Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ জুন, ২০১৬ ২২:২৬
গুগলে বাংলাদেশি বৃষ্টি
গুগলে বাংলাদেশি বৃষ্টি

বাংলাদেশের মেয়ে বৃষ্টি শিকদার। পড়াশোনা করছেন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে।

স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ার সময় গুগলে ইন্টার্নশিপ শুরু করেন। যখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন তখন তাকে চাকরির জন্য ডাকছে বিশ্বসেরা তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। সে তালিকায় রয়েছে গুগল, মাইক্রোসফট, টুইটার, রভি, ইন্ডিড এবং কোড়া। সম্প্রতি গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে এসেছেন। তার গল্পই শোনাচ্ছেন— নাদিম মজিদ

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুয়েটসে অবস্থিত ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ফিজিক্যাল সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এটি সাফল্যের উদাহরণ। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সেরা কোম্পানিগুলোও মুখিয়ে থাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী হিসেবে পেতে। সাপ্তাহিক বা মাসিক সেমিনারে তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাজির হন। বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেন। উদ্বুদ্ধ করেন নিজের প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে। বিশ্বে সুপরিচিত এ প্রতিষ্ঠানে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন বাংলাদেশি মেয়ে বৃষ্টি শিকদার। পড়ছেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ার সময় পেয়েছেন গুগলে তিন মাসের ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ। এ বছর তাকে অফার করছে গুগল, টুইটার, ফেসবুক, কোডাসহ বিশ্বের নামকরা পাঁচটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।

মাধ্যমিকে শোনেন এমআইটির নাম।

ছোটবেলা থেকে গণিতের প্রতি ভালোবাসা ছিল। গণিতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেন সময় পেলে। গণিত এবং ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। গণিতে অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া নাজিয়ার কাছ থেকে শুনেছিলেন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটির কথা। ‘তখন আমি চিটাগাং গ্রামার স্কুলে ও লেভেলে পড়ি। গণিত অলিম্পিয়াডের মাধ্যমে নাজিয়া আপুর সঙ্গে পরিচয়। তিনি ২০০৯ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিনিধিত্ব করে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। তিনি আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে এমআইটিতে ভর্তির সুযোগ পেলে সে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম শুনেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট ঘেঁটে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য আমাকে মুগ্ধ করে। ’

হাই স্কোরিং ফিমেল অ্যাওয়ার্ড

আসরটি বসেছিল ২০১২ সালে ইতালির মন্টিকেরি শহরে। ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন চার প্রতিযোগী। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের এই প্রতিযোগিতায় নারী প্রতিযোগী হিসেবে বৃষ্টি শিকদারও গিয়েছিলেন। বৃষ্টি সেখানে ১৬৯ স্কোর তুলে ‘হাই স্কোরিং ফিমেল অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। আরও পেয়েছেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নকশায় বানানো লকেট। সে আসরে তিনি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এখনো পর্যন্ত বৃষ্টিই বাংলাদেশ থেকে এই অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া একমাত্র নারী ব্রোঞ্জ বিজয়ী।   

দুই বছর পর কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডেও ব্রোঞ্জ জিতেছেন। তখন তিনি পড়তেন চিটাগাং গ্রামার স্কুলে। চিটাগাং গ্রামার স্কুল থেকে ও লেভেল এবং এ লেভেল সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে দেওয়া ও লেভেল পরীক্ষায় ৯৬ নম্বর পেয়ে কম্পিউটিংয়ে পেয়েছিলেন ওয়ার্ল্ড হায়েস্ট মার্কস। রসায়ন এবং বাংলাদেশ স্টাডিজে ছিল তার দেশসেরা মার্কস। দুটি বিষয়ে তার নম্বর ছিল ১০০ তে ১০০। ২০১৩ সালে দেওয়া  এ লেভেল পরীক্ষায় পদার্থ ও রসায়নে ৯৬ করে, জীববিজ্ঞানে ৯৪ এবং কম্পিউটার শিক্ষায় ৯৪ পেয়ে দেশসেরা মার্কস পেয়েছেন।  

