Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ২১:৪৯
পথিকৃৎ নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার
পথিকৃৎ নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার
ছবি : জয়ীতা রায়

রামেন্দু মজুমদার

(জন্ম : ৯ আগস্ট ১৯৪১) খ্যাতিমান নাট্য সংগঠক, অভিনেতা, নির্দেশক, সংবাদ পাঠক ও শিক্ষক। বাংলাদেশে প্রথম নাটকের পত্রিকা ত্রৈমাসিক থিয়েটারের সম্পাদক। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)-এর সাম্মানিক সভাপতি। তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ফেলোশিপসহ একাধিক সম্মান লাভ করেছেন। নাট্য-আন্দোলনের এই পথিকৃতের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— শেখ মেহেদী হাসান

 

একেবারে ছোটবেলার কথা দিয়ে শুরু করি। কেমন ছিল আপনার শৈশব-কৈশোর?

আমার জন্ম লক্ষ্মীপুরে ১৯৪১ সালে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দুই দিন পর। আমাদের বাড়িতে নাটকের একটা আবহ ছিল, আমার বাবা-কাকা শখের নাটক করতেন। আমার বড় দুই ভাই ও আমি নাটক করতাম। আমার বড় বোন অবশ্য অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় কলকাতায় চলে যায়। ছোট বোন পরবর্তী সময়ে নাটক করেছে আমাদের সঙ্গে। সুতরাং এই নাটকের মধ্য দিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমি প্রথম নাটক করি ১৯৫৩ সালে। সেটা ছিল ‘সিরাজউদ্দৌলা’—স্কুলের বার্ষিক নাটক। সেখানে ইংরেজ সেনাপতি ওয়াটসের রোল, দু-চারটা ইংরেজি সংলাপ, কিন্তু সেকি উত্তেজনা, সেকি প্রস্তুতি। লক্ষ্মীপুর তখন থানা শহর। একটা মুন্সেফ কোর্ট ছিল, আমাদের কোনো মঞ্চ ছিল না। আমাদের ওখানে বাঁশ পাওয়া যেত না, সুপারি গাছ দিয়ে আমরা মঞ্চের স্ট্রাকচার বানাতাম খোলা মাঠে। নাটকের সময় প্রচুর মানুষ হতো। তখন দু-তিনটা নাটক করেছি। পরে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই। সেখানেও নাটক করেছি। নাটকের প্রকৃত বোধ কিন্তু তখন তৈরি হয়নি। এই বোধ তৈরি হলো আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে।

 

আপনি তো ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন?

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৬১ সালে, ইংরেজি বিভাগে। জগন্নাথ হলের ছাত্র। ঢুকেই দেখি যে, এখন যেটা অক্টোবর স্মৃতিভবন, আগে সেটা ছিল অ্যাসেম্বলি হাউস। সেখানে একটি অডিটোরিয়ামে আমাদের রিহার্সাল হতো। প্রথমে যে বার্ষিক নাটক হচ্ছিল সেখানে আমি অভিনয় করলাম। তারপর অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা একদিন আমাকে বললেন, মুনীর চৌধুরী একটা নাটক করবেন, তিনি আমার কাছে ছেলে চেয়েছেন, তুমি কালকে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা কর। আমি তো খুব উত্তেজিত হয়ে পরের দিনই অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বললেন— আমার নতুন নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’-এ অভিনয় করবে। বাসায় এসো। তখন তার বাসাতেই রিহার্সাল হতো। আমরা আরও অনেকে গেলাম। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী লিলি ভাবী ছিলেন, ফেরদৌসী ছিল। ফেরদৌসীর সঙ্গে সেখানেই আমার প্রথম পরিচয়। রক্তাক্ত প্রান্তর-এ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, আসকার ইবনে সাইখ ও নূর মোহাম্মদ মিয়াও আমাদের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন।

 

ফেরদৌসী ম্যাডাম তখন কোথায় পড়াশোনা করতেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। আমাদের কমন ক্লাস ছিল স্যোসিওলজি—সাবসিডিয়ারি ক্লাস। ১৯৬২ সালের ১৯ এবং ২০ এপ্রিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ তারই পরিকল্পনায় অভিনীত হলো। বাংলা একাডেমি তখন একটা নাট্য মৌসুম করত। তখন তো ভালো নাটকের খুব একটা চর্চা হতো না, সে জন্য বাংলা একাডেমি উদ্যোগ নিয়ে কিছু নাটক প্রকাশ করত এবং ড্রামা সিজন বলে ওরা দু-তিনটা নাটক একসঙ্গে অভিনয়ের আয়োজন করত। কখনো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আবার কখনো বাংলা একাডেমির তৃতীয় তলায় হতো। তৃতীয় তলায় লম্ব্বা একটা অডিটোরিয়ামের মতো ছিল। সেখানে একই নাটকের দুটা-চারটা শো-ও হতো, রাতে। আর ’৬১-’৬২ সালে হলের নাটক করেছি। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলো। কেন্দ্রটা তখন কার্জন হলের দোতলার একটা রুমে ছিল। টিএসসির জামান সাহেব ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি উদ্যোগ নিলেন, ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠী, ছাত্র-শিক্ষক সংগীতগোষ্ঠী, ছাত্র-শিক্ষক সাহিত্যগোষ্ঠী করবেন। সব হল থেকে একজন করে ছাত্রকে নমিনেশন দিতে বলল, তো জগন্নাথ হল থেকে আমাকে নমিনেশন দেওয়া হলো। আগে সেক্রেটারি বলত না, বলা হতো তত্ত্বাবধায়ক। ছাত্র তত্ত্বাবধায়ক ছিলাম আমি আর শিক্ষক তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

 

আপনারা কী ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন?

হ্যাঁ। তো ঠিক হলো যে নাটক করতে হবে। এর মধ্যে আমরা আসকার ইবনে শাইখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। তিনি ছিলেন সাংঘাতিক নাটকপাগল মানুষ। তিনি পরিসংখ্যানের অধ্যাপক ছিলেন। যে কোনো হলে নাটক হলে তিনি ব্যাকস্টেজে কাজ করার জন্য আমাদের নিয়ে যেতেন। আমি তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার পর তিনি বললেন, শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ নামে একটা উপন্যাস বেরিয়েছে, তুমি সেটার নাট্যরূপ দাও। আমি নাট্যরূপ দিলাম। এটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠীর প্রথম প্রযোজনা। ২ ও ৩ মে ১৯৬৩ তে আমরা কার্জন হলে ‘ক্রীতদাসের হাসি’ মঞ্চস্থ করি। তখন তো টিকিটের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু অনেক দর্শক, হলে হৈচৈ হবে। তাই শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ঠিক করলাম বিনে পয়সায় কার্ড সংগ্রহ করে নাটক দেখতে হবে। ওই নাটকে ইকবাল বাহার চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল-মামুন, রেজা চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (বর্তমানে সাংসদ), দিলীপ দত্ত, বদরুদ্দীন, রওশন নবী এরা সবাই অভিনয় করেছিল।

আবদুল্লাহ আল-মামুন তখন কী করতেন?

মামুন আমাদের এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। আমরা ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে এই নাট্যগোষ্ঠীর ব্যানারে মাইকেল মধুসূধন দত্তের ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক করি বাংলা একাডেমির নাট্য মৌসুমে। আমাদের সঙ্গে এই নাটকে মুনীর চৌধুরী, রাজিয়া খান আমিন অভিনয় করেছিলেন। তারপর ‘ভ্রান্তিবিলাস’।

 

আপনি শিক্ষকতায় যোগ দিলেন কখন?

১৯৬৫ সালে এমএ পাস করার আগেই আমি নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই এবং সেখানেও কিছু নাটকের সঙ্গে যুক্ত হই।

 

স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত কি আপনি চৌমুহনী কলেজেই ছিলেন?

না। আমার জীবনের একটা দিক হলো সব জায়গাতেই দুবার করে চাকরি করা। ’৬৫ থেকে ’৬৭ পর্যন্ত আমি ওই কলেজে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ফেরদৌসীর সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই। তখনকার পরিচিত পরিবেশে এই বিয়ে করাটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। তারপর একটা অ্যাডভারটাইজিং ফার্মে চাকরি নিয়ে আমি করাচি চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে বাবা-মাকে আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। বিষয়টি জেনে মা এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে আমাকে ফিরে আসতে হলো। ফিরে এসে করাচির চাকরি ছেড়েই দিলাম। আবার চৌমুহনী কলেজে ঢুকে পড়লাম। তারপর একটা মিথ্যাচার করলাম বাবা-মার সঙ্গে। তারা যখন জানতে পারলেন যে, আমি আমার বিয়ের পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল আছি, তখন ঠিক করলেন— জায়গাজমি সব ছেড়ে দিয়ে কলকাতা চলে যাবেন। তো আমি বললাম ঠিক আছে তোমরা যাও, আমি আসছি। এটা ১৯৭০ সালের ঘটনা। মা-বাবা চলে গেলেন আর আমি বাবার পরিকল্পনা মতো নামমাত্র মূল্যে লক্ষ্মীপুরের বাড়ি ও জমিজমা আমাদের পারিবারিক চিকিৎসককে দিয়ে চলে গেলাম করাচিতে। পরে বাবা-মাকে খবর দিলাম যে আমি বিয়ে করেছি।

 

পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এলেন কবে?

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে আমি আর আমার বন্ধু রশিদ আহমেদ ঠিক করলাম যে, ঢাকায় চলে আসব, এসে বিজ্ঞাপনী এজেন্সি করব। ১৯৭১ এর পয়লা মার্চ আমাদের আসার কথা ছিল কিন্তু ওই দিন থেকে পিআইএর যাত্রী আনা বন্ধ হয়ে গেল। শুধু আর্মি পাঠাচ্ছে। এমন সময় সরকার কবির উদ্দিন, বিমানের, সে আমাদের দুটো টিকিটের ব্যবস্থা করে দিল। আমরা কলম্ব্ব হয়ে ৯ মার্চ ঢাকা পৌঁছলাম। পৌঁছে তো দেখি উত্তাল অবস্থা। ৭ মার্চের পর থেকেই তো ভিন্ন পরিবেশ। আমার পরিচিত ছিল বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার রেজা আলী। তিনি বললেন— কী আবার নতুন এজেন্সি খুলবেন, আমার সঙ্গেই থেকে যান। তখন আমি কপিরাইটার হিসেবে বিটপীতে এক মাস থাকলাম। তখন তো বিজ্ঞাপনের ট্রেন্ডই পাল্টে গেছে। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। আমরা ঠিক করলাম ২২ মার্চ একটা সাপ্লিমেন্ট বের করব ‘বাংলার স্বাধিকার’ নাম দিয়ে। যাতে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের কিছু বের না হয়। এর জন্য বঙ্গবন্ধুর একটা বাণী দরকার। আমার হাতেই একটা বাণী লিখলাম এবং বঙ্গবন্ধুর কাছে তা নিয়ে গেলে আমার হাতের লেখা সেই বাণীর নিচেই বঙ্গবন্ধু সই করে দিলেন। সেটা সেভাবেই পত্রিকায় তিন কলামজুড়ে ছাপা হয়েছিল। এখনো অনেক জায়গায় ওই বাণীটি ব্যবহৃত হয়। অনেকেই ভাবে ওটা বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা, আসলে সেটি আমার হাতের লেখা।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় কী ঢাকাতেই ছিলেন?

২৫ মার্চ আমরা ছিলাম সেন্ট্রাল রোডে ফেরদৌসীদের পুরনো বাড়িতে। তারপর ঠিক করলাম, না, এখানে থাকা ঠিক নয়। তখনো আমাকে কেউ আজকালকার মতো চেনে না। তারপর ১১ মে আমি আর ফেরদৌসী আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যাক সে অনেক ইতিহাস। তো আগরতলা থেকে এক সপ্তাহ পর আমরা পরে গেলাম কলকাতা, বাবা-মার কাছে। এই প্রথম তারা ফেরদৌসীকে দেখলেন। খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

 

ওই সময় তো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হয়েছিলেন?

আমার ইচ্ছা ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেব। সেখানে সৈয়দ হাসান ইমাম ছিলেন; তিনি বললেন— নিজ নামে খবর পাঠ করতে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তাতে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া আমার আত্মীয়দের অসুবিধা হবে। তাই আর স্বাধীন বাংলা বেতারে ঢোকা হয়নি। তখন একটা নাটক, আবৃত্তি ও কিছু কথিকা পাঠে অংশ নিয়েছি। কলকাতায় আমি ছয় মাস ছিলাম। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর যেসব বক্তৃতা-বিবৃতি (’৭০-এর নির্বাচন থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত) আছে সেগুলো সংগ্রহ করে একটি সংকলন করার চেষ্টা করছিলাম। ওই পাণ্ডুলিপি নিয়েই দিল্লি গিয়েছিলাম।

 

ফেরদৌসী ম্যাডাম তো জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ফেলোশিপ পেয়েছিলেন।

হ্যাঁ। ফেরদৌসীর একটা ফেলোশিপের ব্যবস্থা হয়। আমরা চলে গেলাম দিল্লি। সেখানে মি. দাশগুপ্ত নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি এএসপি অ্যাডভারটাইজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রী যোগ চ্যাটার্জির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার কাজ জুটে গেল। এভাবে আমাদের দিল্লিতে থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়।

 

বুদ্ধিজীবী হত্যার খবর পেলেন কখন?

আমাদের পাড়ায় অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান থাকতেন। তিনি হঠাৎ রাতে এসে বেল টিপলেন। আমি নিচে যেতেই বললেন— মুনীর চৌধুরীসহ আরও অনেককে তো মেরে ফেলেছে। তো এ খবর ফেরদৌসীকে কীভাবে দিই! পরে আস্তে ওকে প্রিপেয়ার করে খবরটা দিলাম। খবর শুনে তো ও শয্যাশায়ী। পরে আবার শোনলাম, কবীর চৌধুরীকেও মেরে ফেলেছে।

 

তখন তো কবীর স্যার বাংলা একাডেমির পরিচালক।

হ্যাঁ। তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন। কিন্তু পরে অনেক কষ্টে জেনেছি যে, না তিনি বেঁচে আছেন।

 

দেশে ফিরলেন কখন?

২৫ জানুয়ারি, ১৯৭২। প্রথমে দিল্লি থেকে কলকাতা আসি ১০ জানুয়ারি। তারপর তো স্বাধীন দেশে ফিরে এলাম।

 

‘থিয়েটার’ দল গড়ে তুললেন কখন?

১৯৭২ সালে এসেই মাথার মধ্যে ঢুকল, এবার তো নাটক করতে হবে ঠিকমতো। ততদিনে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনও তুঙ্গে উঠেছে। তো আমরা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও ভাবতাম যে, দেশ স্বাধীন হলে এ রকম শুরু করব। ইতিমধ্যে দিল্লিতে থাকার সময় তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গেও পরিচয় হয়। ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারিতেই বাংলা একাডেমিতে কবীর চৌধুরী সাহেবের রুমে বসে আমরা ‘থিয়েটার’ নামে একটা দল গঠন করি। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেরদৌসী মজুমদার, ইকবাল বাহার চৌধুরী, আহমেদ জামান চৌধুরী বেশ কয়েকজন প্রথম থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।

 

আপনারা তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাটক প্রযোজনা করেছেন। অনুবাদ নাটকও মঞ্চস্থ করেছেন।

