শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০৮:২৬
প্রিন্ট করুন printer

রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস

ড. ইকবাল কবীর মোহন

রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কোনো বিধানই লক্ষ্যহীন নয়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি ও বিধানের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। মাহে রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও বিধান। এটিকে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য ফরজ করেছেন। এই বিধানের অন্যতম লক্ষ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতির গুণ অর্জন করা। কোরআনে সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান দেওয়া হয়েছিল পূর্ববর্তীদের, যাতে তোমরা মুত্তাকি (তাকওয়াসম্পন্ন) হতে পারো।’

এই তাকওয়ার গুণ বা আল্লাহভীতি কোনো মানুষেরর মনে জাগরূক থাকার অর্থ হচ্ছে, সে কোনো কাজই আল্লাহর বিধানের বাইরে করতে পারবে না। যখনই কোনো অন্যায় বা খারাপ কাজ কেউ করতে যাবে, তখন আল্লাহর ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। ফলে সে অন্যায় ও অসত্য কাজের ধারেকাছেও যেতে পারবে না। ফলে তাকওয়া হাসিলের মাধ্যমে মানুষ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে সক্ষম হবে।

তাকওয়া আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো পরহেজগারি বা আল্লাহভীতি। তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ হলো ভয় করা, বিরত থাকা, সংযত ও সতর্ক হওয়া, বেঁচে থাকা, পরহেজ করা, বর্জন করা, আত্মশুদ্ধি, দায়িত্বশীল হওয়া, যেকোনো অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি। সুতরাং তাকওয়া বলতে ভয় বা ভীতি বোঝালেও এর অর্থ আরো ব্যাপক। কোরআনে তাকওয়া শব্দটি বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার করা হয়েছে। বাঁচা বা নিষ্কৃতি অর্থে তাকওয়ার প্রয়োগ আমরা পাই সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতে। এখানে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করো এবং দোজখের আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও।’

একজন মুমিনের মনে যখন আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়, তখনই সে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য এই আকুতি করতে পারে। অনুরূপভাবে সুরা তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের এবং পরিবার-পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও।’

তাকওয়ার পরিচয় দিতে গিয়ে উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর কাছে তাকওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি কী কণ্টকাকীর্ণ পথে চলেন? তিনি জবাবে বলেন, হ্যাঁ। উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, ‘তখন আপনি কিভাবে চলেন? তিনি বলেন, খুব সতর্কতার সঙ্গে কাঁটার আঁচড় থেকে শরীর ও কাপড় বাঁচিয়ে চলি। উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, এটাই তাকওয়া।’

তাকওয়া মানেই হলো অত্যন্ত সতর্কভাবে জীবন যাপন করা, যাতে গুনাহর কালিমা এবং ইবাদতে অনিষ্ট যুক্ত হতে না পারে। একটা পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র জীবনযাপনের জন্য প্রতিটি কাজে এমনভাবে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোকে সম্পন্ন হয়। ইমাম গাজালি (রহ.)-এর মতে, আল্লাহকে ভয় করে যাবতীয় মন্দ ও খারাপ কাজ বর্জন করে যাবতীয় ভালো ও উত্তম কাজকে নিজের জীবনে গ্রহণ করার নামই তাকওয়া।’

তাকওয়ার জীবন পরিশুদ্ধ জীবন ও সফলতার জীবন। তাকওয়ার গুণ অর্জন ছাড়া দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার আর কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কোরআন ও নবীজির অনেক হাদিসে তাকওয়ার নীতি অবলম্বনের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করো এবং আত্মসমর্পণকারী না হয়ে কোনো অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ কোরো না।’

সুরা হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো।’ সুরা তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের সব জটিলতা থেকে মুক্তিলাভের উপায় বের করে দেন এবং তাদের জন্য এমন পদ্ধতিতে জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করে দেন, তারা যা কল্পনাও করেনি।’

সুরা সোয়াদের ৫১ থেকে ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মুত্তাকিদের বা আল্লাহভীরু লোকদের পরিণাম সম্পর্কে সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহভীরু লোকদের জন্য মহান আল্লাহ মুক্তির পথ বাতলে দেন। আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুত্তাকি লোকদের জন্য আছে অতি উত্তম আবাস চিরস্থায়ী জান্নাত। সদা উন্মুক্ত তাদের জন্য এর তোরণসমূহ। সেখানে তারা সমাসীন থাকবে হেলান দিয়ে। তারা আদেশ দেবে বহুবিধ ফলমূল ও পানীয় দ্রব্যের জন্য। তাদের পাশে থাকবে আনতনয়না সমবয়সের তরুণী। এটাই হিসাব দিবসের জন্য তোমাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং এটাই আমার দেওয়া রিজিক, যা নিঃশেষ হবে না।’

মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহ কোরআনের আরো অনেক আয়াতে সুসংবাদ জানিয়েছেন। মুত্তাকিরা মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাবে। সুরা কামারের ৫৪ ও ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মুত্তাকি বান্দাগণ অবস্থান করবে স্রোতস্বিনীবিধৌত জান্নাতে। অবস্থান করবে তারা তাদের যথাযোগ্য আসনে। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর অতি সান্নিধ্যে।’

তাকওয়ার অধিকারী মুমিন বান্দা সম্পর্কে মহানবী (সা.)ও অনেক সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বেশি নিকটতম এবং সবচেয়ে বেশি প্রিয় ব্যক্তি হলো সে, যার মধ্যে তাকওয়ার পরিমাণ বেশি।’

আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য লাভ এবং আখিরাতের জীবনে তাঁর ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার অন্যতম উপায় হলো তাকওয়া। আর এই তাকওয়া অর্জনের জন্যই রোজার বিধান ঘোষণা করেছেন আল্লাহ তাআলা। আমরা মাহে রমজানের রোজাসমূহ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অবলম্বন হিসেবে যথাযথভাবে পালন করব। এর মাধ্যমে আমরা যে তাকওয়ার গুণ অর্জন করব, তা আমাদের জীবন চলার পথকে সহজ করবে এবং আমাদের সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে, ইনশাআল্লাহ।

বিডি-প্রতিদিন/ সালাহ উদ্দীন