শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:১৬

অপ্রতিরোধ্য হুন্ডি চক্র

► বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার ► ৩০০ মামলা সিআইডিতে তালিকা হলেও থেমে গেছে অনুসন্ধান ► রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে বিচারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

মির্জা মেহেদী তমাল ও সাখাওয়াত কাওসার

অপ্রতিরোধ্য হুন্ডি চক্র

গোল্ড মনির। স্বর্ণ পাচার, রাজউকে জালিয়াতি, দলিল জাল করে জমি বিক্রয় ও অ্যালকোহলের ব্যবসা থেকে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হন তিনি। দেশে ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রেখেছেন তিনি। বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন হুন্ডির মাধ্যমে। পুলিশের জেরায় গোল্ড মনির স্বীকার করেছেন হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের নানা তথ্য।

দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাসিবুজ্জামান (ছদ্মনাম)। সম্প্রতি তিনি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ সুবিধা নিয়েছেন। এ সুবিধা পেতে মালয়েশিয়ার ব্যাংকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা মূল্যমানের রিঙ্গিত জমা রেখেছেন। এ ছাড়া নিয়ে গেছেন সারা জীবনের অর্জিত সব অর্থসম্পদ। আর এই পুরো টাকাটাই তিনি বের করে নিয়ে গেছেন হুন্ডির মাধ্যমে। হাসিবুজ্জামানের মতো শুধু মালয়েশিয়াতেই টাকা পাচারের মাধ্যমে এভাবে প্রায় ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন। সেসব দেশে হুন্ডির মাধ্যমে পাচারের টাকায় তারা বিলাসী-জীবন যাপন করছেন। গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অনেকেই আবার পুরো পরিবারকে মাইগ্রেন্ট করেছেন। আবদুস সাত্তার (ছন্দনাম) পুলিশের অপরাধী তালিকায় তার নাম দেখানো হয়েছে রাকিব। তিনি এক সময় বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স আইটেমের ব্যবসা করতেন। এখন তিনি দুবাইয়ের নামিদামি শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। দুবাই থেকে আমদানি করা পণ্যের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির ও ওভারইনভয়েসের মাধ্যমে পাচার করেছেন। ২০০৯ সালে সেনা সমর্থিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুবাইয়ে পাড়ি জমান। এখন তিনি সেখানেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। মালিক হয়েছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরও।

এভাবে নানা পথে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির সময়েও থেমে নেই হুন্ডি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। কোনোভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না এই চক্রের সদস্যদের। আমদানি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালেই সক্রিয় তারা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি দেশের ২০০ জন হুন্ডি ব্যবসায়ীর ওপর কাজ শুরু করলেও তা মাঝপথে থেমে গেছে। হুন্ডির ২০০ ব্যবসায়ীর ওই তালিকায় ছিলেন ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে ৩০০টি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত চলছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে, প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বলে একাধিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর রহস্যজনক নীরবতার কারণেই বিভিন্ন কৌশলে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অংকের অর্থ। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দেশদ্রোহী বলে অভিহিত করেছেন তারা। বলছেন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আইনে তাদের বিচার হওয়া উচিত।

সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মাসুদুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্থ পাচার নিয়ে আমরা কাজ করছি। মানি লন্ডারিংয়ের তিন শ’র মতো মামলা আমাদের কাছে রয়েছে। প্রতিটি মামলাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা অর্থে ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া বিদেশ থেকে হুন্ডি হয়ে আসছে রেমিট্যান্সের বিপুল পরিমাণ অর্থ। একইভাবে রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অর্থ বৈধপথে রেমিট্যান্স হিসেবে এলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হতো। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার অভাব থাকায় হুন্ডির মাত্রা কমানো যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা কার্যকর করায় কয়েক মাসে রেমিট্যান্সের গতি বেড়েছে। এটাকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে আরও রেকর্ড সৃষ্টি হতো বলে মনে করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, অর্থ পাচার রুখতে আইনের সংশোধন প্রয়োজন। প্রয়োজনে মৃত্যুদ-ের বিধান করতে হবে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম এখন হুন্ডি। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিদেশে অর্থ পাচার করে বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন, কারখানা গড়ছেন। ব্যবসায়ীরা দেদার অর্থ পাচার করছেন আমদানি-রপ্তানির আড়ালে; আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে আর রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়ে। এজেন্টের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আত্মীয়স্বজনের ঠিকানায় হুন্ডির টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইনটিগ্রেটি (জিএফআই) বলছে, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে হুন্ডিচক্র এতটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে, ব্যাংকিং বা অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই তারা গ্রাহকের ঠিকানায় টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে হুন্ডি টাকা পাচারের একটি ভয়ঙ্কর মাধ্যম। কেননা আমদানি বা রপ্তানির মাধ্যমে টাকা পাচার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়। এর ফলে অপরাধীর পরিচয় একসময় পাওয়া যায়। কিন্তু হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার করা হলে পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরে খরচ কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। শুধু বাংলাদেশ থেকে টাকা যায় না, টাকা আসেও হুন্ডির মাধ্যমে। বৈধপথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরাও হুন্ডির আশ্রয় নিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে এবং বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে।

বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও থাইল্যান্ডে। এর বাইরে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নিয়ে অনেক দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। সরকারের একাধিক সংস্থা এ নিয়ে তদন্তও করেছে। হুন্ডি সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। তারা মনে করে, হুন্ডির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পাচারের সিন্ডিকেট বন্ধ করা গেলে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর