শিরোনাম
প্রকাশ : ১ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৭:০৭
প্রিন্ট করুন printer

স্কুলবয়সী ১৩০ কোটি শিশুর বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই

অনলাইন ডেস্ক

স্কুলবয়সী ১৩০ কোটি শিশুর বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই
প্রতীকী ছবি

বিশ্বব্যাপী স্কুলবয়সী শিশুদের ২ তৃতীয়াংশ বা ৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৩০ কোটি শিশুর বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। একই অবস্থা ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদেরও। ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী এ তথ্য জানা গেছে। 

‘কত সংখ্যক শিশু ও তরুণের ঘরে ইন্টারনেট সুবিধা আছে?’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনের তথ্য আজ মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) ইউনিসেফের ঢাকা অফিস থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণ জনগোষ্ঠীর ৬৩ শতাংশ বা ৭৫ কোটি ৯০ লাখ তরুণ-তরুণীর ঘরে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। 

২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা মাল্টি ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬২ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। একইসঙ্গে একটি জাতীয় গড় ও পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য আছে।  

বাংলাদেশে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, যেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ। দূরশিক্ষণের আরেকটি প্রধান মাধ্যম টেলিভিশনের বেলায় জাতীয়ভাবে ৫১ শতাংশ পরিবার টেলিভিশনের মালিক। একইসঙ্গে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ টেলিভিশনের মালিক, যেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে এই হার ৯০ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি বলেন, দূরশিক্ষণের এই মাধ্যমগুলো ব্যবহারের সুযোগ না পাওয়া শিশুরা ডিজিটাল বিভাজন ও বৈষম্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মহামারি চলাকালীন তারা শিক্ষা গ্রহণের কম সুযোগ পেয়েছে, যা তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ এলোমেলো করে দিয়েছে। এই বিভাজন আগে থেকে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।  

কোভিড-১৯ এর কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইন্টারনেট ও টেলিভিশন ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকরভাবে এই শিশুদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এমনকী মহামারির আগেও একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার জন্য তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি ক্রমবর্ধমান অংশের ভিত্তিগত, স্থানান্তরযোগ্য, ডিজিটাল, চাকরিকেন্দ্রিক এবং উদ্যোগী দক্ষতা শেখার প্রয়োজন হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজিটাল বিভাজন বৈষম্য দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিচ্ছে, যা ইতোমধ্যে দেশ ও কমিউনিটিগুলোকে বিভক্ত করে ফেলেছে। দরিদ্রতম পরিবার, গ্রামাঞ্চল ও স্বল্প আয়ের পরিবারের শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের সমবয়সী বা সহপাঠীদের চেয়ে আরও পিছিয়ে পড়ছে এবং পুনরায় সহপাঠীদের সঙ্গে একই কাতারে পৌঁছানোর সুযোগও তাদের খুব কম।

বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ধনী পরিবারের স্কুলবয়সী শিশুদের মধ্যে ৫৮ শতাংশের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে, যেখানে সবেচেয়ে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আয়ের ভিত্তিতে একই ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্কুলবয়সী প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে একজনেরও কম শিশুর বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে, যেখানে উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে প্রতি ১০ জন শিশুর ৯ জনের বাড়িতেই ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।

দেশ এবং অঞ্চলজুড়ে ভৌগোলিক বৈষম্যও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী, শহরাঞ্চলে স্কুলবয়সী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই, যেখানে গ্রামে থাকা পরিবারগুলোর স্কুলবয়সী শিশুদের প্রায় তিন চতুর্থাংশ এ সুবিধা পায় না। সাব-সাহারা আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার স্কুলবয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যেখানে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে।

গত বছর ইউনিসেফ ও আইটিইউ প্রতিটি স্কুল ও তার আশপাশের কমিউনিটিকে ইন্টারনেটে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘গিগা’ চালু করে। সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ‘গিগা’ এরইমধ্যে ৩০টি দেশে ৮ লাখেরও বেশি স্কুলের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই তথ্য নিয়ে ‘গিগা’ ডিজিটাল শিক্ষা সমাধান ও অন্য সেবা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগের অবকাঠামো তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি মিশ্রিত বিনিয়োগের জন্য বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে সরকার, শিল্পখাত, বেসামরিক খাত এবং ব্যক্তিগত খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।

এই উদ্যোগ এখন 'জেনারেশন আনলিমিটেডের' সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে 'রিইমাজিন এডুকেশন' উদ্যোগের অধীনে চলছে। 'রিইমাজিন এডুকেশন' উদ্যোগের মাধ্যমে ইউনিসেফের লক্ষ্য হচ্ছে- শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানসম্পন্ন ডিজিটাল শিক্ষা গ্রহণের সমান সুযোগ প্রদান করে শিক্ষার সংকট মোকাবিলা করা এবং শিক্ষাকে রূপান্তর করা। আর এটি অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো সর্বজনীন ইন্টারনেট সংযোগ।

এই প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাদের ডিজিটাল দুনিয়ায় সম্পৃক্ত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তরুণদের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে 'জেনারেশন কানেক্ট' নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছে আইটিইউ।

ইউনিসেফ-আইটিইউর প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যাগুলো উদ্বেগজনক চিত্রই তুলে ধরে এবং সহজলভ্যতা, নিরাপত্তা এবং নিম্ন পর্যায়ের ডিজিটাল দক্ষতার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আইটিইউর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, নিম্ন পর্যায়ের ডিজিটাল দক্ষতা ডিজিটাল সমাজে অর্থবহ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি যেখানে ক্রয়ক্ষমতায় ব্যাপক বৈষম্যের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেকের কাছে মোবাইল টেলিফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার বেশ ব্যয়বহুল হিসেবেই রয়ে গেছে।

এমনকি শিশুদের ঘরে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও তারা গৃহস্থালি কাজ বা ঘরের নানা কাজের চাপের কারণে, পরিবারে পর্যাপ্ত ডিভাইস না থাকার কারণে, মেয়েদের ক্ষেত্রে কম বা একেবারেই ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি না থাকার কারণে অথবা অনলাইনে সুযোগগুলো কীভাবে কাজে লাগাতে হয় সে সম্পর্কি সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায় না। এ ছাড়া অনলাইনে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে, কেননা সন্তানদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে বাবা-মায়েদের যথাযথ প্রস্তুতি নাও থাকতে পারে।

বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ আহমেদ

  


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর