কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের আগামী তিন বছরের জন্য প্রস্তাবিত আমদানিনীতির যে কোনো ধারা শিথিল করা যাবে। নতুন আমদানিনীতি ২০২৬-২০২৯-এর খসড়ায় এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নতুন রপ্তানি ধরে রাখা, বিনিয়োগ উৎসাহিত এবং বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সেপা ও ইপিএ এবং বৈশ্বিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সরকার এই আদেশের যেকোনো ধারা শর্তসাপেক্ষে বা শর্তমুক্তভাবে শিথিল করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য চুক্তিতে অনেক সময় একতরফা শর্ত যুক্ত হতে পারে, যা দেশের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই চুক্তির আওতায় আমদানিনীতি শিথিল করার সময় দেশি শিল্পের সুরক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারই প্রথম এ ধরনের ধারা যুক্ত করা হয়েছে আমদানি নীতি আদেশে। বাংলাদেশে এর আগে কোনো আমদানি নীতিতে এ ধরনের ধারা ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে সেই চুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে আমদানি নীতিতে এ ধারাটি যুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে। তবে বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমদানি নীতিতে এ ধরনের শিথিলতা আনা হলে দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া এই শিথিলতার কারণে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। গত এপ্রিলে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশের নতুন আমদানি নীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য সংলাপ জোরদারের অংশ হিসেবে অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভের (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তিনিও বাংলাদেশের নতুন আমদানি নীতি আদেশ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।
এরপর গত ৫ মে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চ বৈঠক করেন। এর দুই দিন পর গত ৭ মে আমদানি নীতির খসড়াটি মতামতের জন্য নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত ভুটান, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই তিন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া চীনের নেতৃত্বাধীন আরসেপ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে সরকারের। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিটির বিষয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তিটি করে সেটি কার্যকর হলে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র, জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে চুক্তি করছে; এসব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যে বিষয়গুলোতে সমঝোতা করেছে- সেগুলো যদি আমদানি নীতিতে থাকে, তবে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা যাবে না। সে কারণেই এবারের আমদানি নীতিতে এই ধারাটি যুক্ত করা হয়েছে। সাবেক এই বাণিজ্য সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কোনো পণ্য আমদানিতে কোটা আরোপ করতে পারবে না; আমদানি পণ্য আমেরিকায় পরীক্ষা হলে দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী বিএসটিআই বা ফাইটো সেনিটারি সংক্রান্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া আমদানি বাড়ানোর জন্য অনেক পণ্যে শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করতে হবে। চুক্তির আওতায় আমদানি নীতিতে এই শর্তগুলো শিথিল করা হলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কমতে পারে রাজস্ব আয়। সাবেক এই বাণিজ্য সচিব বলেন, বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি নীতি শিথিল করার অর্থ হচ্ছে- যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি হবে- সেই দেশ এই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে অন্য দেশগুলোও একই ধরনের সুবিধা চাইবে সরকারের কাছে।