আমরা প্রথমে মঞ্চস্থ করলাম আবদুল্লাহ আল-মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’। ১৯৭৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমরা মঞ্চে আনি ‘এখন দুঃসময়’। দর্শকরা আমাদের নাটক খুব ভালোভাবে নিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের দল থিয়েটার নাটক করবে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া জীবন কাহিনী নিয়ে। ওই যে শুরুতে ভেবেছিলাম ক্লাসিক্যাল বা সাহিত্যনির্ভর নাটক করব সেখান থেকে আপাতত সরে গেলাম। সে কারণে পরবর্তী প্রযোজনা ছিল আমাদের ‘চারিদিকে যুদ্ধ’। প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিল আবদুল্লাহ আল-মামুন। নির্দেশনাও তারই ছিল। তারপর করি ‘চোর চোর’, তাতে মিতা চৌধুরী করেছিল প্রধান চরিত্রটি। আমরা সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ করার পর সফলতা পেলাম। এর পর হক ভাইকে ধরলাম, তিনি ‘ম্যাকবেথ’ অনুবাদ করে দিলেন। অসাধারণ অনুবাদ। একেবারে ক্ল্যাসিক নাটকের ক্ল্যাসিক অনুবাদ। তৎসম শব্দের এত ব্যবহার করেছেন, অথচ সংলাপ উচ্চারণে কোনো অসুবিধা হয়নি। এরপর ‘ওথেলো’ করলাম। আমাদের নাটকগুলো প্রশংসিত হয়েছে।

 

‘থিয়েটার’ পত্রিকা সম্পাদনা করছেন সেই ১৯৭২ সাল থেকে। আমাদের থিয়েটার চর্চায় এর বিশাল একটা ভূমিকা রয়েছে।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে আমি ‘থিয়েটার’ পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা বের করি। প্রথম সংখ্যাটি মুনীর চৌধুরী স্মারক সংখ্যা। তারও একটা ছোট ইতিহাস আছে। প্রথমে আমি ভাবলাম পত্রিকাটি বড় ফরমেটে ছাপাব। দুই ফর্মা ছাপিয়েছিও, এমন সময় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেবের সঙ্গে দেখা। তিনি শুনে বললেন— সর্বনাশ আপনি তো ওই ফরমেটে করলে মারা যাবেন, খরচ প্রচুর। এক কাজ করুন আমার ‘কণ্ঠস্বর’-এর সাইজে করুন (বর্তমানে থিয়েটার যে সাইজে আছে)। তো আমিও মেনে নিলাম। পত্রিকাটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ সাড়া পেলাম। কেউ ভাবতেই পারেনি যে, কেবল নাটক আর নাটক বিষয়ক প্রবন্ধ দিয়ে একটা পত্রিকা বের হতে পারে। তখন কোনো প্রকাশক কিন্তু নাটকের বই ছাপত না। থিয়েটার পত্রিকা একেবারে নিয়মিতভাবে মঞ্চে আসা নাটকগুলো ছাপাত। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা এর মার্কেটিং করেছিলেন চমৎকারভাবে। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশ করছি। আমার প্রচুর নাটক, নাটকবিষয়ক গবেষণাধর্মী লেখা এ পত্রিকায় ছেপেছি।

 

দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চার শুরুও তো আপনারা করলেন।

আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করব। নাগরিক সবার আগে করল। ব্রিটিশ কাউন্সিলে পরপর ১২ সপ্তাহ, তখন তো রবিবার সকাল ছিল প্রাইম টাইম। পরপর ১২টি প্রদর্শনী মানে তো ভাবাই যায় না। নাট্য প্রদর্শনীর টিকিটের হার ছিল ১০, ৫, ৩ টাকা। এখন তো নিয়মিত দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চা হচ্ছে।

 

আপনি বেশ কিছু নাটকের নির্দেশনাও দিয়েছেন।

আমরা ১৯৭৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ‘কবর’ নাটক মঞ্চস্থ করেছিলাম। সেটি আমার নির্দেশনায় ছিল, তবে নিয়মিত নাটক মঞ্চে আনার জন্য আমাদের ’৭৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। চুয়াত্তরে ‘সুবচন নির্বাসনে’ হলো, এটা আবদুল্লাহ আল-মামুনের রচনা ও নির্দেশনায় এলো। নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল মহিলা সমিতি মঞ্চে।

 

আপনি রেডিও, টেলিভিশন, মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি সংবাদ পাঠ করেছেন দীর্ঘদিন। সে অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

আমি মঞ্চাভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করছি ১৯৫৮ সাল থেকে। বাংলাদেশ বেতারে ১৯৬১ সাল থেকে নাট্যশিল্পী ও ১৯৭২ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সংবাদ পাঠক; টেলিভিশনের প্রথম নাটক (১৯৬৫) থেকে নাট্যশিল্পী ও ১৯৭২ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সংবাদ পাঠক হিসেবে কাজ করেছি। সে অভিজ্ঞতা মধুর।

 

নাটকে এক ধরনের সেন্সরশিপ নাকি ছিল, নাগরিকের কোন নাটক নাকি বন্ধ করে দিয়েছিল। এ ব্যাপারে কিছু মনে পড়ে?

হ্যাঁ, যদ্দুর মনে পড়ে, কোনো এক সচিব নাটক দেখতে এসেছিলেন, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাটক। নাটকের নামটি মনে আসছে না। দেখে এসে তিনি বললেন, এন্টারটেইনমেন্ট ট্যাক্স দেওয়া হচ্ছে না, তাই নাটক বন্ধ। পুলিশ মহিলা সমিতিতে এসে জানিয়ে দিল সেন্সর না করালে ও ট্যাক্স না দিলে নাটক করা যাবে না। তারপর আমরা প্রায় ছয় মাস নাটক বন্ধ রাখলাম। কেবল এর কাছে যাচ্ছি, ওর কাছে যাচ্ছি...। সরকারের বক্তব্য যে, আমরা দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করি সুতরাং আমাদের নাকি প্রচুর আয় হয়, তাহলে আমরা ট্যাক্স দেব না কেন। আমাদের কাছে খুবই হাস্যকর মনে হলো। তো এমন এক সময় বঙ্গবন্ধু গেলেন রামপুরা টেলিভিশন সেন্টারে। সেখানে আবদুল্লাহ আল মামুন ছিল, কাছে ডেকে বললেন— কী তোমাদের নাটক কেমন চলছে? মামুন বলল, নাটক তো আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন— আমি বন্ধ করে দিয়েছি মানে? তখন মামুন সব বলল। শুনে পাশে থাকা অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিককে বঙ্গবন্ধু বললেন, এদের কাছ থেকে টাকা না নিলে সরকার চালানো যাবে না? মামুনকে পরের দিন গণভবনে দেখা করতে বললেন। ব্যস, পরদিনই আমি আর মামুন গিয়ে হাজির গণভবনে। সেখানে তার সেক্রেটারি ছিলেন ড. ফরাসউদ্দিন, মামুনের ক্লাসমেট ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সব শুনে বললেন, ট্যাক্স মওকুফ করা যায় শৌখিন নাট্যদল হিসেবে, কিন্তু সেন্সর একেবারে উঠানো যাবে না। বরং এটা পুলিশের হাত থেকে এনে একটা সেন্সর বোর্ড করে তার হাতে দেওয়া যায়। মন্ত্রণালয়ে গেলে অনেক দেরি হবে, তাই রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করতে বললেন। তার পরদিনই রাষ্ট্রপতির আদেশ বের হলো, প্রমোদকর রহিত আর সেন্সর কমিটি হবে শিল্পকলা একাডেমির অধীনে। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন কোরবান আলী। তখন থেকে আমরা টিকিট বলতে শুরু করি, আগে তো বলতাম প্রবেশপত্র।

 

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন কীভাবে গড়ে তুললেন?

আসলে ’৮০-র আগেই অনেকের মনে হচ্ছিল যে একটা ফেডারেশন করা যায় কিনা। কিন্তু অনেকেই আবার সন্দেহ করছিল যে, গণ্ডগোল হবে, মনোমালিন্য হবে, তাই কেউ আর এগোয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা সব দল মিলে একটা ঢাকা নাট্যোৎসব করেছিলাম এবং সেটা বেশ সফলও হয়েছিল। তখন আমার মনে হলো যে, না একটা ফেডারেশন করা যায়। তখন আমি থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্ব্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সবাইকে এক মতবিনিময় সভায় আহ্বান করলাম যে— আলোচনা করে দেখি ফেডারেশন করা উচিত কি উচিত নয়। সেদিন সভায় ঢাকার ২১টি দলের প্রতিনিধি এবং জেলা শহরের ১৫টি দলের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা ফেডারেশন গঠন করব। পরে আরেকটি সভায় আমরা বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের প্রথম সম্মেলন হলো ২৩ আগস্ট ১৯৮১। প্রথম দুই টার্ম আমি সভাপতি আর নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিল সেক্রেটারি জেনারেল। এখন তো তিনশর অধিক নাট্যদল ফেডারেশনের অধীনে কাজ করছে।

 

আইটিআইর সদস্যপদ পেলেন কীভাবে?

১৯৮১ সালে আমরা সিউলে নাটক করতে গিয়ে পরিচয় হলো ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে। আমি তার সঙ্গে বৈঠক করলাম। তাকে জানালাম যে, আমরা সদস্য হতে চাই। পরে তারা লিখল— তোমাদের কি প্রফেশনাল থিয়েটার আছে? আমি লিখলাম না। তখন তিনি জানালেন তাহলে তো হবে না, এটা প্রফেশনাল থিয়েটারের ফোরাম। তাদের বোঝালাম যে, এটাই আমাদের মেইন স্ট্রিম থিয়েটার, আমরা প্রফেশনাল অ্যাটিচিউড নিয়েই কাজ করি। আমি একাই এই পত্রযুদ্ধ করছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল, দেখি না কদ্দুর কী হয়। শেষে ওরা বলল, হ্যাঁ এদের সদস্য করা যায়। ১৯৮১ সালের নভেম্ব্বরে তারা আমাদেরকে অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপ দিল। এ পর্যন্ত আমাদের দেশে ১১টি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ব আইটিআইর দ্বিবার্ষিক প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড অব থিয়েটার’ আমরা বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ করি। এটাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সম্মান বাড়িয়েছে।

 

আইটিআইর বাংলাদেশ শাখা কবে চালু করলেন?

১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে আতাউর রহমানের বাসায় অনেককে ডেকে আইটিআইর ব্যাপারটা জানালাম এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র খুলব। সেটাও সম্ভব হলো। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত করলাম কবীর চৌধুরীকে আর আমি সাধারণ সম্পাদক। আইটিআইর মাধ্যমে আমাদের নাট্যকর্মীরা বিভিন্ন দেশের বিশ্বমানের নাটক দেখার সুযোগ পান। একইভাবে বিদেশিরা আমাদের নাটক দেখতে পারেন। আমরা আমাদের নাটক বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারি।

 

আইটিআইর বিশ্বসভাপতি ও বর্তমানে সাম্মানিক সভাপতি হিসেবে আপনার প্রত্যাশার প্রাপ্তি কতটুকু?

আমি আইটিআই বিশ্বসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে নাট্যচর্চাকে আরও বেগবান করার চেষ্টা করে আসছি। আন্তর্জাতিকভাবে থিয়েটারের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও এনেছি। বিশ্বসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমি যেভাবে কাজ করতে চেয়েছি, তার অনেকটাই করতে পেরেছি। আমি সন্তুষ্ট। আইটিআইর সাম্মানিক সভাপতি হিসেবেও আমাদের নাটককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছি ।

 

থিয়েটার স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা জানতে চাই—

আমরা থিয়েটার স্কুল প্রতিষ্ঠা করি ১৯৯০ সালে। বর্তমানে এর নাম আবদুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুল। ‘থিয়েটার স্কুল’ নিয়ে একটা স্বপ্ন আছে। এই স্কুলের জন্য একটা নিজস্ব ভবন তৈরি করতে চাচ্ছি। থিয়েটার স্কুলের যে প্রসার হয়েছে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সেটা চালাতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। অনুদান নিয়ে আসলে সুস্থিরভাবে কাজ করতে পারি না, তাই ভাবছি এক কোটি টাকার একটা ফান্ড তৈরি করব। ওই টাকাটা ব্যাংকে রাখলে মাসে মাসে যা আসবে তাই দিয়ে চলে যাবে। যদি কোনো পরিত্যক্ত জায়গা পাই তাহলে বিল্ডিং করার মতো টাকা জোগাড় করতে পারব। সেখানে একটা স্টুডিও থিয়েটারও থাকবে।

 

বাংলাদেশের তরুণ নির্দেশকদের কাজ নিয়ে আপনার মন্তব্য—

তরুণরা অনেক নীরিক্ষাধর্মী কাজ করছে এবং ভালো কাজ করছে। তবে বেশির ভাগ ঝুঁকছে বর্ণনাত্মক রীতির নাটকের দিকে। এটা তো আমার কাছে মনে হয় নাট্য রচনার ক্ষেত্রে একটু দুর্বলতা। আমি যখনই নাটকটা মেলাতে পারব না তখন বর্ণনা দিয়ে মেলানোর চেষ্টা করব। সে জন্য আমি মনে করি, বর্ণনাত্মক রীতির নাটকের পাশাপাশি সত্যিকার অভিনয়নির্ভর নাটক করলে ভালো হবে। এখন যতটা না আমাদের ক্ষমতা তার চেয়ে দল বেশি। সুতরাং প্রযোজনা মান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য আমরা দর্শকও হারাচ্ছি।

 

আপনি কী মনে করেন আমাদের নাট্যকার বা নাটকের অভাব আছে?

খুবই অভাব। আমাদের প্রধান নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল-মামুন, সেলিম আল দীন, এস এম সোলায়মান চলে গেছেন। সুতরাং ওই মাপের নাট্যকার তো হচ্ছে না।

 

ঢাকার দলগুলো নিজস্ব নাট্যকারের নাটক প্রযোজনা করে। অন্য দল সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এটা মুসকিল। ঢাকার বাইরে অন্য দল এসব নাটক প্রযোজনা করতে পারে। আমি মনে করি, এটা উন্মুক্ত হওয়া উচিত। এটা তো নাট্যকারের ওপরও নির্ভর করে।

 

আমাদের নাট্য উৎসবগুলোয় অনেক বিদেশি দল আসে। কিন্তু গুণগত মানের নাটক খুবই কম।

এটা অনেকখানি সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশের সঙ্গে যে দলের সম্পর্ক ভালো তারা সেই দলের নাটক নিয়ে আসে। আমাদেরও যায়। কিন্তু সত্তর বা আশির দশকে সেরা দলগুলোর নাটক দেখে সেরা নাটকটিকেই উৎসবে আমন্ত্রণ জানাতাম। 

 

আমাদের ভালো নাটকগুলোর অনুবাদের বড় অভাব, কী করা যেতে পারে?

খুব সত্যি কথা। আমাদের ভালো নাটকগুলো বিদেশি ভাষায় অনুবাদের অভাবে বিদেশিরা এসব নাটক মঞ্চস্থ করতে পারে না। হাতেগোনা কয়েকটি নাটক অনুবাদ হয়েছে। এক্ষেত্রে ভালো অনুবাদকদের এগিয়ে আসা দরকার। আমি একটি কাজ হাতে নিয়েছি। ১০টি বাংলা নাটক অনুবাদ করছি। বাংলা একাডেমি বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহী হয়েছে। আমি বলব, কেবল নাটক নয়, আমাদের সাহিত্যের সেরা লেখাগুলো অনুবাদ হওয়া উচিত। এই যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, এটা একটা আবেগের ফসল। সবার আগে প্রয়োজন ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক ও গুণগত মানের অনুবাদ। সাহিত্য যত বেশি অনুবাদ হবে, মানুষ আমাদের সম্পর্কে তত বেশি জানতে পারবে।

 

তরুণ নাট্যকর্মীদের জন্য আপনার উপদেশ কী?

উপদেশ কিছু না। উপদেশ হলো নিষ্ঠা। আমি জানি, জীবন অনেক কঠিন হয়ে গেছে। সত্তর বা আশির দশকে একজন নাট্যকর্মীর জন্য যে সময় আশা করতাম এখন তা করতে পারি না। আমি বলব, যতটুকু সময় নাট্যকর্মীরা দলকে দিতে চান তা যেন নিষ্ঠার সঙ্গে দেওয়া হয়।  তবে নাটক যদি করতেই হয় তাহলে স্বাভাবিক কিছু কাজ বাদ দিতে হবে। প্রতিভা থাকলে তার বিকাশ হবেই।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow