প্যারিসের আইফেল টাওয়ার নেই কিংবা নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের কোনো অস্তিত্ব নেই-আধুনিক পৃথিবীর মানচিত্র কি আদৌ কল্পনা করা সম্ভব? এ নামগুলো আজ আমাদের কাছে ধ্রুবতারার মতো সত্য। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, আমাদের অতি পরিচিত এ ল্যান্ডমার্কগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অ™ভুত সব নামে পরিচিত হতে চলেছিল। ভাবুন তো, একটু এদিক-সেদিক হলেই আজ আমরা এগুলোকে এ নামেই ডাকতাম? ইতিহাসের সেই নাটকীয় মোড় আর নামকরণের মজাদার সব আখ্যান নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন : ‘১০টি আইকনিক ল্যান্ডমার্ক : যা হতে পারত সম্পূর্ণ অন্য কিছু’। চলুন জেনে নিই পর্দার আড়ালের সেই বিস্ময়কর গল্পগুলো
৩০০ মিটারের সেই লোহার কঙ্কাল যেভাবে আজকের-
‘আইফেল টাওয়ার’
আজকের পৃথিবীতে পর্যটকদের স্বপ্নের গন্তব্য বললে যে ছবিটা চোখের সামনে সবার আগে ভেসে ওঠে, তা হলো ‘আইফেল টাওয়ার’। কিন্তু জানলে অবাক হওয়ার কথা, ইতিহাসের পাতায় এর নাম কোনো রোমান্টিক তকমা নয়, বরং হতে পারত একঘেয়ে গাণিতিক এক নাম- ‘৩০০ মিটারের টাওয়ার’। সেই গল্পের সময়কাল ১৮৮৯ সাল, যখন প্যারিস বিশ্বমেলার আয়োজন ছিল তুঙ্গে, তখন প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেলের কোম্পানি থেকে একটি প্রস্তাব জমা পড়ে। এর কোনো কাব্যিক নাম ছিল না, নকশায় একে বলা হয়েছিল ‘লা ট্যুর ডি ৩০০ মিট্রেস’ (৩০০ মিটারের টাওয়ার)। প্রকৌশলী মরিস কোয়েচলিন এবং এমিল নুগুয়্যারের করা এ নকশাটি আদতে ছিল নিখুঁত এক কারিগরি বর্ণনা। কিন্তু সেই বর্ণনা প্যারিসবাসীর কানে পৌঁছাল বিরক্তির সুর হয়ে। কারণ, তৎকালীন প্যারিসের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা এ লোহালক্কড়ের পাহাড় সহ্য করতে পারছিলেন না। তাঁরা এক জোট হয়ে ইশতেহার জারি করলেন-যার নাম ছিল ‘মঁসিয়ে আইফেলের টাওয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ’। তাঁদের কাছে এটি ছিল স্রেফ শহরের নান্দনিকতাকে ধ্বংস করার কৌশল। কিন্তু গুস্তাভ আইফেল এ কথা মানার পাত্র নন। মানুষের তীব্র ঘৃণা আর বিদ্রুপের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একাই লড়াই চালিয়ে গেছেন এ প্রকৌশলী। যখন বিশ্বমেলা শুরু হলো, বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন দর্শনার্থীরা। লোহার সেই বিশালাকার কাঠামোর জটিল বুনন আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মুনশিয়ানায় সবাই মুগ্ধ হতে শুরু করল। তখন থেকে মানুষ এ টাওয়ারকে ‘৩০০ মিটারের টাওয়ার’ বলতে চাইল না। নাম মুখে মুখে পাল্টে হয়ে গেল-‘আইফেল টাওয়ার’।

আবাসন প্রকল্পের বিলবোর্ড হয়ে উঠল সিনেমার মানচিত্র!
আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে কেউ ভাবতেও পারেনি যে, আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসের পাহাড়ের ধুলোবালিতে ঘেরা একটি সাইনবোর্ড একদিন বিশ্বের বিনোদন জগতের রোল মডেল হয়ে দাঁড়াবে। ১৯২৩ সালে যখন এটি প্রথম বসানো হয়, তখন এর নাম মোটেও ‘হলিউড’ ছিল না, বরং ছিল- ‘HOLLYWOODLAND’। শুনতে অবাক লাগলেও সত্য যে, এ বিশালাকার অক্ষরগুলো কোনো স্টুডিওর প্রচারের জন্য নয়, বরং পাহাড়ের ওপর একটি আবাসন প্রকল্প বা ‘রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসার প্রচারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি অক্ষর ছিল ৫০ ফুট উঁচু। রাতে যেন দূর থেকেও ক্রেতারা আকৃষ্ট হন, সে জন্য এতে লাগানো হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার লাইট। নির্মাতাদের পরিকল্পনা ছিল খুব সাধারণ-দেড় বছর বিজ্ঞাপন চলবে, তারপর এটি নামিয়ে ফেলা হবে। এক সময় হলিউড শহরটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল চলচ্চিত্রের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু যে সাইনটি দিয়ে এর শুরু হয়েছিল, ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে এসে তার দশা হলো করুণ। অযত্নে আর অবহেলায় অক্ষরগুলো জীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করল। ঠিক তখনই হলিউড চেম্বার অব কমার্স বুঝতে পারল, এটি কেবল একটি বিজ্ঞাপনি বোর্ড নয়, এটি একটি আবেগের নাম। তখন তারা এটি মেরামত করার সিদ্ধান্ত নিল, তবে এক বিশেষ শর্তে। তারা চিরতরে বাদ দিয়ে দিল শেষের ‘LAND’ অংশটুকু। আর তখন জন্ম নিল আজকের পরিচিত ‘HOLLYWOOD’।

এক সময়ে ঘোড়ার আস্তাবল থেকে আজকের আলোর স্বর্গ
আজকের টাইমস স্কয়ারের দিকে তাকালে বিশ্বাস করা কঠিন যে, ১৯০৪ সালের আগে পর্যটকরা এখানে ছবি তুলতে আসতেন না, বরং এ এলাকা এড়িয়ে চলতেন। লন্ডনের একটি রাস্তার নামানুসারে এর নাম ছিল ‘লংএকর স্কয়ার’। নামটা রাজকীয় শোনালেও এলাকাটি ছিল কিন্তু ঠিক তার উল্টো। আজকের মতো সেখানে ব্রডওয়ের চোখ ধাঁধানো থিয়েটার ছিল না, ছিল কেবল অন্ধকার কারখানা আর সাধারণ দালানকোঠা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে লংএকর স্কয়ার ছিল মূলত ঘোড়ার গাড়ি তৈরির কারখানা আর আস্তাবলে ঠাসা এক জীর্ণ এলাকা। তবে ‘লংএকর স্কয়ার’ রাস্তাটির ভাগ্য বদলে যায় ১৯০৪ সালে, যখন বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ তাদের সদর দপ্তর সরিয়ে এ এলাকায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তৈরি করে বিশালাকার ‘টাইমস বিল্ডিং’ (যা বর্তমানে ওয়ান টাইমস স্কয়ার নামে পরিচিত)। তৎকালীন নগর কর্তৃপক্ষ সংবাদপত্রের এ আগমনকে এলাকাটির আধুনিকায়নের সুযোগ হিসেবে দেখেন। সংবাদপত্রটির সম্মানে রাতারাতি লংএকর স্কয়ারের নাম বদলে রাখা হয় ‘টাইমস স্কয়ার’। তা ছাড়া নাম পরিবর্তনের ঠিক কয়েক দশকের মধ্যে এলাকাটি ভোল বদলে ফেলে। আধুনিক প্রযুক্তি আর বিজ্ঞাপনে সয়লাব হয় সেখানে। ব্রডওয়ে থিয়েটারগুলো ব্যবসায় শুরু করে এ মোড়েই। ১৯০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া নববর্ষ উদ্যাপনের সেই বিখ্যাত প্রথা টাইমস স্কয়ারকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।

‘বেনেলং’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে সিডনি অপেরা হাউস
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবারে দাঁড়িয়ে থাকা এ স্থাপত্যটি দেখলে মনে হয় কোনো জাদুকরী জাহাজ নোঙর ফেলে আছে। কিন্তু এর নামটির পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন দ্বিধা-এটি কি ইতিহাসের শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে, নাকি আধুনিক বিশ্বের নতুন পরিচয়? মূলত আজকের অপেরা হাউসটি যে স্থানটিতে আছে, ভৌগোলিকভাবে তার নাম ‘বেনেলং পয়েন্ট’। এ নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঠারো শতকের এক কিংবদন্তি আদিবাসী নেতার নাম-উলারওয়ারি বেনেলং। তিনি ছিলেন আদিবাসী অস্ট্রেলীয় এবং ব্রিটিশ বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরির প্রধান নায়ক। সেই ভূমির আদি গুরুত্ব আর এ মহান নেতাকে সম্মান জানাতে প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল এর নাম হবে-‘বেনেলং পয়েন্ট অপেরা হাউস’। নামকরণের সময় নীতি-নির্ধারকরা এক বিশাল সংকটে পড়েছিলেন। একদিকে অস্ট্রেলিয়ার আদিম সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে স্থাপত্যটিকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ‘বেনেলং পয়েন্ট’ নামটি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিডনির মতো পরিচিতি পাবে না। তারা চেয়েছিলেন এমন একটি নাম, যা শুনলেই বিশ্বজুড়ে পারফর্মিং আর্টসের কেন্দ্র হিসেবে এক বিশাল মহিমা ফুটে উঠবে। শেষ পর্যন্ত সরকারি পরিকল্পনাবিদরা সিডনি শহরকেই এর পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দিলেন। জন্ম নিল ‘সিডনি অপেরা হাউস’। নামটি অতি সাধারণ এবং মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল।

আমলাতান্ত্রিক ম্যানশন থেকে আধুনিক হোয়াইট হাউস
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বাসভবনটির দিকে তাকালে প্রথমেই যে শব্দটি মাথায় আসে তা হলো ‘আভিজাত্য’। কিন্তু ১৮০০-এর দশকে এ ভবনের দাপ্তরিক নাম ছিল ‘এক্সিকিউটিভ ম্যানশন’। নামটি শুনলে মনে হয় কোনো করপোরেট অফিস বা আমলাতান্ত্রিক সচিবালয়, যেখানে কেবল ফাইলপত্রের লেনদেন হয়। শুরুর দিকে যখন নামকরণের প্রস্তাব আসছিল, তখন অনেকের মাথায় ছিল ‘প্রেসিডেন্টস হাউস’ কিংবা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস’। কিন্তু আমেরিকানরা তখন সবেমাত্র ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়েছে। ‘প্যালেস’ বা প্রাসাদ শব্দটি তাদের কাছে ছিল রাজতন্ত্রের প্রতীক। তাই তরুণ এ প্রজাতন্ত্র এমন কোনো নাম নিতে চায়নি যা ইউরোপীয় রাজাদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ফলে নিরাপদ হিসেবে ‘এক্সিকিউটিভ ম্যানশন’ নামটিই টিকে যায় সরকারি নথিপত্রে। সরকারি নাম যাই হোক, সাধারণ মানুষের চোখে ভবনটি ছিল ধবধবে সাদা রঙের। এ উজ্জ্বল রঙের কারণে আঠারো শতক থেকেই মানুষ একে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘হোয়াইট হাউস’ বলে ডাকতে শুরু করে। প্রায় ১০০ বছর এভাবেই নাম দুটির মধ্যে লড়াই চলল। ১৯০১ সালে দৃশ্যপটে এলেন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ‘এক্সিকিউটিভ ম্যানশন’ নামটি মানুষের হৃদয়ে কোনো আবেগ তৈরি করতে পারছে না। তখন তিনি এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এর নাম দেন ‘হোয়াইট হাউস’।

তৎকালীন ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর অজানা গল্প
১৮৮৬ সালে ফ্রান্স যখন আমেরিকাকে বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে এ উপহারটি দেয়, তখন এর সরকারি নথিপত্রে নাম ছিল ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ (Liberty Enlightening the World)। বাংলায় যার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘বিশ্বকে আলোকিত করা স্বাধীনতা’। ভাস্কর বার্থোল্ডি চেয়েছিলেন তাঁর এ সৃষ্টি কেবল আমেরিকার একার না হোক, বরং সারা বিশ্বের কাছে মুক্তির বার্তা পৌঁছে দিক। ফরাসি ভাষায় যার নাম ছিল আরও রাজকীয়-‘লা লিবার্তে এক্লেরঁ লে মঁদ’। সন্দেহ নেই, নামটির মধ্যে এক বিশাল আভিজাত্য এবং গভীর দর্শন ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানানসই হওয়ার জন্য এটি ছিল অনেক লম্বা এবং কিছুটা খটমটে। প্রতিদিনের আলাপচারিতায় এত বড় নাম নেওয়া মানুষের জন্য ছিল এক চ্যালেঞ্জ। তবে মূর্তিটি যখন নিউইয়র্কের বন্দরে স্থাপন করা হলো, হাজার হাজার অভিবাসী যখন জাহাজে চড়ে আমেরিকায় প্রবেশের সময় প্রথম এ মূর্তিকে দেখতে পেতেন, তখন তাঁদের কাছে এটি কোনো লম্বা নাম নয়, বরং ছিল ‘স্বাধীনতার এক অনন্য প্রতিমা’। মানুষ নিজের অজান্তেই লম্বা নামটি ছেঁটে ফেলে ডাকতে শুরু করল-‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’। আমেরিকান গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এর এ সহজ নামটি পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। বার্থোল্ডির সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ নামের জায়গা দখল করে নেয় মানুষের দেওয়া সহজ এ নামটি।

দ্য সিক্স গ্র্যান্ডফাদার্স থেকেই আজ মাউন্ট রাশমোর
আমেরিকার অন্যতম পরিচিত এ ল্যান্ডমার্কটির দিকে তাকালে আমরা দেখি মানুষের তৈরি স্থাপত্যের জয়গান। কিন্তু এ পাহাড়টির আদি পরিচয় ছিল মানুষের হাতের ছোঁয়ার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। লাকোটা সিউক্স আদিবাসীদের কাছে এ পাহাড়টি ছিল ধরাধাম ও আকাশের মিলনস্থল। ১৮৭৭ সালের আগে এ পাহাড়টির নাম ছিল ‘দ্য সিক্স গ্র্যান্ডফাদার্স’ বা ‘ছয় পিতামহ’। এটি কেবল একটি নাম ছিল না, ছিল লাকোটাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। পাহাড়ের এ নামটি জীবনের ছয়টি আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক শক্তিকে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, আকাশ এবং পৃথিবী) প্রতিনিধিত্ব করত। আদিবাসীদের কাছে এ পাহাড়টি ছিল এক পবিত্র তীর্থস্থান। মাউন্ট রাশমোর নামটি কোনো রাজকীয় ফরমান বা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আসেনি। ১৮৮০-এর দশকে চার্লস ই. রাশমোর নামের এক নিউইয়র্কবাসী আইনজীবী এ এলাকা পরিদর্শনে আসেন। তিনি যখন পাহাড়টির নাম জানতে চাইলেন, স্থানীয় এক গাইড অনেকটা মজা করে বলে বসলেন, ‘মাউন্ট রাশমোর’। মজার ব্যাপার হলো, সেই খেয়ালি নামটাই এক সময় জাঁকিয়ে বসল। ১৯২০-এর দশকে ভাস্কর গুটজন বোরগলাম যখন পাহাড়ের গায়ে খোদাই কাজ শুরু করেন, ততদিনে ‘ছয় পিতামহ’ নামটি ইতিহাসের ধুলোয় চাপা পড়ে গেছে, আর স্থায়ী হয়ে গেছে জনৈক আইনজীবীর সেই নাম।

বিশালতার ভিড়ে একটি রাজকীয় নাম ‘গ্র্যান্ড’ ক্যানিয়ন
প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিই যেন মহাকাব্য। কিন্তু সেই মহাকাব্যের নাম যদি হয় একেবারেই সাধারণ, তবে তার ভিতরের রোমাঞ্চ যেন ফিকে হয়ে যায়। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ক্ষেত্রেও প্রায় তেমনটাই হতে চলেছিল। ১৮৬০-এর দশকের দিকে যখন বসতি স্থাপনকারী ও অভিযাত্রীরা এ এলাকায় আসতেন, তারা এই বিস্ময়কে ডাকতেন স্রেফ ‘দ্য বিগ ক্যানিয়ন’ বলে। কারিগরি দিক থেকে হয়তো গিরিখাতটি ‘বড়’ ছিল, কিন্তু প্রকৃতির এই অনন্য স্থাপত্যকে শুধু ‘বড়’ বললে যেন তার অসম্মান করা হয়। শুরুর দিকের স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা একে বলতেন ‘এল কানিয়ন গ্রান্দে’, যা অর্থ ‘বড় গিরিখাত’। আমেরিকার এ আদিম সৌন্দর্যের জন্য এমন একঘেয়ে নাম মোটেও মানানসই ছিল না। ঘটনার মোড় ঘুরে ১৮৬৯ সালে। জন ওয়েসলি পাওয়েল নামের এক অদম্য অভিযাত্রী প্রথম আমেরিকান হিসেবে নৌকায় করে এ গিরিখাত পাড়ি দেন। কলোরাডো নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি যখন পাথুরে পাহাড়ের অকল্পনীয় বিশালতা আর রঙের খেলা দেখলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন ‘বিগ’ শব্দটি এর জন্য বড্ড ছোট। তিনি উপলব্ধি করলেন, এর রাজকীয়তা বোঝাতে প্রয়োজন আরও মহিমান্বিত কিছু। পাওয়েলই প্রথম ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ নামটি জনপ্রিয় করে তোলেন। এ নামে বিশ্বজুড়ে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯০০ সালে ‘ন্যাশনাল পার্ক’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

অতীতের দ্য রেনল্ডস বিল্ডিং যখন বিখ্যাত এম্পায়ার স্টেট
আজকের ‘এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং’ নামটা শুনলেই মনে এক ধরনের রাজকীয় এবং শক্তিশালী আভিজাত্য খেলা করে। কিন্তু শুরুর দিকে এর বিনিয়োগকারীরা মোটেও এত বড় কোনো কাব্যিক নাম নিয়ে ভাবেননি। তাঁরা চেয়েছিলেন একে স্রেফ ‘দ্য রেনল্ডস বিল্ডিং’ নামে ডাকতে। কারণ, সে সময় নিউইয়র্কের আকাশে তখন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছিল-কে কার চেয়ে উঁচু দালান বানাতে পারে। আর সেই প্রতিযোগিতার রীতি ছিল দাতার নামে ভবনের নাম রাখা। যেমন গাড়ির রাজা ক্রাইসলারের নামে ‘ক্রাইসলার বিল্ডিং’ কিংবা উলওয়ার্থ সাহেবের নামে ‘উলওয়ার্থ বিল্ডিং’। এ ধারা বজায় রেখে প্রধান বিনিয়োগকারী জন জে. রেনল্ডসের নামানুসারে ‘রেনল্ডস বিল্ডিং’ নাম রাখাটা ছিল যুক্তিসংগত। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়-নামটি শুনলে মনে হতো এটি কেবল একটি সাধারণ অফিস টাওয়ার বা কোনো বড় কোম্পানির সদর দপ্তর। এর মাঝে কোনো ‘কিংবদন্তি’ হওয়ার রসদ ছিল না। শেষ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীরা এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা ভবনের নামের জন্য বেছে নিলেন খোদ নিউইয়র্ক শহরের ডাকনাম-‘দ্য এম্পায়ার স্টেট’। এ একটি মাত্র শব্দ ‘এম্পায়ার’ বা সাম্রাজ্য যেন মুহূর্তেই ভবনটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলে দিল। এটি হয়ে উঠল আমেরিকার প্রগতি, উদ্ভাবনী শক্তি আর আকাশ ছোঁয়ার অদম্য সাহসের প্রতীক।
.jpg)
চাঁদের নামকরণ (মুন) কি সত্যিই ‘লুনা’ হতে চলেছিল?
মহাবিশ্বের অগণিত উপগ্রহের ভিড়ে আমাদের চিরচেনা সাথী কেবল ‘চাঁদ’ নামেই পরিচিত। সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহের উপগ্রহের যেখানে সুন্দর সুন্দর সব নাম আছে (যেমন বৃহস্পতির-‘গ্যানিমিড’ কিংবা শনির-‘টাইটান’), সেখানে এ উপগ্রহটির নাম কেন এত সাধারণ? অর্থাৎ চাঁদের নাম ‘মুন’ কেন? জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূচনায় বিজ্ঞানীরা একে ডাকতেন ল্যাটিন শব্দ ‘লুনা’ কিংবা গ্রিক শব্দ ‘সেলিনি’ বলে। আজও বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্বে বা মহাকাশ অভিযানে ‘লুনার’ জয়জয়কার (যেমন : লুনার মডিউল কিংবা লুনার এক্লিপস)। প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চেয়েছিলেন, অন্যান্য গ্রহের চাঁদের মতো আমাদের চাঁদেরও সুনির্দিষ্ট অফিশিয়াল নাম থাকুক। সেই হিসেবে ‘লুনা’ নামটি ছিল সবচেয়ে জুতসই এবং বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু ঘটনার মোড় ঘুরল তখন যখন ইংরেজি বৈশ্বিক বিজ্ঞানের প্রধান ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরা ইংরেজি শব্দ ‘মুন’ এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠল যে, ল্যাটিন আভিজাত্য তার কাছে হার মানতে বাধ্য হলো। বিজ্ঞানীরাও শেষ পর্যন্ত মেনে নিলেন যে, যা মানুষের হৃদয়ে ‘মুন’ হয়ে আছে, তাকে জোর করে ‘লুনা’ বানানোর প্রয়োজন নেই। ফলে অফিশিয়াল খাতাকলমেও এটি ‘দ্য মুন’ হিসেবেই স্থায়ী হয়ে গেল।