Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মে, ২০১৯ ২২:২৬

সীমাহীন নিষ্ঠুরতা পথে পথে

মানবপাচারে ভয়ঙ্কর রুট

সাঈদুর রহমান রিমন

সীমাহীন নিষ্ঠুরতা পথে পথে

‘মৃত্যু’ অথবা স্বপ্নের ‘আমেরিকা-ইউরোপ’। মানব পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে একটু স্বচ্ছন্দময় জীবনের আশায় অনেকটা জেনেশুনেই অনেক যুবক ঝাঁপ দিচ্ছেন নিশ্চিত মৃত্যুকূপে। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুরাশি, পাহাড়-পর্বত আর বিপৎসংকুল গভীর বনজঙ্গল পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছেন। পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই ১০-১২টি দেশ পেরিয়ে পৌঁছছেন স্বপ্নের দেশ ইউরোপ-আমেরিকায়। কণ্টকাকীর্ণ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝে মাঝেই ঝরে পড়ছে বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর প্রাণ। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও ঠাঁই হয় কারাগারে।  জানা যায়, অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ব্রাজিল, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা হয়ে মেক্সিকো পৌঁছানোর ভয়ঙ্কর রুট আবিষ্কার করে পাচারকারীরা। এ রুটে তাদের আড়াআড়িভাবে পাড়ি দিতে হয় ভয়ঙ্কর জঙ্গল ‘ড্যারিয়েন গ্যাপ’। ছয় শতাধিক বর্গমাইলের এ দুর্গম বনপথে রয়েছে বড় বড় বিষাক্ত সাপ আর ভয়ঙ্কর সব বন্যপ্রাণী। ‘ড্যারিয়েন গ্যাপ’ পার হয়ে সদ্য আমেরিকায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণ লক্ষ্মীপুরের অধিবাসী ইমতিয়াজ আহমেদ, সোহেল আলম, মাঈনুদ্দিনসহ কয়েকজন স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘টানা ১৪ দিন কোনোরকম খাবার পাইনি। বনের লতাপাতা আর শুধু নদী-ছড়ার পানি খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ১৯ দিন ধরে ঘুম নেই। আমেরিকার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার এক মাস চার দিন পর আমরা পানামার ভয়ঙ্কর জঙ্গল পেরিয়ে আমেরিকায় পা রাখতে সক্ষম হই।’ একই সফরের সঙ্গী ফেনীর আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘জঙ্গলের পথে আটজন সফরসঙ্গীর লাশ ফেলে তবেই আমেরিকা পৌঁছাই। পৌঁছেই ভেবেছিলাম স্বর্গে এলাম। কিন্তু নানা ভোগান্তি পেরিয়ে এখানে মহাবিপদে এসে পড়েছি। এক আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে আছি। পুলিশের ভয়ে কাজ খুঁজতেও পারছি না। প্রশাসন যদি জানতে পারে তাহলে আমাকে জেলে ভরবে।’ ২০১৪ সালে নোয়াখালীর কিশোর সুজন আলম যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার টার্গেগে ১১টি দেশ পেরিয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হওয়ার সময় ধরা পড়েন। দীর্ঘদিন জেল খেটে অবশেষে দেশেই ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। মেক্সিকোর কারাগারগুলোয় অবৈধ পথে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে শুধু মেক্সিকোর সীমান্ত এলাকায়ই ছয় হাজারের বেশি লাশ উদ্ধার করেছে মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি। দালালদের অন্য গ্রুপ অভিবাসীপ্রত্যাশীদের বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে নিয়ে যায় প্রথমে দুবাই, ইস্তাম্বুল অথবা তেহরানে। সেখান থেকে তাদের নেওয়া হয় ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া অথবা স্প্যানিশ গায়ানায়। এরপর ব্রাজিল-কলম্বিয়া-পানামা-কোস্টারিকা-নিকারাগুয়া-এল সালভাদর-গুয়াতেমালা হয়ে তাদের পৌঁছে দেওয়া হয় মেক্সিকোয়। পরে সুযোগ বুঝে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। একশ্রেণির দালাল ২ হাজার ৪০০ ডলারে জার্মানিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত প্রকাশ করে। এ প্রলোভনে পড়েই প্রধানত তুরস্ক হয়ে জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর পথের বর্বরতা : মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডে যেতে দেশীয় ইঞ্জিনবোটে চরম ঝুঁকিতে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু বাংলাদেশি নির্মমভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। সাগর পেরিয়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয় থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ার গভীর জঙ্গলে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের পাহাড় ও জঙ্গলে অসংখ্য গণকবরের সন্ধান মেলে। তার বেশির ভাগই বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। ২০১৮ সালের মে মাসে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে অন্তত তিন হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যানুযায়ী একই সময়ে আরও ছয় থেকে আট হাজার অভিবাসী নৌকায় সাগরে ভাসছিল। তার পরও থামেনি অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমানো। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানো অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে সীমাহীন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এ ক্ষেত্রে কৌশল হিসেবে অভিবাসনপ্রত্যাশী দু-এক জনকে হত্যা করে বাকিদের ভয় দেখায় অপরাধী চক্র। মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে অনেকেই তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার সংস্থান করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইউরোপে যেতে আগ্রহী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দালালরা ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তি করে। ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই ওই ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে পুরো টাকা আদায় করে দেশে থাকা দালালরা।


আপনার মন্তব্য