২০১৪ ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হয়েছেন বৃষ্টি শিকদার। ২০১৫ সালের ২৫ মে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে এসে তার চিটাগাং গ্রামার স্কুল এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে মেয়েদের প্রোগ্রামিং বিষয়ে কর্মশালায় ক্লাস নিয়েছেন। তাকে উপলক্ষ করেই সাজানো হয়েছিল সে কর্মশালা। মেয়েদের জন্য প্রোগ্রামিং কেন গুরুত্বপূর্ণ জানতে চাইলে বৃষ্টি বলেন, ‘১০ বছর আগে যে কাজ হাতে করা হতো, এখন সে কাজ কম্পিউটারে করা হচ্ছে। এখন যে কাজ হাতে করা হচ্ছে, ১০ বছর পরে তা কম্পিউটারে করা হবে। প্রোগ্রামিং না জানলে পিছিয়ে থাকতে হবে। তাই মেয়েদেরও প্রোগ্রামিং শিখতে হবে। ’

গুগলের অভিজ্ঞতা : ১৫ জুন থেকে ৪ সেপ্টেম্বর বৃষ্টি তথ্যপ্রযুক্তির জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান গুগলে ইন্টার্নশিপ করার জন্য ডাক পেয়েছেন। সচরাচর বাংলাদেশিরা চূড়ান্ত বর্ষে গুগলে কাজ করার ডাক পান। সেখানে তিনি প্রথম বর্ষেই সুযোগ পেয়েছেন। গত বছর বৃষ্টি কাজ করেছেন গুগলের হেডকোয়ার্টারের মাউনটেন ভিউ অফিসে। প্রথম সপ্তাহ ছিল ‘ওরিয়েন্টেশন উইক’। সেখানে তাদের গুগলের নানা প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। পরে ইন্টার্নরা মিলে খেলাধুলায় অংশ নেন। ফটো-বুথে ছবি তোলেন।

বৃষ্টি গুগল ট্রান্সলেট দলে কাজ করেছেন। তার কাজ ছিল ছবির ভিতরের লেখা অনুবাদ করা। সে কাজের গল্প শোনালেন, ‘প্রথম সপ্তাহে গুগলের বিশাল কোড বেস দেখে কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দলের অন্য ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নিলাম। ’ কাজের পাশাপাশি বেড়াতেও গিয়েছেন। দলের সবাই একটা লেকে ঘুরেছেন। ক্যানু উল্টে গিয়ে পানিতেও পড়ে গেলেন। পরে উদ্ধারকারী এসে উদ্ধার করল। আরেকবার সান ফ্রান্সিসকোতে নৌকা ভ্রমণ করেছেন।

গুগলে সহকর্মীদের জন্মদিন অফিসে উদযাপন করা হয়। বৃষ্টির জন্মদিনে গুগলে সবাই মিলে কেক কেটেছেন। গল্প করেছেন। শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে। তার বিভাগের ম্যানেজার অ্যালেক্স তাকে কয়েকটি বইও উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্ট্রেলিজেন্স নামের একটি বইও ছিল। এই বইয়ের অন্যতম সহ-লেখক পিটার নর্ভিগ সম্পর্কে ম্যানেজার তাকে বলেছেন, তিনি তাদের গুগলের রিসার্চ ভবনেই কাজ করেন। চাইলে তার সঙ্গে একদিন লাঞ্চও করা সম্ভব। নিজেকে সামলাতে না পেরে একদিন তার সঙ্গে দুপুরে খেলেন এবং পিটারের অটোগ্রাফসহ বইয়ের আরেকটি কপি উপহার পেলেন।

বৃষ্টি গুগলের ডব্লিউপ্লাসপ্লাস নামের উইমেন ইমপারওয়ার্ড নামের দলেও নাম লিখিয়েছেন। ফলে গুগলের ঊর্ধ্বতন ইঞ্জিনিয়ার মেলোডি ম্যাকফেলেস এবং রোজ হায়েসের সঙ্গে কফি খাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়াও তার দলের স্টানফোর্ড, প্রিন্সটন এবং হার্ভার্ডের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। টিজিআইএফ (থ্যাংক গড ইটস ফ্রাইডে) নামের একটি অনুষ্ঠানে গুগলের দুই প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ এবং সার্জি ব্রেন গুগলের নানা বিষয় নিয়ে কর্মীদের প্রশ্নের জবাব দেন। তেমন অনুষ্ঠানেও বৃষ্টি যোগদান করেছেন। এবারের ইন্টার্নশিপ কোডায় : বৃষ্টির পড়াশোনা, ইনফরমেটিকসে অলিম্পিয়াডে সাফল্য এবং গুগল অভিজ্ঞতার কারণে এ বছর নামকরা ছয়টি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার ডাক পেয়েছেন। গুগল, মাইক্রোসফট, টুইটার, রভি, ইন্ডিড এবং কোডা তাকে এ গ্রীষ্মের ছুটিতে কর্মী হিসেবে চাচ্ছে। তবে বৃষ্টি যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোডায়।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow