ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার রোডম্যাপ ঘোষণার পরের দিনই নির্বাচনি প্রশিক্ষণ শুরু করেছে সাংবিধানিক এই সংস্থা। কাল সম্পূরক তালিকাসহ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা হতে পারে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং অন্যান্য আইনবিধি কাল ৩১ আগস্টের মধ্যে সংশোধনের প্রস্তাব ও প্রণয়ন সরকারের কাছে পাঠাবে ইসি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে নতুন দলের প্রাথমিক নিবন্ধন ও একই মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন দেবে ইসি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ আর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জিআইএস ম্যাপ প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) গতকাল ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কোর প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এতে চার নির্বাচন কমিশনার, ইটিআই মহাপরিচারলকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। সারা দেশে ধাপে ধাপে প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সিইসি বলেন, পেশাদারি ও নিরপেক্ষতা নির্বাচন কমিশনের বটম লাইন। শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কখনো নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে না। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ তো আছেই। সোশ্যাল মিডিয়া নতুন চ্যালেঞ্জ। ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন আলাদা সেল গঠন করবে।
সিইসি ভোট গ্রহণে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের আইন, বিধি সম্পর্কে জ্ঞান রাখার পাশাপাশি নৈতিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেন। এআই-এর অপব্যবহার রোধে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। সিইসি বলেন, ‘আমাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য নিয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটা যাতে প্রপারলি অ্যাড্রেস করা হয়, সে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রশিক্ষণের ওপর সফলতা নির্ভর করছে। প্রশিক্ষণের বটম লাইন হচ্ছে প্রফেশনালিজম।’
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। বর্তমান কমিশনকে ‘গণ অভ্যুত্থানের ফসল’ উল্লেখ করে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য সবার দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন। নির্বাচনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, জীবন চলে যেতে পারে। কিন্তু ফাঁকিবাজি, ধোঁকাবাজি করা যাবে না। কমিশন ও মাঠপর্যায়ের সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের নির্বাচনি ব্যবস্থার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে বর্ণনা করে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৫০ হাজার প্রিসাইডিং অফিসার সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচন ভালো হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সব সমস্যার তালিকা করে সমাধানের পথ নির্ধারণ করতে হবে। প্রিসাইডিং অফিসার সাহস নিয়ে সৎভাবে দায়িত্ব পালন করলে ভোট কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জুতার মালা পরানো হয়েছে। আরেকজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও কারান্তরীণ। এ পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী- গভীর বিশ্লেষণ দরকার। আমরা যারা আজকে দাঁড়িয়ে আছি, আজকে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা কী করব? মেকানিজমটা কী?’ নির্বাচনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের দায়িত্ব আইনানুগভাবে করতে হবে। সংবিধান ও আইন মেনে কাজ করলেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে। কে কী করল, কী ভাবল, চিন্তা করল- সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, সারা দেশে ধাপে ধাপে প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
আদালতের আদেশে এক যুগ পর চাকরি ফিরে পেয়ে নির্বাচন কমিশনে যোগ দেওয়া ৬০ জন কর্মকর্তাকে শুধু পোস্টাল ব্যালটের জন্য প্রবাসীদের ভোটাধিকারের কাজে সম্পৃক্ত রাখা হচ্ছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্বাচন ব্যয় কমানো সম্ভব। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে বুথের সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করার মাধ্যমে কমিশন প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে।
ইইটিআই মহাপরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান জানান, আগামী চার মাসে ভোট গ্রহণ সম্পৃক্ত ১০ লাখের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও লোকবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।