ইরানের জ্বালানি তেল বাণিজ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে (৩০ দিনের জন্য) শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে চলমান অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্য দিয়ে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের পূর্ববর্তী নীতি থেকে সরে এলো ওয়াশিংটন। ফলে বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকা জ্বালানি তেল রফতানিতে আপাতত কোনো বাধা থাকছে না ইরানের সামনে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম ক্রমেই আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় ট্রাম্প প্রশাসনকে বেশ কঠিন পরিস্থিতি পার করতে হচ্ছে। তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পর এমন সিদ্ধান্ত নিতে এক প্রকার বাধ্য হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের খবরেও বিশ্ববাজারে দাম কমেনি জ্বালানি তেলের।
চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। সর্বশেষ গত শুক্রবার সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিনে ফিউচার মার্কেটে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পৌঁছে যায় ১১২ ডলারে।
স্পট মার্কেটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় ছিল গতকালও। অয়েলপ্রাইসডটকমের গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে সরবরাহ মারবান ক্রুডের সর্বশেষ মূল্য ছিল ১৪৬ ডলার ৪০ সেন্ট। আর আরব লাইট বেঞ্চমার্ক ক্রুডের সর্বশেষ মূল্য ছিল ১২৭ ডলার ৫ সেন্ট।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহ শেষ হতে না হতেই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন প্রশাসনের হাতে কার্যকর বিকল্প প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। জ্বালানি পণ্যের বাজারমূল্যে অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে মার্কিন অর্থনীতিতেও। বাজারে যেখান থেকে যেভাবে সম্ভব জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা। আর কোনো বিকল্প না থাকায় শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মধ্য দিয়ে হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ বেছে নিতে হয়েছে মরিয়া ট্রাম্প প্রশাসনকে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুদ (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) থেকে কয়েকশ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া রুশ জ্বালানি তেলের ওপর আগে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য খুব একটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বরং ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১২ ডলারে উঠেছে, যা সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। দেশটিতে গ্যাসোলিনের দামও বেড়ে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে।
ইরানের জ্বালানি তেল রফতানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর অবস্থানে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে একই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এ থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এ মুহূর্তে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে আছে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, এর মধ্য দিয়ে ইরানের কৌশল ব্যর্থ করেছেন তারা। নিষেধাজ্ঞার কারণে এ জ্বালানি তেল কিনে নিত শুধু চীন। কিন্তু বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে এর গন্তব্য বদলে দিচ্ছেন তারা। ইরানের কাছ থেকে ভারতের মতো কোনো মিত্র দেশ থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর পক্ষে এখন এ জ্বালানি তেল কিনে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তা সরবরাহ সংকটকেও কিছুটা প্রশমিত করবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান যেভাবেই হোক এ তেল বিক্রি করত। এখন আমরা শুধু ক্রেতা বদলে দিচ্ছি।’
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও দাবি করছেন, ‘এটি ইরানের কৌশল ব্যর্থ করে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনার একটি উপায়।’
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজের ভাষ্যমতে, ‘এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সাময়িক। এর মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানি মূল্যের অস্বাভাবিক উত্থানকে ঠেকানো।’
যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্যোগ জ্বালানি তেলের বাজারে বিদ্যমান সংকট কাটাতে স্বল্পমেয়াদেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে ইরানের ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। এ পরিমাণ জ্বালানি তেল বিশ্বব্যাপী মাত্র দেড় দিনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এ সরবরাহ দ্রুত শেষ হয়ে এরপর আবার বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
এ অবস্থায় ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরও শিথিলের জোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু।
তিনি বলেন, ‘এ জ্বালানি তেল দ্রুত বিক্রি হয়ে যাবে। তারপর স্বাভাবিকভাবে ইরানি জ্বালানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আবারও প্রশ্ন উঠবে।’
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, আল-জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