শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২৩:৫৫

নারী পাচারে সর্বনাশা ফাঁদ

দুবাই ড্যান্স বারে কাজের কথা বলে নির্যাতন, দেশ-বিদেশে সক্রিয় চক্র মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি, মহামারীতেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি

জিন্নাতুন নূর

নারী পাচারে সর্বনাশা ফাঁদ

মো. আজম ওরফে আজম খান। আন্তর্জাতিক নারী পাচারকারী চক্রের গডফাদার আজম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পৌরসভায় ছিলেন ছিঁচকে চোর। তার বিরুদ্ধে ফটিকছড়ি ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬টি হত্যাসহ ১৫টি মামলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আজম একসময় পাড়ি জমান দুবাইতে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার করে দুবাই নিয়ে গিয়ে অনৈতিক ব্যবসা শুরু করেন। রাতারাতি হয়ে ওঠেন কোটিপতি। বনে যান দুবাইয়ের চারটি হোটেলের মালিক। আজম তার হোটেলে কাজের আশা দিয়ে আট বছরে ৭০ জন বাংলাদেশি নারীকে পাচার করে দুবাই নিয়ে যান। দুর্ভাগা এ নারীদের যৌন ব্যবসায় নামতে বাধ্য করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর তথ্যে এ পাচারকারী চক্রে দেশের কয়েকজন নৃত্য সংগঠকও জড়িত। তাদের একজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার ইভান শাহরিয়ার সোহাগ। এ চক্রে আরও আছেন চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের ম্যানেজার গৌতম সাহা। চক্রটিকে সহযোগিতা করার জন্য দেশে অর্ধশতাধিক দালালও সক্রিয় ছিল।

নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সি ও একটি বিশেষ এয়ারলাইনসে করে নারীদের দুবাইয়ে পাচার করা হতো। দুবাইতে যদি কোনো নারী তাদের কথামতো কাজ করতে রাজি না হতো তবে তাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো, প্রচুর মারধর করা হতো। সিআইডি জানায়, মূলত নৃত্যশিল্পীদের টার্গেট করত চক্রটি। ছোটখাটো অনুষ্ঠানে পারফর্ম করা নৃত্যশিল্পীরাই ছিলেন এ চক্রের প্রধান টার্গেট। কয়েকজন নৃত্য সংগঠক ও শিল্পী ছাড়াও পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন ক্লাব ও ড্যান্স গ্রুপের লোকজনও এ চক্রে জড়িত। গেল জুলাইয়ে দুবাইয়ে নারী পাচারকারী চক্রের মূল হোতা আজম খানসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয় নৃত্যশিল্পী ইভানকেও। জানা যায়, পাচারকৃত নারীদের থাকা-খাওয়া নিশ্চিতসহ ক্লাবে নাচ-গান করার বিনিময়ে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার মৌখিক চুক্তি করা হলেও বাস্তবে এ টাকা তারা পান না।

বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুবাইতে পাচার দমনসংক্রান্ত আইন তেমন শক্তিশালী নয়। এ অবস্থা বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ঘটনা আরও উসকে দিচ্ছে। সেখানে হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশি নারীদের জোর করে অবৈধ কাজ করানো হচ্ছে কিন্তু স্থানীয় পুলিশ তাদের উদ্ধার করছে না। আবার বাংলাদেশ দূতাবাসও ভুক্তভোগীদের সেভাবে সাহায্য করতে পারছে না। জানা যায়, দুবাই ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশসহ ভারতে পাচার করা হচ্ছে বাংলাদেশি নারীদের। পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে কপাল পুড়ছে এসব নারীর। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে কাজের আশায় দেশের বাইরে গিয়ে তারা পাচারের শিকার হচ্ছেন। মানব পাচারের বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা থাকায় বাংলাদেশি নারী ও কন্যাশিশুদের পাচারের শিকার হতে হচ্ছে বেশি। করোনাকালেও দেশ থেকে নারী পাচারের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ফলে পাচারের সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি ভারতে নারী পাচারের ঘটনা তুলনামূলক কমে গেলেও বিদেশে কাজের কথা বলে নারী পাচারের ঘটনা নতুন করে উদে¦গ তৈরি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের আশ্বাসে নারী পাচার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ নারী পাচারের শিকার হন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৩ জনকে জুলাইয়ে পাচার করা হয়।

জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পাচার করা হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের। আর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ১৬ থেকে ১৮ বছরের কিশোরীদের বয়স বাড়িয়ে ২২ থেকে ২৩ বছর দেখিয়ে পাচার করা হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানি উন্œয়ন ব্যুরোয় কর্মরত কিছু অসাধু ব্যক্তি, বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্ট ও কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর স্বজনরা নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফুটপাথে থাাকা কন্যাশিশুদের কেউ কেউ ছোট থেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। আর এ ধরনের শিশুদের সহজেই টার্গেট করে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। টানবাজারের মতো বড় পতিতালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নারী ও কন্যাশিশুর পাচারের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুবাইতে বাংলাদেশি নারী পাচারের ঘটনা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। এ ছাড়া নেপালেও নারীদের পাচার করা হচ্ছে। দুবাই ও নেপালে মেয়েদের ট্যুরিস্ট ভিসায় পাচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নারী পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংস্থা সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল এ বিষয়ে কাজ করছে কিন্তু জেলা পর্যায়ে এ বিষয়ে যে সচেতনতা তৈরির কথা তা হচ্ছে না। আর পাচারের ক্ষেত্রে যারা ঝুঁকিপূর্ণ তারা ঝুঁকিতেই রয়ে গেছে। এ-সংক্রান্ত সাতটি ট্রাইব্যুনাল হয়েছে কিন্তু তা কার্যকর নয়। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে গাফিলতি আছে।’ তার মতে পাচারের ক্ষেত্রে যারা ঝুঁকিতে আছে তাদের বিকল্প উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাচারের মামলায় ভুক্তভোগী ভিকটিমকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আইনি সহযোগিতা দিতে হবে। পাচারসংক্রান্ত স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

নারী পাচারের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভৌগোলিক কারণে একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে নারীদের ভারতে পাচার করা হতো। এদের কাজ দেওয়ার কথা বলে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হতো। মুম্বাই, কলকাতায় নিয়ে মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়া হতো। ভারতের পতিতালয়গুলোয় প্রচুর বাংলাদেশি মেয়ে পাওয়া যাবে। তবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে নারী পাচারের ঘটনা এখন কমেছে। সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অভিবাসন মনে হলেও পাচার আইন অনুযায়ী নির্যাতনের শিকার নারীও পাচারের শিকার। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর যে মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে সেখানেও অভিবাসনের নামে বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনা বর্ধমান বলা হয়েছে। ২০১৫ সালের দিকে সমুদ্রপথে পুরুষদের পাচার করা হতো কিন্তু এখন সমুদ্রপথে নারী ও শিশুদেরও পাচার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের এ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশে বাংলাদেশি নারী কর্মী যাওয়া শুরু হলেও প্রথমে এ সংখ্যা মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে যখন সৌদি আরবের সঙ্গে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি হয় তখন বছরে নারী কর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মী পাঠানোর নামে মেয়েদের সিরিয়ায় পাচার করা হয়, দুবাই ও সৌদিতে পাঠানো হয়।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অভিবাসনের নামে নারী পাচার, ভারতে নারী পাচার ও রোহিঙ্গা নারী-শিশু পাচার এ তিনটি ইস্যু নারী পাচারের ক্ষেত্রে আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ শ্রম অভিবাসনের নামে যা হচ্ছে তা এক প্রকার পাচারই। আগে যেখানে ১০ থেকে ১৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নারী কর্মী পাঠাত সেখানে এখন ৫০০ থেকে ৬০০ এজেন্সি শুধু সৌদিতেই নারী কর্মী পাঠাচ্ছে।’ তার মতে গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের বিদেশে না পাঠিয়ে নার্স ও পোশাকশ্রমিকসহ অন্যান্য খাতে পাঠানো উচিত। এতে নারীরা নিরপদে থাকবেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর