শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:৩৫

ইতিহাসের তোফায়েলের আজ জন্মদিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইতিহাসের তোফায়েলের আজ জন্মদিন

জন্মদিন পালন না করলেও বাঙালি জাতির ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি তোফায়েল আহমেদের আজ ৭৮তম জন্মদিন। ডাকসু ভিপি ও ’৬৯-এর গণআন্দোলনের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য তোফায়েল আহমেদের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। একজন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী এই নেতা মুক্তিযুদ্ধের বীর সংগঠকই নন, মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধানও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর খুনিরা তাঁকে শারীরিক নির্যাতনে আধমরা করেছে। বছরের পর বছর কারাদহন দিয়েছে। সামরিক শাসনামল থেকে বিএনপি ও জাময়াত জোট সরকারের প্রতিটি আমলেই তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে। শত শারীরিক-মানসিক নির্যাতন যেমন তাঁকে দমাতে পারেনি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকেও বিচ্যুত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কর্মী- এটাই তাঁর জীবনের বড় পরিচয় বলে তিনি আনন্দ অনুভব করেন।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও আলোকিত পার্লামেন্টারিয়ান ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সাগরবিধৌত ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে ইতিহাসের নায়ক তোফায়েল আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম ছিলেন এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৪ সালে ভোলা শহরের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের আলহাজ মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁরা এক কন্যাসন্তানের জনক-জননী। তাঁদের কন্যা তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী চিকিৎসক। জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিন খ্যাতনামা কার্ডিওলজিস্ট, বর্তমানে স্কয়ার হাসপাতালে কর্মরত। তাঁর বড় ভাই আলী আশরাফ ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর একটি ছেলে তাঁর মৃত্যুর ছয় মাস পর ১ জানুয়ারি, ’৭৬-এ জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পর থেকে তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী শিশু পুত্র মইনুল হোসেন বিপ্লবকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহে বড় করে তাঁদের সঙ্গে রাখেন। বিপ্লব বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমও একজন গণমুখী চরিত্রের দানশীল বিদুষী মহিলা। দুজনের দাম্পত্য জীবনও সুখের রোমান্টিক।

তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ’৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাস করেন যথাক্রমে ’৬২ ও ’৬৪ সালে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি করেন। কলেজ জীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন ’৬২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ’৬৪ সালে ইকবাল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ’৬৫-তে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি ও ১৯৬৬-৬৭-তে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

তোফায়েল আহমেদ ’৬৭ থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-প্রদত্ত ছয় দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ’৬৬-এর ৮ মে থেকে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র সব রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা বাংলায় তৃণমূল পর্যন্ত তুমুল গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দীকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর ’৬৯-এর ২৫ মার্চের মধ্যে তথাকথিত প্রবল পরাক্রমশালী লৌহমানব স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করে গৌরবের যে ইতিহাস সৃষ্টি করেন তা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল। ’৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ’৭০-এর জুনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও গণআন্দোলনে সফল নেতৃত্ব প্রদান করায় তিনি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেন। আবাসিক হল ও ডাকসুর ভিপি থাকাকালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সাহচর্যে আসেন। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা অতুলনীয়। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক এবং ’৭২-এ বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবৎকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া’য় তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন; দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১২ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। ’৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ’৭৩-এ নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ’৭৫-এ দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ’৭৫-এ দেশের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠিত হয়। বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ।

তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে সঙ্গী হন। ’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনের সফরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা এবং ১ মার্চ পাঁচ দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো গমন করেন। ’৭৩-এর ২৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট জোসেফ ব্রোজ টিটোর আমন্ত্রণে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড; যুগোসøাভিয়া থেকে ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়ায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান; ৬ সেপ্টেম্বর চতুর্থ জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স গমন; ১৭ অক্টোবর সাত দিনের সফরে জাপানের রাজধানী টোকিও সফর করেন। ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান; ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা ত্যাগ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন; ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে ইরাকের রাজধানী বাগদাদ পৌঁছান।

’৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরিন থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি সফলভাবে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের (বর্তমানে দলে ছয়জন সাংগঠনিক সম্পাদক দায়িত্বরত আছেন) দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, এই কালপর্বে দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে এ পদ অলংকৃত করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

’৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ’৭৩, ’৮৬, ’৯১, ’৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বমোট আটবার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ’৯১ ও ’৯৬-এর নির্বাচনে ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিন জোটের রূপরেখার ভিত্তিতে ’৯১-এর জাতীয় সংসদে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ পুনঃপ্রবর্তনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ’৯২-এ তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ’৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এ তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দুবার বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মিনিস্টারিয়েল কনফারেন্সে যথাক্রমে সিঙ্গাপুরে প্রথম, সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় দ্বিতীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে তৃতীয়, কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে চতুর্থ ও আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে পঞ্চমবারের মতো যোগদান করে স্বল্পোন্নত দেশের মুখপাত্র ও সমন্বয়কের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন এবং বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য উন্নত দেশগুলোয় শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের অঙ্গীকার আদায় করেন। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা এসক্যাপ ও ফাও-এর মিটিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে তাঁর জোরালো ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্বে স্বদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়ার আমলে তোফায়েল আহমেদের আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট করা হয়; হাই কোর্ট তাঁকে জামিন প্রদান করলেও স্বৈরশাসক তাঁকে মুক্তি দেয়নি। তখন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে দীর্ঘ ৩৩ মাসের বন্দীদশা থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন মেয়াদে চারবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ’৮২ সালের ২৪ জানুয়ারি সামরিক শাসন জারির পর ২৬ জানুয়ারি সাভারে গ্রেফতার করা হয়; ’৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে প্রথমে সামরিক গোয়েন্দা দফতরে, পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, তারপর সিলেট কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়; ’৮৪ সালে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও পরে কুমিল্লা কারাগারে আটক রাখা হয়; ’৮৭ সালে ভোলায় গ্রেফতার করে বরিশাল কারাগারে আটক রাখা হয়। ’৯৫-৯৬-এ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন হয়, তাতে খালেদা জিয়ার আমলে তিনি রাজশাহী কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ ছাড়া ২০০২-এ খালেদা-নিজামী জোট সরকারের শাসনামলে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থানায়, পরে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে ১২ দিন আটক রেখে সেখান থেকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। রাজনৈতিক জীবনে সর্বমোট সাতবার তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগার- ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, কুমিল্লা ও সিলেটে অন্তরিন ছিলেন। এর মধ্যে সর্বমোট তিনবার তাঁকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো স্বৈরশাসক তাঁকে কারাগারে আটক রাখতে পারেনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রীয় আদর্শ- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নে নিবেদিতপ্রাণ তোফায়েল আহমেদের মূলমন্ত্র- ‘অসত্যের কাছে কভু নত নহে শির, ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর’।

২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন তোফায়েল আহমেদ। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ২০১০-এ তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং সাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি ভোলা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সাবেক সদস্য, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপক সংগ্রাম ও বিস্তর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। আজও তিনি তাঁর সংগ্রামী জীবনে সততা, মেধা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও বাগ্মিতার ফলে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জনকল্যাণমূলক রাজনীতির অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন। ’৭৫-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে দল ও মতাদর্শ পরিবর্তনের চরিত্র অনেকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও তোফায়েল আহমেদ কখনই প্রলোভন ও হুমকির সামনে কোনো দিন মাথা নত করেননি। এমনকি ১/১১-এর পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে স্ত্রী-কন্যাসহ মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছেন। কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। জেল-জুলুম-হুলিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান অলঙ্কার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, সমগ্র বিশ্বেই বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক হিসেবে তিনি পরিচিত। জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ও সংসদীয় গণতন্ত্র অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একই আদর্শে ও দলে ধারাবাহিকভাবে থেকে ‘রাজনৈতিক ইন্টিগ্রিটি’ বজায় রাখার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী তোফায়েল আহমেদের মাতৃভক্তি নজিরবিহীন। ভোলার বাংলাবাজারে তাঁর মায়ের নামে স্থাপন করেছেন ‘ফাতেমা খানম কমপ্লেক্স’। সেখানে স্থাপিত হয়েছে ফাতেমা খানম গার্লস হাইস্কুল; ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজ; ফাতেমা খানম মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র; ফাতেমা খানম শিশু পরিবার; ফাতেমা খানম জামে মসজিদ; ফাতেমা খানম বৃদ্ধাশ্রম। এখন কাজ চলছে আজহার-ফাতেমা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের। যে কারও বিপদেও তিনি পাশে দাঁড়ান হৃদয় দিয়ে। বাইরে কঠোর ভিতরে কোমল চরিত্রের এ নেতা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নবীন প্রজন্মের কাছে সমুন্নত রাখতে এ কমপ্লেক্সে তিনি আরও প্রতিষ্ঠা করেছেন দৃষ্টিনন্দন ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’। তিনি ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ ইয়েমেন, ইরাক, মিসর, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, কাতারসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সফর করেছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর