৫ নভেম্বর, ২০২১ ১৩:১৫

অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি: অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী

বেআইনী পথে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার সময় বাংলাদেশিসহ ১৮ হাজার বিদেশীর মৃত্যু

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি: অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী

অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্রের বহুল বিতর্কিত অভিবাসন ব্যবস্থার ভিকটিম হয়ে ১৯৯৪ সাল থেকে কমপক্ষে ১৮ হাজার বিদেশীর প্রাণ গেছে মেক্সিকো হয়ে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় প্রবেশকালে। এরমধ্যে বেশ কয়েক ডজন বাংলাদেশিও রয়েছে। এ তথ্য ইউএস বর্ডার প্যাট্রল-এর পক্ষ থেকে সরাসরি স্বীকার করা না হলেও মানবাধিকার কর্মীরা নিশ্চিত করেছেন। এই সংখ্যা আরো বেশি হবে যদি প্রকৃত অর্থে কোন অনুসন্ধান চালানো হয়। 

কারণ, বিপুল অর্থের বিনিময়ে আদম পাচারকারিরা যখন মক্কেলদের ঠেলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের পথে, সে সময় অনেকেই সাপের কামড় অথবা হিংস্র প্রাণীর কবলে পড়েন কিংবা সাঁতরে পাড় হবার সময় কেউ কেউ ভেসে যান পানির স্রোতে, আবার অনেকে খাবার না পেয়েও প্রকৃতির কাছে নিজকে সঁপে দেন। 

বছর দশেক আগে অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত কয়েকটি সংস্থার প্রতিনিধিরা মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বরাবরে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তারা আশপাশের হাসপাতাল, মর্গ পর্যবেক্ষণ করেছেন। সে সময়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল সীমান্তে অসহায় মৃত্যুর চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ন্যূনতম দায়িত্ব নেয়া হয়নি সে সব মৃত্যুর। কারণ, সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বিচার প্রার্থী হয়নি কিংবা নাম-পরিচয় উল্লেখ করে অভিযোগও করেননি। এমনকি সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে কিংবা ধাওয়া খেয়ে মৃত্যুবরণকারিদের লাশ কর্মকর্তারা উদ্ধার করলেও সেগুলোর অধিকাংশই ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। অজ্ঞাত হিসেবে পুড়ে ফেলার অপেক্ষায় থাকা লাশের মধ্য থেকে গত ৩ বছরে ৭ বাংলাদেশিকে শনাক্ত করেছিলেন ড্রাম (দেশীজ রাইজিং আপ এ্যান্ড মুভিং) এর অর্গানাইজার কাজী ফৌজিয়া। 

ফৌজিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, নোয়াখালীর রামচন্দ্রপুরের কাজী আজিজুল হকের লাশও শনাক্ত করেছিলাম। কিন্তু তার মা-ভাইয়েরা লাশ নিতে রাজি না হওয়ায় আমরা মর্গ থেকে এনে দাফনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হইনি। তবে টেক্সাস, আরিজোনা, ওরেগণ এবং ওয়াশিংটন স্টেট বরাবর মেক্সিকো সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময়ে মারা যাওয়া অনেকের লাশের হদিস সীমান্তরক্ষীরাও পান না। কারণ সেগুলো পানির স্রোতে ভেসে যায় অথবা গভীর জঙ্গলে হিংস্র প্রাণীর খোরাক হয়। এমন অমানবিক অবস্থার অবসানে বাইডেন প্রশাসনও নির্বিকার থাকবে কিনা তা সময়েই বলে দেবে। 

সেপ্টেম্বরে সমাপ্ত গত অর্থ বছরে ক্যালিফোর্নিয়া-আরিজোনা-টেক্সাস সীমান্ত এলাকায় ৫৫৭ জনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছে সীমান্ত রক্ষী কর্তৃপক্ষ। আগের অর্থ বছরে সে সংখ্যা ছিল ২৫৪। তারও আগের অর্থ বছরে ছিল ৩০০ জন। সংস্থাটি ১৯৯৮ সাল থেকেই বেআইনী পথে সীমান্ত অতিক্রমের সময় মৃত্যুর সংবাদ নথিভুক্ত করছে। 

সীমান্ত রক্ষী কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, মৃত্যুবরণকারিদের অধিকাংশই প্রচণ্ড গরমের শিকার হয়েছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য/পানীয় না পাওয়া এবং ঝুঁকি নিয়ে শতশত মাইল অতিক্রমকালে তারা মৃত্যুর শিকার হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর হার বাড়ার কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশসমূহ থেকে বেআইনী পথে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়ার প্রবণতা অকল্পনীয়ভাবে বেড়েছে। তারা মনে করছে যে, কোনমতে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে ঢুকতে পারলেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া যাবে। 

এ প্রসঙ্গে অভিবাসন বিষয়ক খ্যাতনামা আইনজীবী ও ডেমক্র্যাটিক পার্টির নেতা অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, এমন মৃত্যুকে কখনোই মেনে নেয়া যায় না। তবুও মানুষ আসতে চাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিদ্যমান অভিবাসন আইন সংস্কার না করলে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। 

অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী আরও বলেন, আমার বেশ কিছু মক্কেল বাংলাদেশ থেকে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। দালালকে মোটা অর্থ দিতে হয়েছে এজন্যে। তারা আমাকে জানিয়েছেন দীর্ঘ এই পথের অসহনীয় যন্ত্রণার কথা। ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা করে একেকজন দিয়েছেন দালালকে। এরমধ্যে যাদের ভাগ্য ভালো তারা যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে সক্ষম হয়েছেন এবং এসাইলাম প্রার্থনা করেছেন। অনেকের এসাইলাম ডিটেনশন সেন্টারে অবস্থানকালেই না মঞ্জুর হওয়ায় তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর যাদের এসাইলামের আবেদন পেন্ডিং রয়েছে, তারা প্যারলে মুক্তি লাভ করেছেন এবং গ্রীণকার্ডের আশায় রয়েছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তারা গ্রীণকার্ড পেলেও দালালকে দেয়া বিপুল অর্থ আদৌ সঞ্চয়ে সক্ষম হবেন বলে আমার মনে হয় না। অর্থাৎ স্বপ্নের দেশে যাত্রার সময়ে পরিবারের সকলকে রঙিন স্বপ্নেন ভাসিয়ে পৈত্রিক ভিটেমাটি বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেলেও হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না বাকিটা জীবনে। তাই আমরা সবসময় দলীয় ফোরামে সচেষ্ট রয়েছি অভিবাসনের ভঙ্গুর অবস্থা ঢেলে সাজাতে। তাহলেও হয়তো দলে দলে বেআইনী পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রবণতা কমবে।

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের আগ্রহে কংগ্রেসে ঝুলে থাকা অভিবাসন সংস্কার বিল যদি শেষ পর্যন্ত পাশ হয় তাহলে সে সুবিধা পাবেন যারা গত ১ জানুয়ারির আগে কাগজপত্রহীন ছিলেন। তাই এরপরে যারা ঢুকছেন তাদের ভাগ্য কোনভাবেই (বিলটি সংশোধিত না হলে) প্রসন্ন হবে না। 

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর