শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:২৭

স্থানীয় সরকারে অস্বস্তি বাড়ছে আওয়ামী লীগে

তাপস-খোকনের বিরোধ । কাদের মির্জার বিস্ফোরক মন্তব্য । কুষ্টিয়ায় প্রকাশ্যে সিল মারার নির্দেশ দলীয় প্রার্থীর । সিটি ও পৌর নির্বাচনে সংঘর্ষে নিহত ৩ । বিভিন্ন জায়গায় হামলা ভাঙচুর

রফিকুল ইসলাম রনি

স্থানীয় সরকারে অস্বস্তি বাড়ছে আওয়ামী লীগে

স্থানীয় সরকারের সাবেক ও বর্তমান কিছু দলীয় জনপ্রতিনিধির কর্মকান্ডে অস্বস্তি বাড়ছে আওয়ামী লীগে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছেন। বসুরহাট পৌর নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জার কয়দিন ধরেই বিস্ফোরক বক্তব্য দিচ্ছেন। কুষ্টিয়ার মিরপুরে দলীয় পৌর মেয়র প্রার্থীর প্রকাশ্যে সিল মারার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সংঘর্ষে নিহত, হামলা-ভাঙচুর প্রভৃতি ঘটনায় দলে অস্বস্তি বেড়েছে।

এসব ঘটনা শুধু অস্বস্তিই নয়, বিব্রতকর এবং দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী বলেও মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেরাই প্রতিযোগিতায় জড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান দলকে দুর্বল করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, সম্প্রতি সময়ে রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এবং বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের বিরোধ। স্থানীয় সরকারের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান ও সাবেক মেয়র দুজনই ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী পরিবারের সন্তান। তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসায় অস্বস্তি দলের ভিতরে-বাইরে। সম্প্রতি রাজধানীর ফুলবাড়িয়া একটি মার্কেটের অবৈধ অংশ উচ্ছেদের ঘটনার পর থেকে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়। মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এ ঘটনা থেকেই চরম ক্ষুব্ধ হন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। এতে বর্তমানের মেয়রের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তার। গত শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর পক্ষে মানববন্ধনে বর্তমান মেয়র তাপসের সমালোচনা করে সিটি করপোরেশনের টাকা মধুমতি ব্যাংকে রাখার অভিযোগ করেন সাঈদ খোকন। ওই ঘটনার পরের দিন সাঈদ খোকনের নামে কোর্টে দুটি মামলার আবেদন করা হয়। আইনি ও রাজপথে মোকাবিলার ঘোষণা দেন সাবেক মেয়র। আর বর্তমান মেয়র তাপস বলেছেন, মামলার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন। ‘অতিউৎসাহী’ আইনজীবীরা মামলা করতে আবেদন করেছেন। তিনি মামলা প্রত্যাহারের জন্য আইনজীবীদের নির্দেশনা দিয়েছেন, যা মোটেও স্বস্তি দায়ক নয় ক্ষমতাসীন দলের জন্য। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত। যেসব ঘটনা দৃশ্যমান হয়েছে তা আমাদের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।’ নাছিম আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগে কেউ অপরিহার্য নয়। কেউ যদি নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করেন, তাহলে ভুল করবেন। সব কথা সব জায়গায় বলতে হবে এমন নয়। কিছু কথা বাইরে, কিছু কথা অভ্যন্তরে বলতে হয়। আবার কাউকে কাউকে জাতির বিবেক সাজার প্রয়োজনও নেই। নিজেই সাধু পুরুষ, অন্যরা খারাপ এই ধরনের গীত না গাওয়াই ভালো।’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঢাকার জন্য এই বিরোধ সবার চোখে পড়েছে। কিন্তু এমন চিত্র সারা দেশেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, আওয়ামী লীগ-আওয়ামী লীগ দ্বন্দ্বেই নাজেহাল টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা সরকার। পৌর নির্বাচনে নেতা-কর্মীদের মধ্যে যখন সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা, তখন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় বিব্রত দলের হাইকমান্ড।

পৌর ভোট চলাকালে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও বসুরহাট পৌরসভার আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা দলের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তি, নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, সুষ্ঠু ভোট হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারজন এমপি ছাড়া বাকিরা দরজা খুঁজে পাবে না এমন বক্তব্য দিয়ে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। আবদুল কাদের মির্জা একের পর এক চটকদার কথা বলেই চলেছেন। তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিএনপিসহ বিরোধী পক্ষ সরকারের সমালোচনা করছেন।

একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম সিটি ও বিভিন্ন পৌর নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে তিনজন নিহত, অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে কমপক্ষে ২০টি। আবার প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারার ঘোষণা দিয়েছেন দলীয় প্রার্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়ায় এটি দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

দলের নীতিনির্ধারণী একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের কর্মকান্ড আমাদের জন্য সুখকর নয়। প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের জন্য সৌন্দর্য। কিন্তু বিরোধ, সংঘর্ষ ও হানাহানি উদ্বেগের বিষয়। নিজেদেরকেই এসব বন্ধ করতে হবে। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো অপরাধ যারাই করবে তাদের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এনামুল হক প্রকাশ্যে সিল মারার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ৯ জানুয়ারি তিনি এই নির্দেশনা দেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইছে। ১ মিনিট ২২ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এনামুল হককে বলতে শোনা যায়, ‘ভোট ভয়ের কোনো ব্যাপার না, আমি যদি ওপেন সিল মেরে দিই তা হলে কারও কিছু বলার নেই। সবাই নৌকায় সিল মেরে দেবেন প্রকাশ্যে, কোনো সমস্যা নাই, যেখানে সবাই একতরফা ভোট দেবে। সেখানে কেন আপনি সন্দেহের মধ্যে থাকবেন। তাই কাউন্সিলরের দুটি গোপন কক্ষে আর মেয়রের ভোটটি প্রকাশ্যে দেবেন, কাউকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিটি এলাকার ডবলমুরিং থানার পাঠানটুলীতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে আজগর আলী বাবুল (৫৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া মাহবুব নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগামী শনিবার অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় ধাপের পৌর নির্বাচনে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী সহিংসতায় একজন নিহত হন। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেনের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ কর্মী বল্টুকে (৫০) প্রতিপক্ষ কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে এ খুনের ৫ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিপক্ষ প্রার্থী আলমগীর খান ওরফে বাবুর লাশ উপজেলার দেবতলা-বারইপাড়ার কুমার নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বুধবার রাত দেড়টার দিকে রাজশাহীর আড়ানী পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী শহিদুজ্জামান শহিদ ও বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্তার আলীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ৯টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলে। এ সময় গুলি ও বোমা হামলা চালায় বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগ প্রার্থী শহীদের। তুষার নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।  বুধবার রাতে নরসিংদীর মনোহরদীতে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিন কাউন্সিলর প্রার্থী, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীসহ ১২ জন আহত হয়েছেন। এ সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ, র‌্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগের দিন সোমবার গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা-পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় শ্রীপুর থানায় দুটি মামলা হয়েছে। ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ে প্রচারের সময় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রার্থীসহ আহত হন অন্তত ১০ জন। ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় ১৩ নম্বর বারখাদা ওয়ার্ডের দুই কাউন্সিলর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সোহেল সরকার (৫০) নামের একজনের মৃত্যু হয়। আহত হন পাঁচজন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর