প্রকাশ : ৬ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:০০

ভাই, আপনারে কেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বানায় না?

ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

ভাই, আপনারে কেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বানায় না?
ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

এপিডেমিওলজিতে মাস্টার্স করে ভেলোর থেকে কেবল ফিরেছি, স্বাস্থ্যখাতের সবকিছু বদলে দেবার স্বপ্নে বিভোর। প্রিয় দল আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালাউদ্দিন ইউসুফসহ ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে চিনি। একটা আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদানের কথা চলছে, এমন সময় বিএমএর সে সময়ের মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই বললেন, ইউএনডিপি সরকারকে কিছু ডোনেশন দেবে আর্সেনিক নিয়ে কাজ করার জন্য। কাজটি করবে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল, সেখানে আমাদের নিজস্ব একটা লোক থাকা দরকার। সরকারের কথা ভেবে নামমাত্র বেতনে কাজে লেগে গেলাম। 

আর্সেনিকের শুরুতে তখনো ডিনায়েল ফেজ ছিল। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার এটাকে পাত্তাই দেয়নি। পরবর্তীতে জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে অর্সেনিক সমস্যাকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন দাতা গোষ্ঠীও সাহায্য করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর্সেনিক নিয়ে তখন আরেক সমস্যা। তেমন কোন ডাটা নাই, অথচ ব্যাপক ভীতিকর এক অবস্থার সৃষ্টি হলো। টিউবওয়েল রাতারাতি ভিলেন হয়ে গেলো। এমতাবস্থায়, কম্যুনিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান স্যার আমাকে ২০০ গ্রামে জরীপ করার দায়িত্ব দিলেন। জরীপের পরিকল্পনা, গ্রাম নির্বাচন, প্রশ্নমালা তৈরী, ডাটা কালেকশনের জন্য একাধিক টিম গঠনসহ প্রায় সব কাজই আমি করলাম। 

জরীপ শেষ হলো, আমরা আক্রান্ত জনপদের কিছুটা চিত্র পেলাম। সেই সময়ে আমি মাঠ পর্যায়ে আর্সেনিক নিরসনে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলাম। আমার পরের কর্মস্থল এনজিও ফোরাম আমাকে ব্যাপক সুযোগ দিয়েছিল, আমি দেশী-বিদেশী সংস্থার সাথে অনেক কাজ করেছি। যেহেতু আমি তত্ত্বের আলোকে বাস্তবের প্রেক্ষিতে কথা বলতাম, সেহেতু খুব অল্প সময়ে আমার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়েছিল। তারপর তো সরকারের পরিবর্তন হল, আমিও দেশ ছাড়া হলাম। যদিও দেশের থেকে মানসিকভাবে কখনো বিচ্ছিন্ন হইনি, তবু দূরেই তো থাকি।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরার একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণার উপরে সেমিনারে একটা লেকচার দেবার কথা ছিল। মূলত ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আমার গবেষণার অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। সেমিনারটার নাম দিলাম ‘লেট’স টক রিসার্চ’। দুদিন আগে আমার এক সময়ের পিএইচডি ছাত্র ড. তানভির আবীর বললো, ‘গুরু, করোনা নিয়ে কথা বলেন’। দুদিন আগে টপিক পরিবর্তনে আমি মহাবিরক্ত, তার উপর বইমেলা, অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। তানভির নাছোড়বান্দা, অগত্যা দুদিনে সব বাদ দিয়ে ব্যাপক পড়াশুনা করলাম। তখন থেকেই বুঝতে পারছিলাম, সীমান্ত রক্ষার উপরে বাংলাদেশের করোনা ভবিষ্যত নির্ভর করছে। 

সেই থেকেই এ কথা থেকেই বলে আসছি। মার্চে এসে আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে কথা বলেছি, সাথে আমাদের ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর) তো আছেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর যখন ‘করোনা কোন ব্যাপারই না’, ‘বাংলাদেশে করোনা আসবে না’ মানসিকতা নিয়ে ডিনায়েল ফেজে বুঁদ, তখন এফডিএসআরই সংবাদ সম্মেলন করে দেশব্যাপী একটা হৈ চৈ বাধিয়ে দিয়েছে। আমি ধারাবাহিকভাবে করোনা নিরসনের আদ্যোপান্ত লিখেছি। আমাদের এফডিএসআরের টিমটা অসাধারণ দরদ আর যুক্তি দিয়ে সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশের করোনা নিয়ন্ত্রণে এফডিএসআর জাতির বিবেকের ভূমিকা পালন করেছে বলেই আমার ধারণা। এফডিএসআরের অনেকেই টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় সোচ্চার হয়েছে, দীর্ঘ ছুটি উপলক্ষে দেশবাসীর জন্য টেলিমেডিসিন সার্ভিস চালু করেছে।

আমরা যখন করোনা নিয়ে সোচ্চার, এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দিক নির্দেশনামূলক ভূমিকা রাখছি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তখন অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, ‘ভাই, আপনারে কেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বানায় না?’ কথাটি আমি আজকাল অনেকের কাছেই শুনছি, তবে কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করিনি।

যারা ভালবেসে আমাকে এই প্রশ্নটি করেছেন, তাদের সবাইকে মন থেকে ধন্যবাদ দিয়ে এবার প্রশ্নটির উত্তর দেই। আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলে বর্তমান মন্ত্রীর চেয়েও হয়তো আরো গুবলেট করে ফেলতাম। একজন মন্ত্রী হলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সবসময় ডাক্তারই হতে হবে এমন কোন কথা নাই। তবে স্বাস্থ্যখাত সঠিক ভাবে চালানোর জন্য তাকে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। তিনি নিজে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী। পর্যাপ্ত জ্ঞান, দক্ষতা না থাকা সত্বেও তিনি নিজে সব বুঝলে তো হবে না। 

এই যে এত বড় একটা মহামারীর মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ, এটা মোকাবেলায় কি তিনি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়েছেন? নাকি জোর করে সবকিছু চাপিয়ে রেখে ডিনায়েল ফেজে বাস করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগেছেন? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল, বিশেষজ্ঞদের সাথে বসে ফেব্রুয়ারি মাসেই করোনা মোকাবেলার ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্ল্যান তৈরী করা, এবং আমলাতন্ত্রের কাজ ছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা। তিনি সেসব করেননি, উল্টো তার অধীনস্থ আমলারা মাঝেমধ্যেই উল্টোপাল্টা নোটিশ জারি করে পরিস্থিতি জটিল করেছে। এখন পুরো জাতি তাদের অদক্ষতা আর ব্যর্থতার মাশুল দেবার প্রতীক্ষায়। উপরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের খুব বেশী অপশন এখন আর হাতে নাই। তবে কারো সময় থাকলে মনের ক্ষোভ ঝাড়তে গণশত্রু রুবানা হক, হেলেনা জাহাঙ্গীরদের বিরূদ্ধে মামলা করতে পারেন।

আমি প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতে চাইলে বা মন্ত্রী হবার দৌড়ে থাকলে তো দেশেই থাকতাম। এই যে করোনা নিয়ে এত কিছু বলেছি, তা কি মন্ত্রী হবার বাসনা থেকে? মোটেও না। আমি পেশায় এপিডেমিওলজিস্ট। অনেক মেধাবী না হলেও পঁচিশ বছরের বেশী সময় ধরে দেশে-বিদেশে তো এ কাজটাই করেছি। আজ করোনা নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়েই মনে হলো, ভালোবাসার বাংলাদেশটাকে সম্ভাব্য করোনার বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা উচিত। সেই জন্য এফডিএসআরকে সাথে নিয়ে, নিজের সমস্ত যোগাযোগের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য যা ভালো মনে করেছি তা বলেছি। আর এইসব বলতে গিয়ে শত্রু বাড়িয়েছি অনেক, ব্যক্তিগতভাবে আক্রমনের শিকার হয়েছি তবু থেমে থাকিনি। বরং দিনের শেষে কিছুটা স্বস্তি পাই যখন দেখি সরকার আমাদের প্রায় সব পরামর্শই গ্রহণ করেছেন।

মন্ত্রীত্বের লোভে নয়, সামান্য একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এ আমাদের নিবেদন। একজন কবিকে মন্ত্রীত্বের বেড়াজালে আটকাতে নেই!


লেখক: চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এফডিএসআর)।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত) 

বিডি-প্রতিদিন/সিফাত আব্দুল্লাহ


আপনার মন্তব্য