শিরোনাম
প্রকাশ : ১ মে, ২০২১ ০২:০৪
আপডেট : ১ মে, ২০২১ ০২:০৭
প্রিন্ট করুন printer

সাতক্ষীরায় উপকূল জুড়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকট

মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরায় উপকূল জুড়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকট
দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করছেন তারা।
Google News

ভাত-রুটি না খেয়ে একবেলা থাকা যায়। কিন্তু পানি না খেলে একমুহূর্ত কাটানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে তীব্র গরমে জীবন বাঁচাতে দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে দুর্গাবাটি সাইক্লোন সেল্টারে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করতে এসেছেন। কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের তাপসি মণ্ডল।

তার পাশে দাঁড়িয়ে পানি নিতে আসা একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পঞ্চাশোর্ধ্ব কতবানু বিবি জানান, ৫ মাস ধরে আকাশে কোনো বৃষ্টি নেই। খাবার পানির অধিকাংশ পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। রোজার মধ্যে বাধ্য হয়ে ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কিছু দিন আগেও কর্দমাক্ত দুর্গন্ধময় পানি জীবন বাঁচাতে সংগ্রহ করে তাদের বাধ্য হয়ে খেতে হয়েছে। আরডব্লিউএইচ, পিএসএফসমূহ যথাযথভাবে কাজ না করায় সে গুলোও নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় সেসরকারি সংস্থা লিডার্স’র সহায়তায় দুর্গাবাটি সাইক্লোন সেল্টারে আসা তাপসি মণ্ডল, কতবানুর মতো পায়ে হেঁটে আরও ৩ থেকে ৪ গ্রামের শত শত মানুষ এসেছেন সুপেয় পানি নিতে। কলস নিয়ে পানি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের র্দীঘ অপেক্ষা। এমন চিত্র এখন বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ গোটা কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার উপকূল জুড়ে।

এখানে মাঠের পর মাঠ ধু ধু বালুচর। খাল-বিলে পানি নেই। ২/৩ মাসের মধ্যে আকাশের বৃষ্টি না হওয়ায় পানির অধিকাংশ উৎসগুলো শুকিয়ে গেছে। নলকূপে পানি ঠিকমতো উঠছে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর চারদিকে পানি আর পানি কিন্তু সর্বত্রই লবণ পানি। উপকূলের কিছু কিছু এলাকার দুই একটি গভীর নলকূপে দীর্ঘসময় ধরে হ্যান্ডেল চেপে চেপে যত-সামান্য পানি উঠলেও তাও আবার নোনা পানি। পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে।

দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এবং পানির স্তর নেমে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৬৩৮টি গভীর, ৩৫৮টি অগভীর নলকূপ ছাড়াও ৩৯৭টি ভিএইচএসটি, ৪৮৩টি এসএসটি, ১০৯৮টি আরডব্লিউএইচ এবং ৫৬৬টি পিএসএফ’র মাধ্যমে স্থানীয়দের আর এখন পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, নীলডুমুর, গাবুরা, পদ্মপুকুর, ভেটখালি, কৈইখালি, নলখাগড়া, তালবাড়িয়া, কুটিকাটা, কাঁঠালবাড়িয়া, কাছিহারানি, কাশিপুর, হেঞ্চি, আটুরিয়া, ছোটকুপোট আশাশুনির প্রতাপনগর, শ্রীউলা, বলাবাড়ীয়া, শ্রীউলা এবং কালিগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা ও মথুরেশপুর, হাড়ৎদাহ-সহ আশেপাশের অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তীব্র খাবার পানি সংকট চলছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ তীব্র বিশুদ্ধ খাবর পানি সংকটে রয়েছে।

এদিকে, গত ২১ এপ্রিল থেকে সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের আওতায় ৬ হাজার লিটার বিশুদ্ধ সুপেয় পানি উপকূলবাসীকে সরবরাহ করে যাচ্ছে। সেটি অবশ্য প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে দাবি এলাকাবাসীর।

সাতক্ষীরা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র মতে, ২০১৮ সালে খাবার পানি নিয়ে উপকূলবাসীর সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় পুকুর, দীঘি, জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করে। একেকটি পুকুরের ব্যয় ধরা হয় ১৯ লাখ থেকে ৬৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। যার অংশ হিসেবে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জেলা পরিষদের ৪৭টি পুকুর খনন করে পিএসএফ দেওয়া হয় খাবার পানির জন্য। পুকুরগুলোর পূর্বকার পাড় হতে ১৮ ফুট গভীর হওয়ার কথা ছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে খননকৃত প্রতিটি পুকুর পাড়ের ওপর ২/৩ ফুট মাটি ফেলে গভীরতা অক্ষুন্ন রাখে। ফলে খনন কাজে শুভংকরের ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে।

সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আরশাদ আলী জানান, জেলায় গভীর, অগভীর নলকূপ, ভিএসএসটি, এসএসটি, পিএসএফ, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং-সহ মোট ৪৩৯৮১টি সুপেয় পানির উৎস রয়েছে। এর মধ্যে আশাশুনিতে ৬৫১১টি এবং শ্যামনগরে রয়েছে ৫৪৫১টি। বিশেষ করে উপকূল অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২৫ থেকে ৩০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে না। অকেজো হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ আরডব্লিউএইচ, পিএসএফ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে দেশের দক্ষিণ এই জনপদে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে বৃষ্টি হলে কিছুটা সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

বিডি প্রতিদিন/এমআই

এই বিভাগের আরও খবর