটপাত-রাস্তা, অলিগলি থেকে শুরু করে এহেন স্থান নেই, যেখানে খাবারের দোকান নেই। হাজার হাজার ছোটবড় খাবারের দোকান। এসব দোকানে ডালপুরি-ফুসকা থেকে আরম্ভ করে পোলাও-বিরিয়ানিসহ বিভিন্ন নামিদামি খাবার বিক্রি হয়। সব ধরনের ও মানের খাবার দোকানে মানুষের এত ভিড় যে অনেক সময় দোকানগুলো খাবার সরবরাহ করতে হিমশিম খায়। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ সকাল থেকে রাত অবধি তাদের কাজে ব্যস্ত থাকে।
অন্যদিকে বিভিন্ন উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষ বাইরে থেকে এ শহরে আগমন করে। এসব মানুষের অধিকাংশই নাশতা, দুপুরের খাবার এমনকি রাতের খাবারও খেয়ে থাকে। এসব খাবার দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে। কর্মজীবী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে বাইরে থেকে আসা মানুষগুলো সময়স্বল্পতা ও ব্যস্ততার কারণে এসব খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হয়। প্রশ্ন হলো, এসব দোকানে যেসব খাবার বিক্রি হয়, সেসবের মান কেমন? স্বাস্থ্যসম্মত, নাকি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অধিকাংশের খাবার মানসম্পন্ন নয়, বরং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফুটপাত-রাস্তা, অলিগলির ডালপুরি, ফুসকা, চটপটি, ভাজাপোড়া কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁর পোলাও-বিরিয়ানি, কাবাব তৈরিতে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবেশন প্রতিটা ক্ষেত্রে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে। রান্নাঘর, খাদ্যপণ্য রাখার জায়গা, পানির সংস্থানস্থল, কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই নেই। এই অমানসম্পন্ন পরিবেশে তৈরি ও পরিবেশিত খাবার খাওয়ার পর যে কোনো ব্যক্তির রোগাক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। খোলা জায়গায় যেসব খাবার রান্না হয়, উন্মুক্ত স্থানে রাখা হয়, সেসব খাবারের, বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া খেলে পেটের নানা ব্যাধি থেকে ডায়রিয়া-কলেরা প্রায় অবধারিত। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমান এবং ভেজাল হানিকর রংমিশ্রিত খাবার খেলে কিডনি, ক্যানসার প্রভৃতি মারাত্মক রোগ হতে পারে। দেশে কিডনি রোগ, ক্যানসার, হৃদরোগ ইত্যাদি ভয়াবহ রূপ নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল ও দূষণযুক্ত খাবার খাওয়া। খাদ্য উৎপাদনে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি। অনেক খাবার আমাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসেছে। অথচ আমরা যেখানে হোঁচট খেলাম, সেই জায়গাটা হলো ইউটিলাইজেশন। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার এখনো পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। খাদ্যে ভেজালের চেয়েও দূষণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় কাঁচাবাজারগুলোকে পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সচেষ্ট হতে হবে। পরিষ্কার বাজারের বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে সবাইকে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ তারা খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করে ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোয় শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ খাদ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদান শুরু করা জরুরি।
♦ লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য