শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৮

দৃশ্যমান হলো ৪ কিলোমিটার

২৭তম স্প্যান বসল পদ্মা সেতুতে

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

দৃশ্যমান হলো ৪ কিলোমিটার
৪ কিলোমিটার দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতুর -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করোনা আতঙ্ক ছাপিয়ে দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। গতকাল সকালে জাজিরা প্রান্তে ২৭-২৮ নম্বর পিলারের ওপর ২৭তম স্প্যানটি বসে দৃশ্যমান হলো পদ্মা সেতুর ৪ কিলোমিটারেরও বেশি। অর্থাৎ মোট দৃশ্যমান হলো ৪ হাজার ৫০ মিটার সেতু। এই সেতুর উভয় পাড়ে ফোর লেন এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে। টোল প্লাজার কাজ শেষ। চলছে নদী শাসন। নদী শাসনের জন্য পদ্মার তীরে নদীতে বিপুল পরিমাণ ব্লক ফেলা, বিভিন্ন স্থানে ড্রেজিংয়ের কাজ, স্প্যানের মাঝে রেলের পাত বসানোর কাজসহ যেদিকে চোখ যায় শুধু কাজ আর কাজ। পদ্মা সেতুর বিশাল এই কর্মযজ্ঞ রাতের আঁধারকেও হার মানায়। সারা বিশ্ব যেখানে করোনা আতঙ্কে নাজেহাল, সেখানে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় কাজে ব্যস্ত নিয়োজিত দেশি-বিদেশি শ্রমিকরা। পুরো সুরক্ষিত রয়েছেন তারা। ড্রোনের সাহায্যেও কাজ চলছে। ইতিহাসের সাক্ষী হতে ইতিমধ্যে ২৭টি স্প্যান পিলারে বসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মা সেতুর ৪ কিলোমিটারের বেশি অংশ। মূল সেতুর বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৮৭ ভাগ। সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে সবকটির কাজ শেষ হয়েছে। এসব পিলারে মোট ৪১টি ট্রাস বা স্প্যানের মধ্যে চীন থেকে মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে এসেছে ২৭টি। এসব স্প্যান পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। ১২টি স্প্যান স্থাপনের জন্য মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড প্রস্তুত রয়েছে। বাকি দুটি স্প্যান চীনে রয়েছে। আগামী মাসে বাংলাদেশের উদ্দেশে সেগুলো রওনা দেবে। এদিকে স্প্যানের মাঝে রেলওয়ে স্লাব বসানোর কাজও শুরু হয়েছে বেশ আগে থেকেই। রেলওয়ে স্লাবের জন্য মোট ২ হাজার ৯৫৬টি প্রি-কাস্টের প্রয়োজন, যা তৈরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের রেললাইনের কাজ জোরেশোরে শুরু হয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হবে। এরপর ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬১ কিলোমিটার রেলপথ প্রসারিত করা হবে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা বহুমুখী সেতুর রেলপথের কাজও শুরু হয়েছে জোরেশোরে। রেল সংযোগ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পে ১৬১ কিলোমিটার রেলপথের প্রথম ধাপে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৮৮ দশমিক ২৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ শেষে কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। এর মধ্যে ঢাকা জেলার ৭১ দশমিক ৩২ একর, নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৫ দশমিক ৮৫ একর, মুন্সীগঞ্জ জেলার ১৩৭ দশমিক ৮১ একর, শরীয়তপুর জেলার ৩ দশমিক ৯৫ একর, মাদারীপুর জেলার ২১৩ দশমিক ৮৮ একর এবং ফরিদপুর জেলার ১৪৫ দশমিক ৪৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ শেষে রেলপথ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় পদ্মা সেতুতেও চলছে রেলওয়ে স্লাব বসানোর কাজ। পুরো সেতুর নদীগর্ভে থাকবে ৪২টি পিলার এবং ১২টি করে দুই তীরে ২৪টি পিলার। মোট পিলার হবে ৬৬টি, যার ৪২টির ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এর মধ্যে আরও থাকবে ২ হাজার ৯৩১টি রোডওয়ে স্লাব। আর রেলওয়ে স্লাব বসানো হবে ২ হাজার ৯৫৯টি।

দেশ স্বাধীনের পর থেকে দেশের দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার মানুষের সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় দেশের বড় একটা অংশ পেছনে পড়ে থাকার বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি বৃহৎ এই এলাকাটিকে দেশের সঙ্গে সড়কপথে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে প্রমত্তা পদ্মায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে ১৯৯৬ সালে তিনি সরকার গঠনের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রত্যয়ে তার সরকারের শেষের দিকে ২০০১ সালের ৪ জুলাই তৎকালীন মাওয়া ফেরিঘাট-সংলগ্ন পদ্মাপাড়ের মৎস্য আড়তের কাছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এবং সরকার পরিবর্তনে থেমে যায় পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ। চারদলীয় জোট সরকার এখানে এই সেতু নির্মাণে তেমন কোনো কাজ করেনি। তবে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার এ নিয়ে ২০০৭ সালে কিছুটা কাজ করতে গেলেও তেমন একটা এগোয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর আবারও পদ্মা সেতু নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে। শুরু হয় জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজ। চুক্তি হয় বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকাসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কিন্তু মাঝপথে থেমে যায় পদ্মা সেতুর কাজ। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সবাই ধরে নিয়েছিল এ সরকারের পক্ষে আর এ সেতু করা সম্ভব হবে না। দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর বিশ্বব্যাংকের বিমাতাসুলভ আচরণসহ নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যে কেটে যায় ১৩টি বছর। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘোষণা দেন পদ্মা সেতু নির্মিত হবে নিজেদের টাকায়। যেমন কথা তেমন কাজ। শুরু হয় দেশবাসীর বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ। এরই ধারাবাহিতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শনিবার দুপুর ১টার সময় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সুইচ চেপে মূল কাজের শুভসূচনা করেন শেখ হাসিনা। ওই সময় উপস্থিত ছিলেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ দেশের প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, এমপি, নেতা-কর্মীরা। মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে এ শুভলগ্নকে স্বাগত জানান দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ ও স্থানীয় জনতা। সেদিন থেকেই সূচনা হয় বাংলার আরও একটি নবদিগন্তের। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তাই দক্ষিণবঙ্গের ২৩ জেলার মানুষের কাছে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেই থেকে পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক পথচলা। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রসহ অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়চেতা মনোবলের ফসল পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পথে। ইতিমধ্যে সেতুর ৮৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে ১৫০ মিটার একটি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বপ্ন পূরণের পালা। এরপর একে একে ২৭টি স্প্যান পিলারে বসে ৪ কিলোমিটারের বেশি সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর শুভ উদ্বোধনের। ইতিমধ্যে এই রুটেই দেশের প্রথম প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ের শুভ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন কেবল সময়ের ব্যাপার কবে প্রধানমন্ত্রী এই পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে মুঠোফোনে বলেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শেখ হাসিনাই মূল শক্তি। শেখ হাসিনার হাত দিয়েই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে। এই সেতু প্রধানমন্ত্রীর সাহসের ফসল। এটা তার একক কৃতিত্ব। তার একক সিদ্ধান্তের কারণে নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে অনিশ্চিত নদীর নাম হলো পদ্মা। এই পদ্মা নদীতে এত বড় সেতু নির্মাণ সত্যিই একটি দৃষ্টান্ত বটে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই ভাগ্যবতী। তার আশা মহান আল্লাহ পূরণ করছেন। এ সময় তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘প্রথম স্প্যানটি বসেছিল হেমন্তের কুয়াশাভেজা কোনো এক সকালে। সেদিন প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার কাজে দেশের বাইরে ছিলেন। তাই আমি তাকে ফোনে বলেছিলাম, ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকার জন্য কয়েক দিন দেরি করতে চাই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেদিন টেলিফোনে বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর কাজ ১ মিনিটের জন্যও বসিয়ে রাখা যাবে না। তাই বর্ষার ভরা মৌসুমেও পদ্মা সেতুর কাজ শিডিউল মাফিক দ্রুতগতিতে চলে।’ তিনি জানান, বিশ্বের অন্যতম এই সেতুটি চালু করার লক্ষ্যে একঝাঁক চীনা ও বাংলাদেশি প্রকৌশলী, পদ্মা সেতুর টেকনিক্যাল পরামর্শক বিশেষজ্ঞ প্যানেল অব এক্সপার্ট, দক্ষ দেশি-বিদেশি প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক সেতু প্রতিষ্ঠার নানা সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করছেন শিডিউল মাফিক কাজ। এ কাজে যেসব সরঞ্জাম তারা এখানে এনেছেন এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে জার্মানির তৈরি বিশ্বের সেরা ৩ হাজার কিলোজুল ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হ্যামার। চীনের ন্যানটং ওয়ার্কশপ থেকে তৈরি পাইল, অত্যাধুনিক ও হেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন, পাওয়ারফুল ক্রেনসহ নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী এখানে গড়ে উঠবে হংকং সিটির মতো শহর। গড়ে উঠবে নানা শিল্প-কারখানা। পদ্মার দুই পাড়ে ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে আধুনিক নগরীর আদলে বাড়িঘর ও নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান। দুই পাড়েই গড়া হয়েছে অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে একটি আধুনিক শহরের সব সুবিধা। গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ করা অতিরিক্ত জায়গায় দুধ ও মাংস উৎপাদনে গবাদি পশুর প্রজনন ও জাত উন্নয়নে মিলিটারি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই ফার্ম পরিচালিত হবে। এ কাজের জন্য সেনাবাহিনীকে ২ হাজার ১৫৬ একর জমি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রী জানান, এটি প্রতিষ্ঠা করা হবে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে। প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে এটি সহায়ক হবে। অপ্রয়োজনীয় জমি পতিত না রেখে আধুনিক উন্নত মানের মিলিটারি ফার্ম গড়ে তোলা হবে। দেশে দুধের চাহিদা মেটানোসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া এখানে গড়ে তোলা হবে হংকং সিটির মতো শহর। এখানে থাকবে প্রজাপতি চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, বিশ্বমানের স্টেডিয়াম। দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা এখানে ইতিমধ্যে জমি কেনার জন্য ভিড় করছেন। এ এলাকায় জমির দামও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু ঘিরে মহাউন্নয়নের জল্পনা-কল্পনা চলছে দেশজুড়ে। খুলে যাচ্ছে সম্ভাবনার আরও এক নতুন দিগন্ত।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর