শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:৫৬

আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে নির্যাতিত সেই শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু

শেরপুর প্রতিনিধি

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব শাকিলের বাসায় বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মী সাদিয়া আক্তার ফেলি অবশেষে মারা গেল। ২৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে ফেলি। গৃহকর্মী ফেলি শ্রীরদী পৌর শহরের মুন্সীপাড়া মহল্লার দরিদ্র ট্রলিচালক সাইফুল ইসলামের মেয়ে। নির্মম নির্যাতনের শিকার ফেলির মৃত্যু নিয়ে ফুঁসে উঠেছে শ্রীবরদীর মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। বিচারের দাবিতে এলাকাবাসী শিগগিরই মানববন্ধন করবেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ নেতা শাকিল নিজ বাড়ির পাশেই ভাড়া বাসায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও গৃহকর্মীকে নিয়ে থাকতেন।  শাকিলের বাবা আশরাফ হোসেন খোকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। নির্যাতনের ঘটনায় শুধু শাকিলের স্ত্রী ঝুমুরের নামে মামলা হয়েছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও ময়নাতদন্ত সূত্র জানায়, মেয়েটির শরীরে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়নি। যৌনাঙ্গের ভিতর গরম লোহা ঢুকিয়ে দিয়ে মূত্রথলি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ফেলির যৌনাঙ্গ আগুনে ঝলসানো ছিল। অভিযোগ থেকে জানা যায়, ফেলিকে খাবার দেওয়া হতো না। পুষ্টিহীনতা ছিল চরম পর্যায়ে। যৌনাঙ্গ, মূত্রথলির ইনফেকশন, সারা শরীরের আঘাত ও পুষ্টিহীনতাই মেয়েটির মৃত্যুর কারণ বলে জানা গেছে। শিশুটির ওপর কোনো যৌন নির্যাতন হয়েছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য নমুনা ভিসেরা রিপোর্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। এত দিন শিশুটি হাসপাতালে থাকলেও শাকিলের পরিবার থেকে কেউ খোঁজ নেয়নি। শিশু এই গৃহকর্মীর এমন মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আফসোসে মুহ্যমান এলাকার মানুষ। গতকাল দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলির ময়নাতদন্ত শেষে রাতে লাশ দাফন করা হয়েছে। জানাজায় অংশ নেওয়া সবার চোখেই ছিল পানি। ফেলির পরিবার ও গ্রামের মানুষের আজাহারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

সাধারণ মানুষ ও ফেলির পরিবারের প্রশ্ন, শাকিলের বাসায় দীর্ঘদিন ধরে শিশুটির ওপর নির্যাতন চলে আসছে। ঘটনার পর পুলিশ ঝুমুরকে গ্রেফতার করলেও রহস্যজনক কারণে শাকিলকে আসামি করা হয়নি। শাকিল বর্তমানে পলাতক। তবে তার স্ত্রী ঝুমুরকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।  ফেলির বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তানকে দু-বেলা খাবার দিতে পারি না বলে শাকিলের বাড়িতে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়ে লাশ হয়ে ফিরল।’ ফেলির মা আনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, ‘প্রতিদিন আমার শিশু মেয়েটিকে নির্যাতন করা হয়েছে। শাকিল কিছু জানে না এটা হতে পারে না। শাকিলকে গ্রেফতার করলেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া ঝুমুরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ঝুমুরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।’ একই দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা বলেন, ঘটনার সঙ্গে শাকিলকে যেন না জড়ানো হয় সে জন্য ফেলির মা-বাবাকে ভয় দেখানো হয়েছে। ঝুমুরকে শুধু আসামি করা হয়েছে। তাদের বাঁচাতে সরকারি দলের প্রভাব রয়েছে। ঝুমুরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও কেউ জড়িত এ ঘটনায় আছে কিনা বেরিয়ে আসবে। আর শাকিলকে এ মামলায় আসামি করে গ্রেফতার করা হোক।

উল্লেখ্য, নির্যাতনের কারণে ফেলির মাথায়, পিঠে ও কাঁধে গুরুতর জখম ও দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে পরে কোনো এক প্রতিবেশী ৯৯৯-এ ফোন করে ফেলিকে নির্যাতনের বিষয়টি জানান। পরে পুলিশ গিয়ে ফেলিকে উদ্ধার এবং গৃহকর্ত্রী ঝুমুরকে গ্রেফতার করে। ঝুমুরকে একমাত্র আসামি করে মামলা গ্রহণ করে পুলিশ।

শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শেরপুর সার্কেল) আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি হত্যাকান্ড কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেন এমন পৈশাচিকতা করা হলো শিশুটির ওপর পুলিশ তার উত্তর খুঁজছে। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কারাগারে ঝুমুর অসুস্থ তাই তাকে রিমান্ডে আনা যায়নি। শিগগিরই ঝুমুরকে রিমান্ডে আনা হবে। ফেলির বাবা শুধু ঝুমুরকে অভিযুক্ত করে মামলা দিয়েছেন। তদন্তে বেরিয়ে এলে শাকিলকেও ছাড় দেওয়া হবে না।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর