শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ২২:৪৫

হাতঘড়ি দিয়ে এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাতঘড়ি দিয়ে এটিএম কার্ডের তথ্য চুরি
শরিফুল ইসলাম
Google News

সুপার শপ ‘স্বপ্ন’র কর্মচারী শরিফুল ইসলাম (৩৩)। গ্রাহকদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর চুরি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় দেশটির এক রুমমেটের কাছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির হাতেখড়ি হয় তার। এরপর দেশে ফিরে এ কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন শরিফুল।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, সুপার শপে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করার সময় শরিফুল ব্যবহার করতেন ডিজিটাল হাতঘড়ি, যাতে সংযুক্ত করা ছিল বিশেষ মিনি কার্ডরিডার। সেটি দিয়েই গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করতেন তিনি। পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতির মূল হোতা শরিফুল। তার কাছ থেকে এক হাজার ৪০০টি ক্লোন কার্ড এবং একটি টয়োটা এলিয়ন গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এদিকে কার্ড জালিয়াতির মামলায় শরিফুল ইসলামকে চার দিন রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম ফাহাদ বিন আমিন চৌধুরী রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে মিরপুর থানায় করা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাইবার পুলিশের এসআই ফজলে রাব্বী। গতকাল দুপুরে সিআইডি সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ মিনি কার্ডরিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের এটিএম কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্য স্ক্যান করা হতো। তারপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতেন, কৌশলে সেটিও টুকে নেওয়া হতো এবং বিলের রি-প্রিন্ট দিয়ে ওই কপির পেছনে তা লিখে রাখতেন শরিফুল। এভাবেই এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করতেন তিনি। পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শরিফুলকে গ্রেফতারের পরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাতে মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, এক হাজার ৪০০টি ক্লোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ডরিডার ও রাইটার, তিনটি পজ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহূত), দুটি মিনি কার্ডরিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট, আটটি মোবাইল ফোনসেট, একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, তিনটি এনআইডি কার্ড, একটি পরচুলা ও একটি কালো রঙের সানগ্লাস জব্দ করা হয়। মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংঘটিত পাঁচটি ব্যাংকের (ব্র্যাক ব্যাংক, সিটিব্যাংক, ইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) কার্ড জালিয়াতি ঘটনার তদন্ত হয়। আমরা জানতে পারি, ব্যাংকের গ্রাহকরা বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে পণ্য কেনার পর কার্ড পাঞ্চ করার সময় একটি চক্র সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করে। পরে এসব ক্লোন কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি করে নেয়। সেই অভিযোগে আসামি শরিফুলকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়।’ তিনি বলেন, শরিফুলের গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরের হেমায়েতপুর। তিনি হাটবোয়ালিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি এবং গাঙনী ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি নিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তার রুশ রুমমেট ইভানোভিচের কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার কৌশল শিখে আসেন তিনি। দেশে আসার পরপরই সে কার্ড জালিয়াতি শুরু করে। ২০১৩ সালে এ-সংক্রান্ত দুটি মামলা হয়। সেই মামলায় প্রতারক শরিফুল ১৮ মাস জেলে থাকেন। এরপর তিনি কিছুদিন স্টুডেন্ট কন্সালটেন্সি ফার্ম খোলেন। সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে রুমমেটের কাছ থেকে শেখা কৌশল আবারও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। শরিফুলের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলার প্রস্তুতি চলছে। সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, শরিফুল সুপার শপ স্বপ্নের বনানী শাখায় কাজ করার সময় নিজের হাতঘড়িতে সংযুক্ত বিশেষ স্কিমিং মিনি কার্ডরিডারের মাধ্যমে গ্রাহকের কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্যাবলি নিয়ে নিতেন। তারপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতেন তখন কৌশলে পিন নম্বর দেখে নিয়ে বিল পরিশোধের পর আবার গ্রাহকের যাওয়ার পর রি-প্রিন্ট দিয়ে কপি সংগ্রহ করে তার পেছনে পিন নম্বরটি লিখে রাখতেন তিনি। পরে বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ ও ডিভাইসের মাধ্যমে তিনি কাস্টমারের তথ্যাবলি ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড বানিয়ে কোনো একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতেন। বুথে টাকা তোলার সময় সিসি ক্যামেরায় যাতে তাকে চেনা না যায় সে জন্য পরচুলা ও চশমা ব্যবহার করতেন তিনি। মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, সুপার শপে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এই জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকায় তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। শরিফুল ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করেন এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। এ সময় ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি জারা জাবীন মাহবুব বলেন, ‘কয়েকজন গ্রাহক তাদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন যে ব্যাংক থেকে কেউ তাদের টাকা তুলে নিয়েছেন। তখন তারা আমাদের জানালে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দিই। পরে আমরা বিষয়টি সিআইডিকে জানাই। মার্চ মাসে এ-সংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।’