শিরোনাম
শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০০:০০ টা
ঢাকার সড়কে মৃত্যুর মিছিল

তিন মাসে দুই সহস্রাধিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা

আলী আজম

গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় পিক-আপ ভ্যানের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী মিরাজুল ইসলাম রাতুলের (২৬) মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারকারী সিফাত জানান, মেরাদিয়া বাজার এলাকায় একটি পিক-আপ ভ্যান মোটরসাইকেলটিকে চাপা দিয়ে কিছু দূর নিয়ে যায়। এতে চালক রাতুল গুরুতর আহত হন এবং পরে তিনি মারা যান। পিক-আপের চালক গাড়িটি ফেলে পালিয়ে যায়। পরে গাড়িটি জব্দ করে পুলিশ। ঢাকার দোহার উপজেলার কৃষিদেবপুর গ্রামের দানিস খন্দকারের ছেলে রাতুল।

গত ২১ ডিসেম্বর সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল চালক শরিফ হোসেনের (৩৮) মৃত্যু হয়েছে। তিনি রাইড শেয়ারিং (পাঠাও) চালক ছিলেন। তার বাবার নাম মোশাররফ হোসেন। থাকতেন সূত্রাপুরের নওয়াবপুরে। যাত্রাবাড়ী থানার এসআই ফারজানা আক্তার বলেন, ঢাকা টু কলকাতা রোডে দেশ ট্র্যাভেলের বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান চালক শরিফ। এ ঘটনায় বাসটি জব্দ ও চালককে আটক করা হয়েছে।

একই দিন রাতে রাজধানীর বিমানবন্দরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে লরির ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী থানা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আল মামুনের (৪৮) মৃত্যু হয়েছে। তার ছেলে রিয়াদ আবির বলেন, তাদের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার আকাশি তিল্লী গ্রামে। তিনি মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। তার বাবা উত্তরায় অফিস করতেন। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে বাসায় ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন মামুন। শুধুমাত্র এই তিনজনই নয়। প্রতিনিয়ত ঢাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত তিন মাসে ২ হাজার ২৪ জন আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের অধিকাংশ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কেউ হারিয়েছেন পা, আবার কেউবা হারিয়েছেন হাত। কেউবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। জানা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পঙ্গু হাসপাতালে চলতি বছরের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৬৬৯ জন, নভেম্বরে ৭১৮ জন এবং অক্টোবরে ৬৩৭ জন। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অসংখ্য বাইকার চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরে শুধুমাত্র নভেম্বরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৩ জন। ২০২২ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৪৪ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০২২ সালে সারা দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৯৭৩টি, নিহত হয়েছেন ৩০৯১ জন এবং আহত ২১৫৪ জন। যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নভেম্বরে সারা দেশে ১৪৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জন নিহত এবং ৮৫ জন আহত হয়েছেন। এর আগে, অক্টোবরে সারা দেশে ১৩১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৪ জনের মৃত্যু এবং আহত হয়েছেন ৭৬ জন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, ঢাকা শহরে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ লাখ ৭৯ হাজার মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলের সংখ্যাও কম নয়। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের অসংখ্য মোটরসাইকেল ঢাকায় চলাচল করছে।

মোটরসাইকেলের শহর এখন ঢাকা। মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের পাশাপাশি ধনাট্য ব্যক্তির সন্তানদের ভরসাও এখন মোটরসাইকেল। স্টাইলের পাশাপাশি ফ্যাশনেও পরিণত হয়েছে এ বাহনটি। ঢাকার প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যালে মোটরসাইকেলের ব্যাপক উপস্থিতি। অন্য যানবাহনের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল। অনেকে স্টাইল করে নিজের আধিপত্য জানান দিতে, কেউবা প্রেমিকা বা কাছের লোককে দেখাতে, কেউ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছেন। এতে অকালে প্রাণ ঝরছে অনেকের। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন কেউ কেউ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। অন্য যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ গুণ বেশি। মানুষ নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ বাহনটির দিকেই আকৃষ্ট হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ পেলেই বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো কিংবা ফুটপাতের ওপর দিয়ে বা উল্টো পথে মোটরসাইকেল চালানো একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তীব্র যানজটের কারণে সবাই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করছেন মোটরসাইকেল। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ছে। এটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করলে হতাহতের সংখ্যা কমে আসবে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা শহরের যেখানে-সেখানে মোটরসাইকেল পার্কিং করছে। বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহনের চেয়ে চুক্তিভিত্তিক যাত্রী পরিবহনকারী মোটরসাইকেলের সংখ্যা অনেক। ঢাকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালে গণপরিবহনের সঙ্গে অসংখ্য মোটরসাইকেলের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। পাশাপাশি ছোটখাটো সিগন্যাল বা রাস্তার মোড়ে, অলিতে-গলিতে মোটরসাইকেলের ব্যাপক উপস্থিতি। দক্ষ চালকের পাশাপাশি অদক্ষ চালকের সংখ্যাও কম নয়। সিগন্যাল অমান্য বা সিগন্যাল ছাড়লেই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে এসব মোটরসাইকেল। ফলে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ন্ত্রণ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

মামলা করেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ঢাকার প্রধান সড়কসহ অলিগলি এখন মোটরসাইকেলের দখলে। এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম-কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেন, বেপরোয়া গতিই মূলত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি রোড এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেন নিয়মিত চেক করছি, যেগুলো সমস্যা রয়েছে সেগুলো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, গণপরিবহনের স্বল্পতা ও যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছে নগরবাসী। মোটরসাইকেল চালকদের বিরাট অংশ কিশোর ও যুবক। এদের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা এবং না মানার বিষয়টি প্রবল। কিশোর-যুবকরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় পড়ছে এবং অন্যদেরও ফেলছে। মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সড়কে গণপরিবহনসহ কোনো যানবাহনের শৃঙ্খলা নেই। একই সড়কে সব গতির গাড়ি চলছে। এটা বলা চলে নৈরাজ্যকর সড়ক। ফলে যানবহনের ধাক্কায় ও বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান বলেন, বেপরোয়া গতিই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়ক ব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার একটি কারণ। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেরা নিজেদের আধুনিক ও স্মার্ট হিসেবে উপস্থাপন করতে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ঢাকার রাস্তায় চলাচলকৃত প্রত্যেকটি যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দুর্ঘটনা বেড়েই চলবে।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর