আজ পঞ্চম রোজা। আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া জানাই আমরা সুন্দরভাবে ৪টি রোজা শেষ করতে পেরেছি। আমার ভাই, রোজা রেখে গোনাহ মাফ করতে হলে আমাদের একটি কাজ করতে হবে। তাহলো ইহতিসাব। বুখারি শরিফে রসূল (স.) বলেছেন, ‘মান সামা রামাদানা ইমানাও মা আমাদের করতে হবে আর তা হলো ইহতিসাব। বুখারি শরিফে রসুল (সা.) তাকাদ্দামা মিন জামবিহি।’ অর্থ— যে ব্যক্তি বিশ্বাস এবং আত্মোপলব্ধির সঙ্গে রোজা রাখবে, আল্লাহতায়ালা তার পেছনের জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারি)। হাদিসে বর্ণিত ‘ইহতিসাব’ শব্দের অর্থ আত্মোপলব্ধি-আত্ম সমালোচনা। আমাদের শুধু রোজা রাখলেই চলবে না। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। রোজার শুরুতে আমি কেমন ছিলাম? এখন কতটুকু উন্নয়ন করেছি? আগে তো আমার ভেতর এই দোষ ছিল। রোজা এসে কি আমাকে একটু হলেও বদলাতে পেরেছে? আগে আমি ঘুষ নিতাম, দুর্নীতি করতাম, মিথ্যা বলতাম, এখন কি তা কমে এসেছে? যদি আস্তে আস্তে কমে আসে, যেমন আগে যদি আপনি দিনে একশটা মিথ্যা বলতেন এখন বলেন নব্বইটা, এভাবে নিজেকে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন ভালো মানুষ হওয়ার প্রাণপণ সাধনা করতে পারেন। তাহলে আল্লাহপাক আপনাকে সুখবর দিচ্ছেন, বান্দাহ! তোমার পেছনের জীবনের সব ভুল আমি ক্ষমা করে দিলাম।
রোজা রেখে উপলব্ধি করতে হবে মানুষকে, মানুষের জীবনকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকাটা বেশ কষ্টসাধ্য ইবাদত। আমি আপনি তো ১০-১২ ঘণ্টা না খেয়ে থাকি, যে হতভাগা বনি আদমরা জীবনজুড়েই না খেয়ে থাকে, তাদের কষ্টটা কেমন? আমরা তো রোজা রেখে ইফতারে গলা ডুবিয়ে খেয়ে নিই, কিন্তু ওই গরিব মানুষগুলো, যাদের জীবনে কোনো ইফতারের জমকালো ভোজ নেই, নেই সাহরিতে রাজকীয় আয়োজন, তাদের অবস্থা কেমন? এখানে চুপি চুপি একটি কথা আপনাদের বলে নিই। এই যে ইফতারে আমাদের এত বাহারি আয়োজন আর সাহরিতে রাজকীয় ভোজ— এ দুটোর একটাও রোজার নিয়মের সঙ্গে যায় না। নবীজি (সা.) প্রায় সময় শুধু খেজুর, পানি আর দুধ দিয়ে ইফতার করতেন। নতুবা শুধু খেজুর খেয়েই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। সুফিরা বলেন, রোজার উদ্দেশ্য হলো, নফসকে দুর্বল করে মানুষের কাম- ক্রোধকে নিভিয়ে দেওয়া। রুহকে শক্তিশালী করা। কিন্তু কেউ যদি দিনের বেলা না খয়ে থাকাটা রাতে খেয়ে পুশিয়ে নেন, তাহলে কিন্তু এই রোজা দিয়ে না নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে, না তার রুহকে জাগিয়ে সুন্দর মানুষ হতে পারবে।
আরেকটি বিষয় হলো, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও খুব সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যখন উপবাস ব্রত করে, তখন তার কোনোভাবেই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। ওই দিনগুলো সে রাতে অবশ্যই সীমিত খাবার খাবে। তাহলে দেহ ফিট থাকবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নতুবা, তার দেহে নানা জটিলতা দেখা দেবে। এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দেখুন। প্রতিদিন দুপুরে আমরা ভাবি, এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে। ইফতারের পর কাজকর্ম, পড়ালেখা, ইবাদত-বন্দেগি সব করব। কিন্তু ইফতারের পর অবস্থা এমন হয় যে, মাগরিবের নামাজ পড়তেই কষ্ট হয়ে যায়। কেন? ওই যে, রসুলের মতো ইফতার করি না। রোজা রেখেছি ঠিক, আত্মোপলব্ধি করিনি। ইহতিসাব করিনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু রোজা রাখলেই হবে না, মনের গভীর থেকে রোজা বুঝে উপলব্ধি করলেই আমরা রোজার প্রকৃত বরকত ও ফায়দা হাসিল করতে পারব। যারা এভাবে রোজা রাখবেন, তাদের জন্যই রসুল (সা.) সুখবর দিয়ে বলেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে, রাইয়ান। যে দরজা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করতে পারবে। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রাইয়ান দরজা দিয়ে বেহেশতে যাওয়ার তাওফিক দিন। আমিন। লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
চেয়ারম্যান : বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, www.selimazadi.com