শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:৪৮

কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনীতি ও সুশাসন

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনীতি ও সুশাসন

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে পারি না। আর এসব ক্ষেত্রে জবাবদিহির প্রকট অভাব বিরাজ করছে দীর্ঘদিন থেকেই। এর পরও কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া অনেকটাই দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে। এর কারণ হলো মানুষ জীবন ও জীবিকার বিতর্কে জীবিকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। একইভাবে দেশের কৃষি খাত কিন্তু এক দিনও থেমে থাকেনি। মানুষ নিজের প্রয়োজনে ছুটে বেড়িয়েছে। যদিও এখানে সামষ্টিক অর্থনীতি বড় একটা ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছে কিন্তু পারিবারিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক পর্যায়ে।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা বেশ জরুরি বলে মনে করি। তা হলো আমরা আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করেছি। এ অবস্থায় এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দূরই এগিয়েছে। আমাদের অর্থনীতির বিকাশ সাধনে কয়েকটি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেসব নিয়েই সম্প্রতি আমরা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের পক্ষ থেকে ‘অ্যা লুক অ্যাট বাংলাদেশ’স ৫০ ইয়ার্স জার্নি : টার্নিং পয়েন্টস অব দি ইকোনমি’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনার আয়োজন করি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা দেখেছি আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে কৃষি খাত, বেসরকারি খাত, রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু আমরা এও দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনাগুলো কীভাবে উল্টো পথে যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুব বেশি এগোতে পারিনি। সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতি এখনো আমাদের বড় বাধা। এখানে আমরা বিশেষত কৃষি ও বেসরকারি খাত এ দুটি বিষয় দেখব। অর্থনীতির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে আমরা আজ আরও অনেক দূর এগোতে পারতাম এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা আমরা করতে পারিনি। এখানে একটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলো নিজ নিজ অবস্থানে নিজের দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করা। আমরা যদি প্রত্যেকেই নিজের কাজটাকে ভালোবেসে দায়িত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখতাম তাহলে আমাদের যে আফসোসগুলো রয়েছে তার সংখ্যা অনেক কম হতো।

আর এ দায়িত্ববোধটা বুঝতে না পারার কারণে করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা অনেক অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছি। আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী ওই সময়ের পরিস্থিতিকে আরও ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারতাম। কিন্তু সে সময় আমাদের কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ ছিল না।

গত বছরের ১৮ মার্চের পর যখন দেখা গেল পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে তখন হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষিত হলো। তা-ও দেওয়া হলো এক প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে একে লকডাউন না বলে সাধারণ ছুটি বলা হয়েছিল। মেসেজের অস্পষ্টতার কারণে বিরাট একটি জনগোষ্ঠী তখন সত্যি সত্যি ‘সাধারণ ছুটি’ ভোগ করতে গ্রামের বাড়ি বা বিনোদন কেন্দ্রে পাড়ি জমিয়েছিল। এই ছিল করোনাকালের একেবারে শুরুতে এক অদ্ভুত ও চরম অনাকাক্সিক্ষত অধ্যায়।

একটা বিষয় বলতেই হয়, আমাদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সরকার দক্ষতা দেখাতে পারেনি। সত্যি কথা বলতে কি, সরকার একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছিল। এদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সামাল দিয়েছে সেখানে দুটো ভাগ আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সুযোগগুলো মোটামুটি সামাল দেওয়া গেছে। যেমন তৈরি পোশাক খাত, প্রবাসী আয় এগুলো কিছুটা হলেও উঠে এসেছে। সরকারের সেই অর্থে কৃষি উৎপাদনও বড় ধরনের ব্যাহত হয়নি। সামষ্টিক অর্থনীতি মোটামুটি সামাল দেওয়া গেছে। তবে পারিবারিক অর্থনীতি আমরা যেটাকে মাইক্রো বলি সেখানে বহুমুখী সংকটগুলো ব্যাপক আকারে চলমান আছে। বাংলাদেশে যে ৫৫ শতাংশ জিডিপি সেবা খাত থেকে আসে সে খাত কিন্তু করোনায় প্রচন্ড ধাক্কা খেয়েছে। সে জায়গা এখনো লন্ডভন্ড অবস্থায় আছে। সুতরাং সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক দিয়ে সার্বিক অর্থনীতির অবস্থাটা আমরা বুঝতে পারব না।

দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববাসী এ মহামারী থেকে মুক্তি পায়নি।

এরই মধ্যে ভ্যাকসিন চলে এলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েই গেছে। বাংলাদেশেও আবার নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে আমরা কোথায় আছি? আরেকটা হচ্ছে কভিড না থাকলে আমরা যেভাবে এগোচ্ছিলাম সে অনুপাতে আমরা এখন কোথায় থাকতাম। এখানে প্রথমে বলি, কভিড তো আমাদের একটা বড় ধাক্কা দিয়েছে। দেশের ভিতরে এবং বিশ্ব অর্থনীতিও অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে। এখানে প্রাথমিক একটা ভয় ছিল কিন্তু এই যে জীবন আর জীবিকা, এ বিতর্কে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই জীবিকার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা হচ্ছে এক ধরনের প্রয়োজনের তাগিদে রাস্তায় নেমে পড়া। আর অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে আমরা খুব দ্রুতই মাঠে নেমে গিয়েছিলাম। এখানে এক বছরের ব্যবধানে আমাদের অর্থনীতিটার কী হলো তার উত্তর খুঁজতে হবে দুই ভাবে। এক. সামষ্টিক অর্থনীতি। দুই. পারিবারিক অর্থনীতি। এর ফলে যেটা হলো তা হচ্ছে, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিটা যে ধাক্কা খেয়েছিল তা সামাল দেওয়া গেছে। কিন্তু পারিবারিক অর্থনীতিটা এখনো বেশ নাজুক অবস্থায়। অনেক মানুষ বেকার হয়ে গেছে। বেশির ভাগ মানুষের আয় কমে গেছে। নতুন করে কেউ কাজ পাচ্ছে না। তবে আমাদের রপ্তানি বা রেমিট্যান্স, কৃষিসহ অভ্যন্তরীণ খাতগুলো আশঙ্কার চেয়ে অনেক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আমাদের সেবা খাত এখনো বিপর্যস্ত। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিও থেমে গেছে। কিন্তু এখানে আমাদের সার্বিকভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কম। কেননা অনেক খাতই এখনো চালু হয়নি। ফলে এখানে উপখাত ধরেই বক্তব্য দিতে হবে বা মূল্যায়ন করতে হবে।

এদিকে করোনায় যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে সেখানে কেবল লকডাউনই কারণ ছিল না। লকডাউন দীর্ঘমেয়াদি ছিল না, কেননা মে থেকেই মোটামুটি সবকিছু চালু হয়েছে। করোনার ধাক্কা দেশের অর্থনীতিতে কয়েকটা ধাপে পড়েছে। একটা হলো বিশ্ব অর্থনীতির যে মন্দা এসেছে তার সূত্র ধরে বাংলাদেশে যে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল তারা ধাক্কা খেয়েছে। তার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতসহ কিছু অংশ ফিরে এসেছে। তার পরও অনেক খাত আছে, আমি উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি যেমন সাতক্ষীরা-খুলনার কাঁকড়া রপ্তানি যারা করত তারা কিন্তু উঠে আসতে পারেনি। আরেকটা হলো লকডাউনে তাৎক্ষণিক একটা ধাক্কা এসেছে বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়া হলেও মানুষের সাধারণ অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো এখনো ফিরে আসেনি। যেমন ধরুন হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। শিক্ষা কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে বড় একটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তা এখনো চালু হয়নি। জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫৫ শতাংশ। অথচ যাদের পকেটে টাকা আছে তারা এখনো কিন্তু খরচ করছে না বা করতে পারছে না। এক কথায় বলা যায়, চাহিদার একটা সংকট রয়েছে। করোনার নানামুখী অভিঘাত এখনো চলমান। অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা দিতে উদ্যোগী হয়েছে।

আবার করোনার প্রভাব কাটার আগেই নতুন এক চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তা হলো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশ। এখানে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু অর্থনীতির উন্নয়নই সব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, মানবসম্পদ এসব বিষয়কেও গুরুত্ব দিতে হবে। এখন তো মানবসম্পদ উন্নয়নটা সবচেয়ে দুশ্চিন্তার জায়গা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেননা করোনার কারণে অন্য খাতগুলো ঘুরে দাঁড়ালেও শিক্ষা খাতকে কোনোভাবেই আগের অবস্থায় নেওয়া যায়নি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া। ফলে সামনের দিনগুলোয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর মানবসম্পদ উন্নয়নটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর বাইরে যেসব বিষয় রয়েছে যেমন রপ্তানি, রেমিট্যান্স, মানুষের গড় আয় এসবে তো কিছুটা হলেও অগ্রগতি রয়েছে। আর করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা খুব একটা দক্ষতা দেখাতে পারিনি। এখানে সমন্বিতভাবে কী করা যায় বা কী করা যেত সেগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। ফলে করোনার ধাক্কায় বিপর্যস্ত মানবসম্পদ ব্যবস্থাকে আবার কীভাবে আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাবে তা এখনো অনিশ্চিত। আবার এখানে নতুন প্রবৃদ্ধির চালক খুঁজতে গেলে শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে তা ধরা যাবে না। এখানে দক্ষ শ্রমিক দরকার। যার ফলে শিক্ষার মানটাকে উন্নত করতে হবে। স্কুলে ঢোকা মানেই কিন্তু শিক্ষিত হওয়া নয়। স্কুলে যাচ্ছি কিন্তু শিক্ষিত হচ্ছি কিনা, স্কিলড হচ্ছি কিনা তা একটা নতুন প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগামীর জন্য কিন্তু এগুলো বেশ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

করোনাকালে এত যে চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা, এগুলো দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হচ্ছে কিনা তা বড় প্রশ্ন আজকের সময়ে। জবাবদিহির বিষয়গুলো বাংলাদেশে অনেকাংশে অনুপস্থিত। ২০২০ সালে স্বাস্থ্য খাতে যে অস্থিরতা ছিল তা ভয়াবহ। সেখানে কোনো জবাবদিহি ছিল না। করোনা মোকাবিলার সঙ্গে সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মেলালে চলবে না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একজন নাগরিক স্বাস্থ্য খাতে মোট খরচের ৭০ শতাংশ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করে কিন্তু তার অর্ধেক পরিমাণ সেবাও পায় না। বাজার  নিয়ন্ত্রণ বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যারা কাজ করেন তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। কাজের মূল্যায়ন বিবেচনায় তাদের মূল্যায়িত করা হয় না। দেশে এ জবাবদিহির যে সংকট আছে তা দূর করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি হবে। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে না। ফলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করলেও মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভবই রয়ে যাবে।

 লেখক : চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।


আপনার মন্তব্য