শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৪৭

পরিবর্তনের ঢেউ না মমতাই থাকছেন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

Google News

টানটান উত্তেজনার মধ্যে শেষ হলো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট। এই দফায় পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ৩০টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। তবে সবার নজর ছিল একটি মাত্র আসনে- নন্দীগ্রাম। এখানে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মমতা ব্যানার্জি, তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। ছিলেন সিপিআইএম সমর্থিত সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী মীনাক্ষি মুখার্জিও। নির্বাচন কমিশনের মতে নন্দীগ্রামের মতো হাইপ্রোফাইল কেন্দ্রের প্রতিটি বুথই স্পর্শকাতর- তাই ভোট শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করতে কমিশনের তরফে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র জুড়েই জারি করা ছিল ১৪৪ ধারা। যদিও তার মধ্যেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে। কপালে তিলক কেটে, গলায় গেরুয়া উত্তরীয় চাপিয়ে ভোটের দিন সকালেই নন্দীগ্রামের নন্দনায়েক বাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে গিয়ে ভোট দেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ভোট দিয়ে বাইরে বেরিয়েই আঙুলে বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘পরিবর্তনের              পক্ষে ভোট হচ্ছে। উন্নয়নই জিতবে, তোষণের রাজনীতির পরাজয় হবে।’ তার প্রতিপক্ষ মমতা ব্যানার্জিকে কটাক্ষ করে শুভেন্দুকে বলতে শোনা যায়, ‘আন্টি কো থোড়া শান্ত রাখ না চাহিয়ে (মাসির এখন কিছুটা শান্ত থাকা উচিত)।’ কিন্তু দুপুরে হঠাৎ করেই নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে ভোটদানে বাধা, ভয় দেখানো, ছাপ্পা ভোটসহ কিছু অভিযোগ ওঠার পরই ওই সব বুথ পরিদর্শনের জন্য রেয়াপাড়ার ভাড়া বাড়ি থেকে বের হন মমতা। বেলা পৌনে ২টা নাগাদ ৭ নম্বর বুথে যান মমতা ব্যানার্জি। অভিযোগ ওই বুথে তৃণমূলের পোলিং এজেন্টকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। এরপর হুইলচেয়ারে বসেই নজরদারি চালাতে থাকেন তিনি। এরই মধ্যে মমতাকে ঘিরে ‘জয় শ্রীরাম’ বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা স্লোগান দিতে থাকেন বলে অভিযোগ। তৃণমূলের তরফে পাল্টা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে কার্যত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বুথের ভিতরই প্রায় দেড় ঘণ্টার বেশি সময় আটকে পড়েন মমতা। সেখান থেকেই রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়কে ফোন করে মমতা বলেন, ওরা সকাল থেকে কাউকে ভোট দিতে দেয়নি। রাজ্যপাল পদক্ষেপ নেওয়ায় কমিশনের নির্দেশে বয়ালে যান বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক নগেন্দ্র ত্রিপাঠীসহ বিশাল বাহিনী। এরপর কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহায়তায় বয়ালের ওই বুথ থেকে মমতাকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর সাংবাদিকদের সামনে শুভেন্দুকে নিশানা করে মমতা বলেন, ‘এই ভোটে বিজেপির যিনি প্রার্থী হয়েছেন তিনি গতকাল রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গুন্ডামি, তান্ডব করেছেন। কমিশনে আমরা ৬৩টি অভিযোগ জানিয়েছি। আমি নন্দীগ্রাম নিয়ে চিন্তিত নই, আমার চিন্তা গণতন্ত্র নিয়ে। নন্দীগ্রামে মা-মাটি-মানুষের আশীর্বাদে আমিই জিতব। এরপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তোপ দেগে মমতা বলেন, ‘আমি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দোষ দেব না। কারণ তারা আমাদের বন্ধু। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই বিজেপিকে সহায়তা করার জন্য জওয়ানদের নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে যারা আছেন তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বহিরাগত। তারা বাংলাও বলতে পারেন না।’ নির্বাচন কমিশনের নীরব ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মমতা। তিনি বলেন, আপনারা যতই চেষ্টা করুন না কেন, বিজেপি নির্বাচনে জিততে পারবে না। এমনকি নন্দীগ্রামে তৃণমূল কংগ্রেস ৯০ শতাংশ ভোট পাবে।’ মমতা বেরিয়ে যাওয়ার পরই বয়ালে যান শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুভেন্দুময় ছিল গোটা নন্দীগ্রাম। মমতা দিদি হেরে গেছেন। উনি মানুষের সমর্থন হারিয়েছেন।’ শুভেন্দু আরও জানান, ‘বয়ালের বুথে গিয়ে তিনি ভোটারদের অপমান করেছেন। নন্দীগ্রামের মানুষকে অপমান করা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে।’ এদিকে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় ভোটের উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার জয়নগরের সভা থেকে মমতাকে নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন এখনো পর্যন্ত ভোটদানের গতি প্রকৃতিতে স্পষ্ট, বাংলার হয়ে কাজ করে দিচ্ছে নন্দীগ্রাম। আমি আসল পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। চারদিকে কেবল বিজেপিই দেখছি। এবার বাংলায় বিজেপি ২০০ আসন ছাড়িয়ে যাবে।’ তবে নন্দীগ্রাম ছাড়াও এদিন সকাল থেকেই একাধিক বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে। নির্বাচনের দ্বিতীয় দফাতেও ইভিএম ও ভিভিপ্যাট বিভ্রাট নিয়ে কিছু জায়গা থেকে অভিযোগ আসে। কেশপুরের মহিষদাল এলাকায় বিজেপির মহিলা এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বাঁকুড়ার কোতুলপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ইসমাইল চক ধান্যঘোরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে বিজেপির নির্বাচনী এজেন্টকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে নির্বাচন শুরুর মুখেই দুটি মৃত্যুকে ঘিরে সরগরম হয়ে ওঠে রাজ্যের রাজনীতি। গতকাল সকালে দ্বিতীয় দফার ভোট শুরুর আগেই বুধবার রাতে মেদিনীপুর জেলার কেশপুরে এক তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু হয়। ৪০ বছর বয়সী উত্তম দলুই নামে ওই তৃণমূল কর্মীর বাড়ি কেশপুরের ৪ নম্বর অঞ্চলের হরিহরচক এলাকায়। তৃণমূলের দাবি-বুধবার রাতে তিনি নিজের বাড়িতে বসে যখন খাবার খাচ্ছিলেন, তখন অতর্কিতভাবে বিজেপির লোকজন তার ওপর হামলা চালান। ছুরি নিয়ে পেট ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বাখুয়াবাড় গ্রামের ২৮ নম্বর বুথের বাসিন্দা স্থানীয় বিজেপি কর্মী উদয়শংকর দোবের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের দাবি তৃণমূলের হুমকির ভয়ে উদয়শঙ্কর আত্মহত্যা করেছেন।

এই দফায় বাংলায় মোট ভোটার ছিল ৭৫,৯৪,৫৪৯ জন। ৩০টি কেন্দ্রে ১৭১ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হলো। গত ২৭ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে প্রথম দফার ভোট গ্রহণ হয়। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে মোট আট দফায় ভোট নেওয়া হবে।