শিরোনাম
প্রকাশ : ৫ মে, ২০২১ ১৮:০৫
প্রিন্ট করুন printer

প্রতীতি রাশনাহা কামালের নিবন্ধের রিভিউ করলেন ড. সালমা সুলতানা

অনলাইন ডেস্ক

প্রতীতি রাশনাহা কামালের নিবন্ধের রিভিউ করলেন ড. সালমা সুলতানা
প্রতীতি রাশনাহা কামাল
Google News

প্রতীতি রাশনাহা কামাল। বর্তমান সময়ের সম্ভাবনাময়ী এক লেখকের নাম। তার বিজ্ঞানবিষয়ক নিবন্ধ Will Mars ever be habitable? সম্প্রতি আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। নিবন্ধটিতে লেখক বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ ‘মঙ্গল’কে কিভাবে মানুষের বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়ে একটি আলোচনার অবতারণা করেছেন।

যারাই মঙ্গলের দিকে পা বাড়াবেন, তাদেরকেই চিরতরের জন্যই এই কাজটি করতে হবে কেননা এটা হবে একমুখী যাত্রা। যাওয়া যাবে কিন্তু ফিরে আসা যাবে না। পরবর্তীতে আরও অনেকে হয়তো তাদেরকে অনুসরণ করবেন। তারা সবাই মিলে ওখানে কলোনি গড়ে তুলবেন, গড়ে তুলবেন শহর, সভ্যতা। এভাবেই তৈরি হবে আমাদের প্রিয় পৃথিবীর পাশাপাশি আর একটি গ্রহ যেটা হবে মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য। 

কিন্তু আপাতত, অসম্ভব এই বিষয়টিকে সম্ভব করতে হলে বেশ কিছু কঠিন প্রতিবন্ধকতাকে পরাভূত করতে হবে। স্বশরীরে মঙ্গলে যাওয়াটা যতোটা না সমস্যাসঙ্কুল তার তুলনায় ঢের সমস্যাসঙ্কুল হল মঙ্গলের আবহাওয়াকে পৃথিবীর আবহাওয়ার মতো করে গড়ে তোলা, যাতে করে মানুষ সেখানে মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারে, বসবাস করতে পারে এবং বংশবিস্তার করতে পারে। এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কি করণীয় লেখক সে বিষয়টিকেও সাবলীলতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি রবার্ট জুব্রিনের লেখা The Case for Mars নামক বিখ্যাত বইটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। 

মঙ্গলের মতো পৃথিবীও একদিন অক্সিজেনহীন নিস্ফলা ভূমি ছিল। কিন্তু সালোকসংশ্লেষণ সম্পর্কিত জীবের উপস্থিতির কারণে এবং সময়ের পরিক্রমায় পৃথিবী তার বর্তমান অবস্থায় রূপান্তরিত হয় এবং মানবজাতির উদ্ভব ঘটে। একইভাবে মঙ্গলকেও যদি স্বনির্ভর গ্রহ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, এই গ্রহটিও মানুষের বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। 

লেখক শুধুমাত্র তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ না থেকে, এই সুদূরপরাহত বিষয়টি কিভাবে বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব সে সম্পর্কেও পাঠক উপযোগী একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন। প্রথমত, মঙ্গলে হাজার বছর ধরে জমে থাকা বরফের নীচে কিংবা মাটির নিচে যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড রয়েছে তা অবমুক্ত করা এবং পরিবেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এটা করা সম্ভব হলে, মিথেইন গ্যাস এবং ক্লোরোফ্লোরোকার্বন গ্যাস নির্গমনের মাধ্যমে মঙ্গলের আবহাওয়াকে পর্যাপ্ত ভারি করা সম্ভব। আর এর ফলে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশে আটকেগিয়ে মঙ্গলগ্রহকে উষ্ণকরে তুলতে পারে এবং এভাবে গ্রহটি হয়ে উঠতে পারে মনুষ্যবাসযোগ্য। 

রবার্ট জুব্রিনকে উদ্ধৃতকরে প্রতীতি কামাল আরও লেখেন যে, orbiting mirrors এর মাধ্যমে উষ্ণতাকে মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুর দিকে ধাবিত করা যেতে পারে। এভাবে, উষ্ণতার মাত্রা যদি ৫ ডিগ্রী বাড়ানো যায় তাহলে, শুকনা বরফ বাষ্পীভবনের মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন সম্ভব। তাছাড়া, orbiting mirrors  প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ররফকে তরল পানিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এই পানি আবার জৈবিক প্রতিক্রিয়া ভূমিকা রাখতে সক্ষম। 

অন্যদিকে, ব্যাপক আকারে কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে মঙ্গলের বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটির সাথে প্রচুর বিনিয়োগ জড়িত থাকায় এটা বাস্তবসম্মত নয় বলেই ধরে নেওয়া যায়। এছাড়া, সালোকসংশ্লিষ্ট অণুজীব ব্যকটিরিয়ার ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমেও মঙ্গলের পরিবেশকে উষ্ণ করে তোলা সম্ভব। কেননা এই ধরেনের অণুজীব অ্যামোনিয়া এবং মিথেন নির্গমনের মাধ্যমে পরিবেশে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদি এই ধারণাগুলো কিংবা এর মধ্য থেকে একটা বা দুটি ধারণাও প্রয়োগ করা যায়, তাহলেও মঙ্গল হয়ে উঠবে মানুষের জন্য মঙ্গলময়। এরপরও, মানুষকে যদি বিশেষ পোশাক ও মাস্ক ছাড়া মঙ্গলের বুকে মুক্তভাবে চলাচল করতে হয়, পরিবেশে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে, সাধারণ অণুজীব যথেষ্ট নয়। 

উন্নততর জীবনধারার জন্য দরকার অক্সিজেনের ব্যাপক উপস্থিতি। এ ব্যাপারে, বংশগত প্রযুক্তিনির্ভর গাছ-পালার বিস্তার ঘটানো একটি কার্যকরী উপায় হতে পারে। 

মূলত, মঙ্গলের পরিবেশে গ্যাসের একটু একটু বিস্তার ঘটানোর মাধ্যমে উক্ত পরিবেশকে মানবজাতির বসবাস উপযোগী করে তোলা সম্ভব। কিন্তু এই লাল গ্রহকে এই পর্যায়ে উন্নীত করতে শতাব্দীর পর শতাব্দী লেগে যেতে পারে। তবে, সাময়িক সমাধান হিসেবে, মানুষের বসবাসের জন্য বড় বড় আবদ্ধ ঘর তৈরি করা যেতে পারে। কার্বন মঙ্গলের মাটি ও মাইক্রোবিয়াল প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ঘরগুলোতে অক্সিজেন তৈরি হবে। এখানে জীবনযাপন সহজ ও স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু এর বাইরে জীবন নিঃসন্দেহে সহজ থাকবে না। 

উল্লেখ্য যে, এরূপ প্রক্রিয়ায়, সময় ও সম্পদ দুটিই কম লাগে। লেখক অবশ্য তার নিবন্ধের শেষ দিকে, উপরোক্ত বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এরূপ একটি প্রচুর সম্পদ এবং সময় অপচয়ী প্রকল্প গ্রহণ করা ঠিক হবে কিনা এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি আরও প্রশ্নের অবতারণা করেন, এই পরিমান সম্পদ পৃথিবীর মানুষের মঙ্গলের জন্য ব্যবহার উত্তম নয় কি? মঙ্গল গ্রহকে আর একটি পৃথিবী বানানোর আগে আমাদের এই প্রশ্নগুলো নিশ্চিত ভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

লেখক: ড. সালমা সুলতানা, সাহিত্যিক, গবেষক, ইংরেজির অধ্যাপক এবং সভাপতি ইংরেজি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
 
বিডি প্রতিদিন/আরাফাত