ফার্মগেটের পাবলিক টয়লেট চালান শাহ আলম। বর্তমান সরকার আমলে তিনি বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন। একই এলাকার টেম্পোস্ট্যান্ডের টাকা ওঠান চুন্নু। টেম্পোস্ট্যান্ড দখল নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল। তবে তিনিও লাইসেন্সধারী বৈধ অস্ত্রের মালিক। ফুটপাথ বাণিজ্য করেন নজরুল। অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে তিনিও বাদ যাননি। এরা তিনজনই ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা। এদের বৈধ ব্যবসা বা সামাজিক কোনো অবস্থান না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় বাগিয়ে নিয়েছেন বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স। বৈধ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যেই এরা ঘোরাফেরা করেন। অস্ত্রের লাইসেন্স প্রাপ্তির এই চিত্র এখন সারা দেশের। দলীয় পরিচয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্স পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছে, রাজনৈতিক কর্মী হলেই অস্ত্রের লাইসেন্স মিলছে। বাছ-বিচার ছাড়াই গণহারে দেওয়া হচ্ছে অস্ত্রের লাইসেন্স। এ সুযোগে সন্ত্রাসী-অপরাধী এমনকি রাস্তার লোকজনের অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ে বৈধ অস্ত্র হাতিয়ে নিয়েছে। এ অবস্থায় হাতে হাতে এখন বৈধ অস্ত্র। আর এসব বৈধ অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে খুন-খারাবি থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। গত ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় জাতীয় শোকদিবসের অনুষ্ঠানে, ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহতের পর ১০ জনের অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রশাসন। এরাও দলীয় বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। একই ভাবে মহাজোট সরকার আমলে অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গডফাদার হত্যাসহ অন্তত দুই ডজন মামলার আসামি নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা। তাদের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় নয়টি। এর মধ্যে নূর হোসেনের নামেই দুটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স যাকে তাকে দেওয়া অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে সত্যিই সেই ব্যক্তি অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারেন কিনা তা যথাযথভাবে যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে যাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তাদের অস্ত্র এবং গোলাবারুদ কেনা ও তা ব্যবহারের বিষয়েও কড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। নইলে বৈধ ব্যবহার করেই অপরাধ সংঘটিত হবে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, যাকে তাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে এ কথা ঠিক নয়। পুলিশের বিশেষ শাখার যাচাই বাছাইয়ের পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বন্দুকের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। তবে ক্ষুদ্রাস্ত্রের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। এক্ষেত্রে সবকিছুই ঠিকঠাক মতো করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ১৯৫২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কয়টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তার প্রোফাইল তেরির কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার হিসাব মিলেছে। এখনো ২০ হাজার বৈধ অস্ত্রের হিসাব মিলছে না। অভিযোগ রয়েছে, কোনো সরকারের আমলেই নীতিমালা মেনে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক তদবিরে যাকে-তাকে দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্স; যদিও মন্ত্রণালয় ও পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাচাই-বাছাই ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ১৮৭৮ ও ১৯২৪ সালের অস্ত্র আইনের বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সশস্ত্র বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা শর্তসাপেক্ষে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স নিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যতগুলো বৈধ অস্ত্র, তার মধ্যে অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। মহাজোট সরকার আমলে ৫ হাজার ৭০০ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যতগুলো শাখা, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় ও লোকসমাগম থাকে রাজনৈতিক শাখা-৪ এ। এখানে মেলে অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার সুপারিশ। আর সেই সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক দেন অস্ত্রের লাইসেন্স। সাক্ষাৎ প্রার্থীদের বেশির ভাগই দেখা করেন লাইসেন্সের সুপারিশ পাওয়ার আশায়। দলীয় নেতা-কর্মীদের ভিড় থাকে সব সময় এখানে। অভিযোগ আছে, কেবল দলীয় বিবেচনাতেই অনেকে এই সুপারিশ পাচ্ছেন।
নীতিমালা অনুযায়ী সরকারের রাজস্ব খাতে বছরে ২ লাখ টাকা আয়কর জমা, ব্যাংকের আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণপত্র (ব্যাংক সলভেন্সি), ট্রেড লাইসেন্স থাকা, রাষ্ট্রদ্রোহসহ অপরাধীর তালিকাভুক্ত না হওয়া, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক তদন্তপূর্বক প্রত্যয়নপত্র থাকা ব্যক্তিকে নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৈধ (লাইসেন্সকৃত) অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে তিনি অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হবেন। বৈধ অস্ত্রধারী সংশ্লিষ্ট থানায় নিজের নাম-পরিচয়সহ ঠিকানা লিপিবদ্ধ করবেন। থানায় এ জন্য একটি আলাদা রেজিস্টার রয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার বৈধ অস্ত্র মনিটর করবেন।
কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিমালা মানা হচ্ছে না। যে কারণে অপরাধীদের হাতে হাতে এখন বৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই বৈধ অস্ত্র দিয়ে খুন খারাবি থেকে শুরু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও ঘায়েল করা হচ্ছে।
বৈধ অস্ত্রে অপরাধ : ক্ষমতাসীন দলের এমপি পুত্র বখতিয়ার আলম রনির লাইসেন্স করা অস্ত্রের গুলিতে রাজধানীর মগবাজারে দুজন নিহত হন। রাজধানীর মিরপুরে নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়ে চাঁদাবাজি করার সময় দেলোয়ার হোসেন নামে এক সন্ত্রাসীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেলোয়ার নিজেকে আমদানি-রপ্তানিকারক পরিচয় দিয়ে ২০০৯ সালে অস্ত্রের লাইসেন্স নেন। অস্ত্রের জন্য আবেদন ফরমে তিনি যেসব তথ্য ব্যবহার করেছিলেন তার সবই ছিল ভুয়া। এমনকি তিনি যে টিন সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, তাও ছিল নকল। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শ্রাবণ এন্টারপ্রাইজের ঠিকানায় গিয়ে পুলিশ জানতে পারে ওই নামে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। গুলশানে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও তারেক তাদের লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহার করেন বলে র্যাবের তদন্তে বেরিয়ে আসে। তারেক এরই মধ্যে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হন। আর চঞ্চল এখন রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৮ সালের ২৩ মে রাজধানীর ওয়ারীতে আশিকুর রহমান অপু হত্যাকাণ্ডে চারটি বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত রমজানের কাছ থেকে তিনটি বৈধ অস্ত্র উদ্ধারও করেছিল পুলিশ। ২০১২ সালের ২৫ মে শান্তিবাগে একটি ফ্ল্যাটে খুন হন মোজাম্মেল হোসেন মিলন। তার কাছ থেকে পুলিশ একটি অস্ত্র উদ্ধার করেছিল। ওই আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক মিলনের আত্মীয়। সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের বিবদমান দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবর্ষণ ও যুবলীগ কর্মী নিহত হন। এ ঘটনার পর অনেক নেতার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কুষ্টিয়ার সরকারদলীয় আট নেতার ১০টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। দেহরক্ষীদের হাতে ভিআইপিদের বৈধ অস্ত্র : রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ বিপুলসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিজেদের নিরাপত্তায় গড়ে তুলেছেন ‘প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স। এসব ভিআইপি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব খাটিয়ে দেহরক্ষীদের নামে লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি আগ্নেয়াস্ত্র। আর এসব হাতিয়ার ব্যবহার করে সন্ত্রাসী দেহরক্ষীদের অনেকেই রাতের আঁধারে খুন, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তা থেকে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ভিআইপিদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের আগে ও পরে বৈধ অস্ত্র দিয়ে এসব অপকর্ম সংঘটিত হওয়ায় অধিকাংশ সময়ই পুলিশ তাদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পুলিশ সূত্র জানায়, আবার কখনো তারা হাতেনাতে ধরা পড়লেও লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে অপরাধ করায় তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা যাচ্ছে না। এদিকে সন্ত্রাসী দেহরক্ষীদের অপরাধের দায় ভিআইপিরাও কাঁধে নিচ্ছেন না। দায়িত্বকালীন সময়ের আগে বা পরে ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা কোথায় কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তা তাদের পক্ষে জানা সম্ভব না বলে দায় এড়িয়ে চলছেন। অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার আগে পিসিআর (প্রিভিয়াস ক্রিমিনাল রেকর্ড) খতিয়ে দেখা হয়েছে; সুতরাং এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তার দায় পুলিশকেই নিতে হবে বলে অভিযোগ তোলারও নজির রয়েছে।
শিরোনাম
- ভারতের ৩৬ স্থানে ৪০০ ড্রোন হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান, দাবি দিল্লির
- রোহিতের পর এবার টেস্ট থেকে অবসরের পথে কোহলি!
- বরেণ্য সংগীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী আর নেই
- পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত : ভারতীয় শেয়ারের দাম কমেছে ৮৩ বিলিয়ন ডলার
- পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রক কমিটির সভা ডেকেছেন শেহবাজ শরিফ
- ভারতের পাঁচ বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি পাকিস্তানের
- সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ছাড়া আইনের শাসন থাকবে না: আইন উপদেষ্টা
- সাইবার হামলায় ভারতের ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা অচল
- পাকিস্তানের গোলায় ভারতীয় কর্মকর্তার মৃত্যু
- ভারতের এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উড়িয়ে দিল পাকিস্তান
- পাল্টা হামলা: ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংসের দাবি পাকিস্তানের
- সৌদি পৌঁছেছেন ৩৭১১৫ হজযাত্রী
- একনজরে আজকের বাংলাদেশ প্রতিদিন (১০ মে)
- পাকিস্তানের ড্রোন হামলায় ভারতের পাঞ্জাবে আহত ৩
- ভাঙ্গায় জাহানাবাদ এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত
- বাংলাদেশের চারটি টিভির ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করল ভারত
- নোয়াখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মা ও শিশু নিহত, আহত ২
- জেল থেকে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার
- দোসরদের দেশ ত্যাগের সুযোগ দিচ্ছে সরকার
- কুতুবদিয়ায় মাছ ধরার সময় আটক দুই নৌকা, মুচলেকায় মুক্ত
হাতে হাতে বৈধ অস্ত্র
রাজনৈতিক কর্মী হলেই লাইসেন্স মেলে সন্ত্রাস চাঁদাবাজিতে অবাধ ব্যবহার রাস্তার লোকও পাচ্ছে লাইসেন্স
মির্জা মেহেদী তমাল ও সাখাওয়াত কাওসার
অনলাইন ভার্সন

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ খবর