শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মে, ২০১৯ ২২:২৫

রুপন্তী লাঠিয়ালের গল্প

জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া

রুপন্তী লাঠিয়ালের গল্প

আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য লাঠিখেলায়ও পিছিয়ে নেই নারীরা। এমনই একজন লড়াকু নারীর নাম মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রুপন্তী। কুষ্টিয়ার মেয়ে রুপন্তী যখন খোলা চুল আর কালো পোশাকে এক হাতে লাঠি অন্য হাতে ঢাল, আবার কখনো লাঠির বদলে তলোয়ার নিয়ে ছুটে যান প্রতিপক্ষের দিকে তখন মহুর্মুহু কারতালি পড়ে চারদিক থেকে...

সর্বত্র এখন নারীর সদর্প পদচারণা। আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য লাঠিখেলায়ও পিছিয়ে নেই নারীরা। এমনই একজন লড়াকু নারীর নাম মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রুপন্তী। কুষ্টিয়ার মেয়ে রুপন্তী যখন খোলা চুল আর কালো পোশাকে এক হাতে লাঠি অন্য হাতে ঢাল, আবার কখনো লাঠির বদলে তলোয়ার নিয়ে ছুটে যান প্রতিপক্ষের দিকে তখন মহুর্মুহু কারতালি পড়ে চারদিক থেকে। রুপন্তীর লাঠিখেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ২০১৬ সালে। ওই বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের লাঠিয়ালদের একমাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনী’ দুই দিনের উৎসবের আয়োজন করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে। কুষ্টিয়া ছাড়াও নড়াইল, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ২৫টি দলের প্রায় ৫০০ লাঠিয়াল অংশ নেন এ উৎসবে। এসব দলে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও ছিলেন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের মাঠে লাঠিখেলায় অন্যদের মতো সারবীন চৌধুরীও লাঠিখেলা দেখান। সে সময় তার লাঠিখেলায় মুগ্ধ হন মানুষ। এ খেলায় সুন্দর মুখশ্রীর সঙ্গে বড় লাল টিপ, খোলা চুল আর কালো পোশাকের সমাহার নিয়ে তিনি যেন নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। এরপর তার লাঠিখেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।

বলা যায়, লাঠিখেলা রুপন্তীর রক্তে মিশে আছে। কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন লাঠিখেলার সংগঠক ও এ এলাকার শ্রেষ্ঠ লাঠিয়াল। এই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হলেন মঞ্জুরীন সাবরীন চৌধুরী রুপন্তীর দাদা। বাবা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর সংগঠনের হাল ধরেন রতন চৌধুরী, যিনি রুপন্তীর বাবা। লাঠিখেলা তাই রুপন্তীর পারিবারিক ঐতিহ্য। তার বয়স যখন সাত বছর তখন বাবার খেলা দেখে হাতে তুলে নেন লাঠি। লাঠি ঘোরানো রপ্ত করতে থাকেন। শিখে নেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল। রুপন্তীর ওস্তাদ ছিলেন ওসমান সরদার। রুপন্তী বলেন, ‘তার কাছে লাঠিখেলা শেখা বলা যায়, দাদার কাছে শেখার মতোই। তিনি আমার দাদার হাতে  তৈরি, দাদার কাছে লাঠিখেলা শিখেছেন। যেহেতু দাদা বেঁচে ছিলেন না, আমার ওস্তাদ ওসমান সরদার চেয়েছিলেন দাদার কাছ থেকে শেখা কৌশল যেন আমাকে কিছুটা হলেও তিনি দিয়ে যেতে পারেন।’

বর্তমানে রুপন্তীর পরিবারের সবাই লাঠিখেলার সঙ্গে যুক্ত। আছেন নারীরাও। রুপন্তীর ফুফু হাসনা বানু দেশের প্রথম নারী লাঠিয়াল। ফুফাতো বোন শাহিনা সুলতানা ও শারমীন সুলতানাও লাঠিয়াল। সাবরীনার সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছোট বোন মঞ্জুরীন আফরিনও লাঠির কসরত শিখছেন। লাঠিখেলায় কেন, জানতে চাইলে সরল সোজা জবাব, বাবার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। চেয়েছিলেন তার মেয়েরাই ছেলেদের কাজ করবে। নিজেই নিজের আত্মরক্ষা করবে। তাই নিজেকে কখনোই অন্যের থেকে আলাদা ভাবেননি। সেই থেকে আর পিছু হটা হয়নি। লাঠি, সড়কি, তলোয়ার ও রামদা চালাতে পারেন তিনি।

বাবার সঙ্গে নড়াইলের সুলতান মেলায় তিনবার লাঠিখেলায় অংশ নিয়েছিলেন রুপন্তী। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিতে পয়লা বৈশাখে লাঠিখেলা দেখিয়েছিলেন। এছাড়া কুষ্টিয়ায় লাঠিখেলার আয়োজন কখনোই মিস করেন না। যখন আয়োজন করা হয় দেশ-বিদেশের যে প্রান্তেই, পরিবারের সদস্যরা থাকুক না কেন, লাঠিখেলার আয়োজন হলে সবাই ছুটে আসেন কুষ্টিয়ায়। রুপন্তীর মা অবশ্য লাঠিয়াল নন, তবে তিনি সবসময় মেয়েদের লাঠিখেলায় উৎসাহ দিতেন। ছোটবেলায়ই মেয়েকে তার বাবার সঙ্গে পাঠিয়ে দিতেন।

এসএসসি পরীক্ষার আগে রুপন্তীর বাবা রতন চৌধুরী মারা যান। এসএসসি পাসের পর চাচাতো ভাই সাব্বির হাসান চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয় রুপন্তীর। তবে পড়ালেখার পাশাপাশি এখনো লাঠিখেলা অব্যাহত রেখেছেন রুপন্তী। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন শাখার ছাত্রী। মিরপুরে স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকেন। তার স্বামী সাব্বির হাসান চৌধুরীও লাঠি খেলেন। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

লাঠি শুধু খেলায় নয়, আত্মরক্ষাও বটে। কোনো বিপদে হাতের কাছে একটা লাঠি জাতীয় কিছু থাকলে সেটা দিয়ে নারীরা নিজেদের রক্ষা অনায়াসে করতে পারেন। এটা শিখতে তেমন সময় বা টাকা খরচ লাগে না। এটা রপ্ত করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে এটা ছড়িয়ে দেওয়া খুবই প্রয়োজন মনে করেন সাবরীন চৌধুরী।

রুপন্তী বলেন, দাদার স্বপ্ন ছিল লাঠিখেলাটা একদিন বিশ্বে পরিচিতি অর্জন করবে  দেশীয় ঐতিহ্য হিসেবে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করে যেতে চান রুপন্তী।


আপনার মন্তব্য