শিরোনাম
প্রকাশ : ৮ জুলাই, ২০২০ ০১:৪২

পিএইচডির গল্প-২

আসিফ নজরুল

পিএইচডির গল্প-২
আসিফ নজরুল

পিএইচডি কি সে সম্পর্কে তেমন ধারনা ছিল না আমার। শুধু জানতাম পিএইচডি করলে নামের আগে সারাজীবন ড. লেখা যায়। জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব আসে তাতে। পিএইচডির নানা গল্পও শুনতাম। ‘রিপলীজ্ বিলিভ ইট অর নট’ জাতীয় গল্প। কেমব্রিজের কোন জিনিয়াস নাকি সাত পাতার থিসিস করে পিএইচডি পেয়ে গেছেন। তারটা অংকের। তাই বলে সাত পাতার। পরে শুনলাম আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অর্থনীতি বিভাগের ডঃ আশিকুজ্জামান ৫৩ পাতার পিএইচডি করেছেন। সেও হার্ভার্ড থেকে।

এমনিতে নাকি সামাজিক বিজ্ঞান বা আইনের পিএইচডি করতে চার-পাঁচ শত পৃষ্ঠার মতো লেগে যায়। সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ বছর। অনেকের আবার সাত- আট বছরেও হয় না। তারা ফিরেন না আর দেশে। ফিরলে এক ধরনের বৈরাগ্য নিয়ে কাটিয়ে দেন বাকী জীবন। কেউ যোগ দেন তবলিগে। কেউ আবার বিদেশে রিজক্টেড থিসিস একটু চেঞ্জ করে দেশে থেকে পিএইচডি নিয়ে নেন। তাদের নাকি ঝাঁঝ থাকে একটু বেশী। আগে খান, পিছে খান, খান আবদুল গাফফার খানের মতো ব্যাপার স্যাপার!

এসব গল্প শোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না আমার প্রথমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো এমন চিন্তাও ছিল না। ছত্রিশ দিনের ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি ছেড়েছুড়ে শাহাদত ভাই (শাহাদত চৌধুরী) আর সাংবাদিকতার মোহে আবার বিচিত্রায় যোগ দিয়েছিলাম। আব্বা জানলে কষ্ট পাবে তাই পালিয়ে পালিয়ে থাকতাম এ্যলিফেন্ট রোডের এক বাড়িতে। শেষে মাঝপথ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান। খুবই এনজয় করতাম পড়ানো আর আমার কিছু অসাধারণ স্টুডেন্টের ভালোবাসা।

সেই আনন্দ সহ্য হয় না কিছু কলিগের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পিএইচডি করতে হয় এই বলে কান ঝালাফালা করে ফেলেন তারা। তাদের যুক্তি- পিএইচডি না করলে এক্সপাটিজ ডেভেলপ করবে কিভাবে? স্টুডেন্টদের সাথে শিক্ষকদের পার্থক্য রইলো কি তাহলে? নিখাঁদ গবেষণা প্রক্রিয়া শিখবে কেমন করে? এসব হেভিওয়েট যুক্তির উত্তর জানতাম না। তাই বিরক্ত হয়েই কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য দাঁড়াই।

১৯৯৩ সালে আমার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যান্ট কমিশনে আইন বিভাগ থেকে এক্সপার্ট ছিলেন অধ্যাপক ড. কমরুদ্দিন স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল দলের ডাকসাইটে নেতাও তিনি। ছাত্রজীবনে তিনি আমাকে দেখেছেন আধা গুন্ডা হিসেবে। সেই আমি করবো পিএইচডি!

তিনি বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকান। বহু ধরনের জটিল প্রশ্ন করেন। তার নিষ্ঠুরতায় হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। পরের বার যাই প্রচন্ড জেদ নিয়ে। বৃটিশ কাউন্সিল থেকে আইএলটিএস-এ ৭ পেয়েছি। সোয়াসে এডমিশন কনফার্ম্ করেছি। হাটুভাঙ্গা পরিশ্রম করে কয়েকদিন পড়েছি। সিরিয়াস একটা লুক আনার জন্য কোর্ট টাই লাগিয়েছি। আশ্চর্য ব্যাপার, এবার তিনি তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেন না আমাকে। বিকেলে শুনি মনোনীত হয়ে গেছি আমি।

পিএইচডি সম্পর্কে বাধ্যতামূলক আগ্রহ জন্মে এরপর। আমাদের তখনকার ডীন ডঃ এরশাদুল বারী পিএইচডি করেছেন লন্ডন থেকে ডঃ মিজানুর রহমান মস্কো থেকে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করি গম্ভীর গম্ভীর ভাব করে। বারী স্যারকে বলেছিলাম পিএইচডি যখন করবই দেশের খুব কাজে লাগে এমন একটা টপিক নিয়ে করবো। তার পরামর্শে আন্তর্জাতিক নদী আইন বেছে নেয়া।

তিনি আমাকে পইপই করে বলেন এ বিষয়ে যা কিছু বইপত্র আছে সব সংগ্রহ করে লন্ডনে নিয়ে যেতে। তার সিরিয়াসনেস দেখে মনে মনে হাসি। ১৯৯৪-এর ১০ সেপ্টেম্বর গোটা কয়েক বিচিত্রা, একটা ইংরেজি বাংলা অভিধান আর প্রবল তাচ্ছিল্য নিয়ে পিএইচডি করতে রওয়ানা দেই লন্ডনে। যাওয়ার দিন মিজান স্যার আর ছাত্রছাত্রীরা হাউমাউ করে কাঁদলো। আমিও।

পিএইচডি রেজিস্ট্রেশনের প্রথম দিনেই গণ্ডগোল বেধে যায় ইন্ডিয়ার পুনমের সঙ্গে। তার চেহারা ইন্দিরা গান্ধীর মতো। সে ইন্দিরার আত্নীয় কিনা এটা জিজ্ঞেস করতেই প্রবল ঘৃনায় নাক মুখ কুঁচকে ফেলে। সে ইতিহাসে পিএইচডি করবে। ইতিহাস তো সব লেখা হয়ে গেছে! এটাতে আবার পিএইচডি কিসের? এটা বলতেই সে নির্বাক বিস্ময়ে পাথর হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।

কলম্বিয়ার বিশালদেহী গঞ্জালেসকে বলিঃ আমেরিকার কাছে হেরে ফুটবলার এস্কোবারকে খুন করে ফেলেছ কেন তোমরা? সে রাগী গলায় ঘোত ঘোত করে কিছু বলে। মানে মানে সরে পড়ি আমি।

প্রথমদিনে নাকি সুপারভাইজারের সঙ্গে গিয়ে পরিচয়পর্ব সারতে হয়। আমার সুপারভাইজারের নামটা জেনে গেছি। পরে একদিন পরিচিতি হলে হবে। ঘুরে ঘুরে সোয়াসের ঝকঝকে ভবন দেখি। লাইব্রেরীতে ঢু দেই। তারপর নিচে পাব-এ গিয়ে পুল খেলা দেখতে বসি। বিলিয়ার্ডের মিনি সংস্করণ পুল। লাঠি দিয়ে পুশ করে টেবিলে রাখা বল ফেলতে হয় গর্তে। এ আর এমন কঠিন কি?

কিছুক্ষনের মধ্যেই সবাইকে মুগ্ধ করে ফেলার সম্ভাবনায় নিশ্চিত হয়ে আমি খেলা শুরু করি। একমিনিটের মধ্যে মুগ্ধ হয়েই সবাই খেলা দেখতে থাকে আমার। লাঠি দিয়ে বল ফেলা দূরের কথা, বলে লাগাতে পারছি না আমি। মুগ্ধই তো হওয়ার কথা। পাব-এর ধারেকাছে যাই না কতদিন। দিন কাটাই কেমন করে। তাই অবশেষে ফিলিপের দরজার সামনে হাজির হই একদিন।

ফিলিপ ছয়ফুট লম্বা, অতিরিক্ত ফর্সা, হ্যারী পটার টাইপের চেহারার। হেসে হেসে, আন্তরিকভাবে কথা বলে সে প্রথম দিন। তার সামনে সামান্য মোটা, মায়াবী চেহারার একটা মেয়ে গম্ভীর হয়ে বসে। ফিলিপ পরিচয় করিয়ে দেয় ভাসিলিকি রোমেলিয়াতু। সংক্ষেপে ভিভি। পিএইচডি করছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মেরিন আইনের উপর।

আমি ফিলিপের আন্তরিকতা উপভোগে ব্যস্ত। ভিভিকে খেয়াল করি না ভাল করে। পাঁচ মিনিটের মাথায় বেসমেন্ট-এ কফি রুমে ওর সঙ্গে আবার দেখা। আমি মেশিন থেকে কফি কিনতে পারছি না। ভিভি এসে দেখিয়ে দেয়। আমি হাসিমুখে ফিলিপের প্রশংসা করি। ভিভি গম্ভীর হয়ে থাকে। বলে- তুমি কি জানো ফিলিপ সম্পর্কে?
-মানে?
-ফিলিপের সঙ্গে আমি কাজ করছি একবছর ধরে। ওর আগের স্টুডেন্ট কাজ করেছে পাঁচবছর। তুমি কি জানো তার কি হয়েছে?
-কি?
-তার পিএইচডি হয়নি। ফিলিপ তাকে থিসিস-ই জমা দিতে দেয়নি।
-কেন? আমি অবাক হয়ে যাই।
-ফিলিপ একজন পারফেকশনিস্ট। ওকে সন্তুষ্ট করা খুবই টাফ। আমাকে সুজান বলেছিল ওর কাছে পিএইচডি না করতে। আমি শুনিনি। তুমি এই ভুল করনা।

এই মেয়ে কুচুটে টাইপের। আমি পাত্তা দেইনা তার কথা। গুজ স্ট্রিট-এ যাই রানা ভাই ( অধ্যাপক ডঃ বোরহান উদ্দিন খান)- এর সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য। তিনি তিন বছর ধরে সোয়াসে পিএইচডি করছেন। নিশ্চয়ই ভিভির চেয়ে বেশি জানেন।

তার ওখানে গিয়ে দেখি সর্বস্বান্ত মানুষের মতো চেহারা হয়েছে তার। সেই চেহারা নিয়ে আধমরা হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। আমাদের ডিপাটমেন্ট-এর দুর্দান্ত স্টুডেন্ট ছিলেন তিনি। ভিভির মতই মাস্টার্স করেছেন এলএসই-তে। তার এই অবস্থা কেন?

রানা ভাইয়ের সমস্যা শুনে পুরোপুরি ভড়কে যাই। তারও সমস্যা সুপারভাইজার নিয়ে। তার সুপারভাইজার সোয়াসের রাগী বুড়ো পিটার স্লিন। রানা ভাইয়ের নাম শুনলেই নাকি ক্ষেপে যায় সে। কেন? রানা ভাই একাডেমিক আর্গুমেন্ট করেছিল তার সঙ্গে। 
এই কাজটা ছাত্রজীবন থেকেই তিনি করে থাকেন প্রবল আত্নবিশাস নিয়ে। সেটা পছন্দ হয়নি স্লিনের। রানা ভাই-এর থিসিস শেষ। সেই থিসিস পড়েই দেখে না সে।
রানা ভাই পাঁজর ভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েঃ ছয়মাস ধরে বসে আছি। জাস্ট বসে আছি। আমি তাকে ফিলিপ আর ভিভির কথা বলি।

তার প্রথম প্রশ্নঃ তিন বছরে করতে চাও পিএইচডি?
জি, পারলে তারও আগে।
তাহলে ফিলিপকে ছাড়ো।
কি?
পারলে আন্তর্জাতিক আইনে পিএইচডি করা বাদ দাও।
তাহলে কিসে করবো?
মুসলিম ল’ বা সাংবিধানিক আইন। রানা ভাইয়ের পোড় খাওয়া কন্ঠের উত্তর।
তখনি গোয়ারের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমি। আন্তর্জাতিক আইনেই পিএইচডি করবো, ফিলিপের কাছেই।
হাম কিসিসে কাম নাহি!


(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ তাফসীর


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর