শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ মে, ২০২০ ২৩:২২

থামছেই না মানব পাচার

১০ বছরে ২৯ পয়েন্ট হয়ে পাচার হয়েছে সাড়ে চার লাখ মানুষ!

সাঈদুর রহমান রিমন

থামছেই না মানব পাচার

দালালদের বর্বর নির্যাতনে জীবনহানি সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে মানব পাচার থামছে না। ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে লোকজন অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দিয়েই চলছে। ভাগ্য বদলাতে গিয়ে দালাল নামক মানব পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন তারা। সম্প্রতি মানব পাচারের নৃশংসতায় বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রাণহানির মতো নানা ভয়াবহ ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ২৮ মে লিবিয়ার দুর্গম মরু এলাকায় বন্দীদশায় আটকে থাকা ২৬ বাংলাদেশি সীমাহীন নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগেও  লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার সময় নৌকাডুবির ঘটনায় ৩৯ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। নিখোঁজ হয়ে যান অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক। এখনো ইউরোপ আমেরিকার পথে কত শত বাংলাদেশি যে নানা নির্মমতায় আটকে আছেন তার কোনো হদিস নেই। থাই-মালয় সীমান্তের গভীর জঙ্গলেও শতাধিক গুপ্ত আস্তানায় কয়েক হাজার বাংলাদেশি বন্দী থাকার খবর রয়েছে। মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য তাদের ওপরও চলছে সীমাহীন বর্বরতা। এসব আস্তানায় অকথ্য নির্যাতন আর নৃশংসতায় বহু বাংলাদেশিকে হত্যা করারও অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যেই জঙ্গলের একাংশে অভিযান চালিয়ে থাইল্যান্ডের প্রশাসন অন্তত ৩২টি গণকবরের সন্ধান পেয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ২৬টি মৃতদেহ। অভিযানকালে লোকালয়ের অদূরে জঙ্গলে ৬০টিরও বেশি বন্দীশিবির আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব শিবির থেকে কয়েক দফায় ১৮১ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধারও করা হয়। তবে অভিযানের আগেই পাচারকারীরা আরও কয়েকশ বাংলাদেশিকে দুর্গম কোনো আস্তানায় সরিয়ে ফেলে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হওয়ার আশায় পাড়ি জমানো শত শত বাংলাদেশি ফাঁদে পড়েছে লিবিয়ার মরুভূমি ও পেরুর দুর্গম বনাঞ্চলে। বন্দীদশায়      থাকা অনেককে মুক্তি দেওয়ার কথা বলে তাদের স্বজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ হাতিয়েও নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও মুক্তি মেলেনি তাদের। বরং এক পাচারকারী গ্রুপ এসব বাংলাদেশি নাগরিককে ক্রীতদাস হিসেবে আরেক পাচারকারী গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। জিম্মিদশায় থাকাবস্থায় সেখানে খাদ্য ও পানির অভাবে করুণ মৃত্যু ঘটেছে অনেকের।

মানব পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশায় অনেকটা জেনেশুনেই অনেক যুবক ঝাঁপ দিচ্ছেন নিশ্চিত মৃত্যুকূপে। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুরাশি, পাহাড়-পর্বত আর বিপৎসংকুল গভীর বনজঙ্গল হেঁটে পাড়ি দিচ্ছেন তারা। পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই ১০-১২টি দেশ পেরিয়ে পৌঁছেছেন স্বপ্নের ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো দেশে। কণ্টকাকীর্ণ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝে মাঝেই ঝরে পড়ছে বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর প্রাণ। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও ঠাঁই হয় কারাগারে।

জানা যায়, অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে অভিবাসী প্রত্যাশীদের প্রথমেই নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই, লিবিয়া কিংবা মিসরে। সেখানকার দুর্গম মরুপথ পাড়ি দিয়ে ব্রাজিল, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, কলাম্বিয়া, পানামা হয়ে মেক্সিকো পৌঁছানোর ভয়ঙ্কর রুট আবিষ্কার করে পাচারকারীরা। এ রুটে তাদের আড়াআড়িভাবে পাড়ি দিতে হয় ভয়ঙ্কর জঙ্গল ‘ড্যারিয়েন গ্যাপ’। ছয় শতাধিক বর্গমাইলের এ দুর্গম বনপথে রয়েছে বড় বড় বিষাক্ত সাপ আর ভয়ঙ্কর সব বন্যপ্রাণী।

‘ড্যারিয়েন গ্যাপ’ পার হয়ে সদ্য আমেরিকায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণ লক্ষ্মীপুরের অধিবাসী ইমতিয়াজ আহমেদ, সোহেল আলম, মাঈনুদ্দিনসহ কয়েকজন স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘টানা ১৪ দিন কোনো খাবার পাইনি। বনের লতাপাতা আর শুধু নদী-ছড়ার পানি খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ১৯ দিন ধরে ঘুম নেই। আমেরিকার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার এক মাস চার দিন পর আমরা পানামার ভয়ঙ্কর জঙ্গল পেরিয়ে আমেরিকায় পা রাখতে সক্ষম হলেও বিপদ পিছু ছাড়েনি।’ একই সফরের সঙ্গী ফেনীর আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘জঙ্গলের পথে আটজন সঙ্গীর লাশ ফেলে তবেই আমেরিকা পৌঁছাই। পৌঁছেই ভেবেছিলাম স্বর্গে এলাম। কিন্তু নানা ভোগান্তি পেরিয়ে এখানে এসে মহাবিপদে পড়েছি। এক আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে আছি। পুলিশের ভয়ে কাজ খুঁজতেও পারছি না। প্রশাসন যদি জানতে পারে তাহলে আমাকে জেলে ভরবে।’ ১৯৯০ সালের পর থেকে শুধু মেক্সিকোর সীমান্ত এলাকায়ই ছয় হাজারের বেশি লাশ উদ্ধার করেছে মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এর মধ্যে কতজন বাংলাদেশি তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

দালালদের অন্য গ্রুপ অভিবাসীপ্রত্যাশীদের বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে নিয়ে যায় প্রথমে দুবাই, ইস্তাম্বুল অথবা তেহরানে। সেখান থেকে তাদের নেওয়া হয় ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া অথবা স্প্যানিশ গায়ানায়। এরপর ব্রাজিল-কলম্বিয়া-পানামা-কোস্টারিকা-নিকারাগুয়া-এলসালভাদর-গুয়াতেমালা হয়ে তাদের পৌঁছে দেওয়া হয় মেক্সিকোয়। পরে সুযোগ বুঝে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। একশ্রেণির দালাল ২ হাজার ৪০০ ডলারে জার্মানিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত প্রকাশ করে। এ প্রলোভনে পড়েই প্রধানত তুরস্ক হয়ে জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

এদিকে দেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ উপকূলীয় সাগর পথ দিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে মানব পাচারও বন্ধ হচ্ছে না। দালালদের নির্যাতন, আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়, ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করাসহ নানা নৃশংসতা চললেও থেমে নেই  মানব পাচার বাণিজ্য। থাই ও মালয় জঙ্গলের বন্দীশালা থেকে বন্দী বাংলাদেশিরা মুঠোফোনে তাদের ওপর পরিচালিত নানা বর্বরতার বর্ণনা দিয়ে ‘মুক্তিপণের টাকা’ পাঠানোর আকুতি জানাত। তাদের বক্তব্য বর্ণনা সূত্রেই অভিযোগ ওঠে, কক্সবাজার-উখিয়া-টেকনাফ উপকূলীয় সীমান্তের অর্ধশতাধিক মানব পাচারকারী চক্র স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনকে ম্যানেজ করে এ পাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

১০ বছরেই চার লাখ লোক পাচার : ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর স্বপ্নের হাতছানির লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে গত ১০ বছরে দেশ ছাড়া দেড় লক্ষাধিক বাংলাদেশির দুর্ভোগের শেষ নেই। বিভিন্ন দেশের জেলখানাতেও হাজারো বাংলাদেশি আটকে আছে বছরের পর বছর ধরে। অন্যদিকে একই সময়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড পাড়ি দিয়ে আরও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে অন্তত ৩ লাখ বাংলাদেশি।  এইভাবে মৃত্যু হাতে নিয়ে মানুষ ভাগ্য ফেরাতে অনিশ্চিত যাত্রা করছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগরে ট্রলারে করে পাড়ি জমাচ্ছে মালয়েশিয়ার পথে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমরাও পাড়ি জমাচ্ছে এই অনিশ্চিত মৃত্যু পথযাত্রায়। গত ছয় বছরে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তসহ ২৮টি পয়েন্ট হয়ে ৩ লক্ষাধিক মানুষ মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডের পথে পাড়ি জমিয়েছে। মানব পাচারবিরোধী নানা কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হেলপ কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক ও মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক এম এ কাশেম বলেন, শুধু উখিয়া থানা এলাকা থেকেই গত দুই বছরে ৫০ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় থানায় মামলার পাহাড় জমেছে। কিন্তু শাস্তি না হওয়ায় মানব পাচারকারীরা দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় তারা এই অবৈধ পাচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর