শিরোনাম
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৩১

ট্রেন চালক সংকটে বিঘ্নিত হচ্ছে বিশ্রাম, বাড়ছে দুর্ঘটনা

সাইদুুল ইসলাম, চট্টগ্রাম:

ট্রেন চালক সংকটে বিঘ্নিত হচ্ছে বিশ্রাম, বাড়ছে দুর্ঘটনা

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন চলাচলে মূখ্য ভূমিকা রাখছেন লোকো মাস্টার (এলএম), সহকারি লোকো মাস্টার (এএলএম) বা ট্রেন চালকরা। তাছাড়া ট্রেন পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পরিবহন বিভাগের কর্মীরা। ট্রেন চালনার সাথে যুক্ত লোকো মাস্টার (এলএম) বা কর্মী সংকটের কারণে নিয়ম অনুযায়ী বিশ্রাম পান না। এতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়মিত রিফ্রেশার/সতেজীকরণ কার্যক্রমে যাওয়ার কথা থাকলেও সংকটের কারণে সেটিও বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিনিয়িত। ফলে লোকবলসহ নানাবিধ সংকটেই ট্রেন পরিচালনায় দুর্ঘটনা ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে রেল অঙ্গনে। তবে সম্প্রতি রেলের দুর্ঘটনা পরবর্তী এক তদন্ত প্রতিবেদনে এলএম, এএলএম ও গার্ডদের রিফ্রেশার কার্যক্রম নিয়মিত করতে সুপারিশও করা হয়েছে বলে রেল সূত্রে জানা গেছে।

রেলওয়ের তথ্য মতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে ট্রেন পরিচালনার জন্য পাহাড়তলী ও ঢাকা লোকোশেডে পোষ্টিং হয় চালকদের। এর মধ্যে পাহাড়তলী লোকোশেডে লোকোমাস্টারের মঞ্জুরীকৃত পদ ২৩৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৬৫ জন। এছাড়া ঢাকা লোকোশেডে মঞ্জুরীকৃত পদ ২৩৩ টির মধ্যে ১৬৯ জন কর্মরত রয়েছে। যদিও মঞ্জুরীকৃত এই পদ ১৯৮৩ সালে আন্ত:নগর  ট্রেন চালুর পর সৃজন করা হয়েছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ বছরে রেলে যাত্রীবাহী ট্রেনের সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও মঞ্জুরীকৃত পদ এখনও বাড়েনি। তাছাড়া মঞ্জুরীকৃত পদের মধ্যেও লোকোমাস্টাররের সংকটও তীব্র। তবে পূর্বাঞ্চলের মোট মনজুরীকৃত পদ হচ্ছে ৯৮০ জন। এর মধ্যে  কর্মরত আছেন ৬৪৭ জন এবং পদ শূন্য আছে ৩৩৩টি।

সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মচারীরা প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রান্তি বিনোদনের ১৫ দিনের ছুটি পেয়ে থাকেন। কিন্তু ট্রেন চালানোর সাথে সাথে যুক্ত রেলওয়ের কর্মীরা প্রতিবছরই রিফ্রেশার কোর্সে অংশ নেয়ার কথা। প্রতিটি বিভাগের রানিং স্টাফরা গ্রুপ আকারে ট্রেন পরিচালনার জন্য ট্রেনিং কোর্স ছাড়াও ঐচ্ছিক ছুটি ভোগ করেন। এতে ট্রেন পরিচালনার নিয়মগুলো ঝালিয়ে নেয় কর্মীরা। পাশাপাশি চালক-সহ বিভিন্ন ট্রাফিক স্টাফদের চক্ষু পরীক্ষা, রুট পারমিট নবায়ন করা হয়। তবে কর্মীর বয়স ৪৫ বছর পেড়িয়ে গেলে প্রতিবছরই ভিশন টেষ্ট বা চক্ষু পরীক্ষা করতে হয়। এছাড়া বয়স ৪৫ বছরের কম হলে প্রতি দুই বছর পর পর ভিশন টেষ্ট করাতে হয়। চোখের দৃষ্টি শক্তি পরীক্ষা নিয়মিত করানো হলেও প্রতি তিন বছর পর সব রানিং স্টাফই শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ভোগ করতে পারেন না। তবে কর্মী সংকটের কারণে রানিং রিফ্রেশার কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।  

রেলপথ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তারা বলেন, রেলের সবচেয়ে গুরুত্বূপূর্ণ সেবা প্রদান করে চালক ও গার্ড। একটি ঝুঁকিহীন ট্রেন চালাতে তারা পরিশ্রম করলেও লোকবল সংকটের কারণে নানান দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। অনেক সময় নির্ধারিত বিশ্রামের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে নতুন কোন ট্রেনের চালানোর বিষয়ে ডাক পরে। এতে ট্রেন চালানোর বিষয়ে ঝুঁকি থেকেই যায়।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বশীল উর্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তূর্ণা নিশীতা ট্রেনের উভয় চালক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছেন। তবে রেলের দীর্ঘদিনের লোকবল কাঠামোতে ট্রেন চালকের সংখ্যা তুলনামূলক কম। আমরা ইতোমধ্যে  লোকবল কাঠামো সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ট্রেন চালকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি ছাড়াও রিফ্রেশার কার্যক্রম বেগবান করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, রেলওয়েতে তিন ধরনের চালক বা লোকোমাস্টার রয়েছে। প্রধান চালক বা লোকোমাস্টার, সাব-লোকোমাস্টার ও সহকারী লোকোমাস্টার। প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর একজন চালককে নূন্যতম ১২ ঘন্টা বিশ্রাম  দেয়া বাধ্যতামূলক। অনেক সময় ট্রেন চালানোর মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্রাম পেলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। সংকটের কারণে কেউ কেউ বাড়তি উপার্জনের জন্য নির্ধারিত সময়ের আগেই ট্রেন চালানোর জন্য প্রস্তুতি বলে দাবি করে। আবার উপযুক্ত কর্মী না থাকায় কর্মকর্তারাও দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্রামরত চালককে ট্রেন চালানোর অনুমতি দেয়।

রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেলের রানিং স্টাফরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। দেশের বিভিন্ন রুটে রানিং রানিং রুম থাকলেও একজন চালকের খন্ডকালীন বসবাসের জন্য  সেগুলো উপযুক্ত নয়। এছাড়া বিভিন্ন রুটে ট্রেন চালানো নানান প্রতিবন্ধতা থাকলেও সেগুলো নিরসনে রেলওয়ে উদ্যোগ না নেয়ায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রানিং স্টাফ বা ট্রেন চালকরা বলেন, রেলের প্রতিটি রানিং রুম রেল স্টেশন এলাকার সবচেয়ে পুরনো টিনশেডের ঘর। চারপাশে আর্বজনা, স্যাঁতস্যাঁতে রুমের কারণে মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। পাশ্ববর্তী সড়কের যানবাহনের আওয়াজ ছাড়াও আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় চালকরা ট্রেন পরিচালনা শেষে স্বস্থিতে বিশ্রাম নিতে পারে না। এ কারণে অনেক সময় নির্ঘুম সময় পাড় করতে হয়। এতে পরবর্তী ট্রেন চালিয়ে নিতেও সমস্যায় পড়তে হয়।

রানিং স্টাফদের নেতৃবৃন্দরারা অভিযোগ করে বলেন, ট্রেন চালকদের জন্য বিভিন্ন সেকশনে মধ্যবর্তী রানিং রুম রয়েছে। এসব রানিং রুমে (একটি প্রান্ত থেকে  ট্রেন নিয়ে এসে চালকরা বিশ্রাম নেন) অপ্রতুল সুযোগ সুবিধার কারণে বিশ্রাম বিঘ্নিত হয়। পূর্বাঞ্চলের রানিং রুম রয়েছে আখাউড়া, লাকসাম, ঢাকা, চাঁদপুর, কেওটাখালী (ময়মনসিংহ), দেওয়ানগঞ্জ বাজার, কুলাউড়া, নোয়াখালী ও সিলেট। রেলওয়ের পক্ষ থেকে রাঁধুনী থাকার কথা থাকলেও অনেক রানিং রুমে ট্রেন নিয়ে আসা চালকরা হোটেলে গিয়ে রাতের/দুপুরের খাবার গ্রহণ করতে হয়। অনেক রানিং রুমে বয়-বেয়ারা থাকার কথা থাকলেও নেই। কিছু কিছু রানিং রুমে বয়-বেয়ারা থাকলেও রেলের অন্যত্র কাজ করানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে কোন ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর চালকদেরই বাজার করে রাঁধুনীর মাধ্যমে রান্না করাতে হয়। রানিং রুমগুলোর  নোংরা পরিবেশ ও টয়লেটগুলো দুর্গন্ধময়, রুমগুলো স্যাঁতস্যাঁতে হওয়ায় অনেক ট্রেন চালকের বিশ্রাম বিঘ্নিত হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত ট্রেনের চাপে অনেক সময় ১২ ঘণ্টা বিশ্রামের আগেই ফিরতি ট্রেন নিয়ে যাত্রা করতে হয় চালকদের। এ কারণে ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি থাকছে।

বিডি প্রতিদিন/মজুমদার


আপনার মন্তব্য