Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৩ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২৫ জুলাই, ২০১৩ ০০:০০
পুরোপুরি অবসর জীবনে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস
পুরোপুরি অবসর জীবনে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস

'বাবা ভালো আছেন। বয়স হইছে। রিটায়ার্ড লাইফ পার করতেছেন, আল্লাহ ভালো রাখছেন, এই তো। এই মানুষটা নিয়ে নিউজের কী আছে বলেন। ইনঅ্যাকটিভ মানুষ। একটা মানুষ যদি অ্যাকটিভ থাকত, পলিটিক্যাল একটা কানেকশন থাকত, আপনারা তো একটা পলিটিক্যাল কানেকশন খোঁজেন। তিনি তো অ্যাবসলিউটলি ইনঅ্যাকটিভ। বাসা থেকে বের হন না, বাসায় নামাজ পড়েন, কোরআন তেলাওয়াত করেন, বই পড়েন, পত্রিকা পড়েন। শুক্রবার বনানী মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে কবর জেয়ারত (চতুর্থ ছেলে প্রয়াত এমপি ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাসের) করেন। বাইরের কারও সঙ্গে মেশেন না। গ্রামের কাউকে দরকার হলে ফোন দেন। গ্রাম থেকে পারিবারিক ঘনিষ্ঠজন কেউ গেলে দেখা দেন। নিজে ফোন ব্যবহার করেন না। কারও ফোনও রিসিভ করেন না। পুরোপুরি অবসরের মধ্যে আছেন তিনি।' দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সাবেক রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান বিশ্বাসের মন্তব্য জানতে চাইলে তার ষষ্ঠ ছেলে অ্যাডভোটেক জামিলুর রহমান শিবলী বিশ্বাস বলেন, 'বললাম তো এসব নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই।' পারিবারিক আলাপে এসব বিষয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেন কি না_ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সেটা আপনাকে বলব কেন? এসব নিয়ে কিছু লেখার দরকার নেই।' বিশ্বাস পরিবারের কেউ রাজনীতিতে আছেন কি না, কিংবা আগামীতে থাকবেন কি না- এমন প্রশ্নে শিবলী বিশ্বাস বলেন, 'আমরা এখন রাজনীতিতে নাই। ভবিষ্যতে থাকব কি না, তা সময়ই বলে দেবে।'

বিশ্বাস পরিবারের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ঝুট-ঝামেলামুক্ত থাকতে মিডিয়া এড়িয়ে চলছেন বয়সের ভারে (৮৬ বছর) ন্যুব্জ বরিশালের কৃতীসন্তান সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস। পারিবারিক ঘনিষ্ঠজন ছাড়া অপরিচিত কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না তিনি। ব্যক্তি-প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না কেউ। নিজ গ্রাম শায়েস্তাবাদের মানুষ ছাড়া সাক্ষাৎও দেন না কাউকে। ঢাকার গুলশান ২ নাম্বারের ভাড়া বাসায় (রোড : ৯৯, বাড়ি : ১৫) দুটি বাংলা, একাধিক ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা এবং বই পড়ে ও কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করে সময় কাটে তার।

দিনের অবসর সময়ে বাসার বেলকনিতে হাঁটাহাঁটি করেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। সপ্তাহের অন্য দিন বাসার বাইরে বের না হলেও প্রতি শুক্রবার বনানী জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে চতুর্থ, বনানী গোরস্থানে চিরশায়িত সাবেক এমপি ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাসের কবর জিয়ারত করেন তিনি। ওই পরিবারের একটি সূত্র জানায়, 'বয়স হয়ে যাওয়ায় স্যার প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। এলাকার মাটি ও মানুষকে স্যার অত্যন্ত ভালোবাসেন বলে লোকজন গেলে সাক্ষাৎ দেন। তার (রহমান বিশ্বাস) নিজের প্রয়োজন হলে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ ছাড়া কারও সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। রাজনীতি থেকেও অনেক দূরে। নীরবে নিভৃতে দিন কাটে তার।' সাবেক রাষ্ট্রপতি সর্বশেষ বরিশাল এসেছিলেন ২০০৪ সালে। ওই সময় বরিশাল জিলা স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ওই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর গত বছর ঈদুল আজহায় আবার তার বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদের বাড়িতে আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আসেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে শামসুদ্দোহা কালাম বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করে লেখালেখিতে মগ্ন। পাশাপাশি ব্যবসা করছেন চিরকুমার কালাম বিশ্বাস। দ্বিতীয় ছেলে প্রকৌশলী এনসানুল কবির জামাল বিশ্বাস ছিলেন তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। সহোদর তৎকালীন এমপি এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাসের মৃত্যুর পর শূন্য আসনে মনোনয়নের প্রত্যাশায় চাকরি ছেড়ে দেন। পরে মনোনয়ন না পেয়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন জামাল বিশ্বাস। তৃতীয় ছেলে মিজানুর রহমান এ. হাসান মনু বিশ্বাস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊধর্্বতন কর্মকর্তা (ডেপুটি গভর্নর)। বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। চতুর্থ ছেলে ডা. এহতেশামুল হক নাসিম বিশ্বাস বরিশাল শেবাচিম এবং ঢাকা পিজি হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৯৬ সালে বাবা রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের আশীর্বাদে বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও ১৯৯৮ সালের ১২ মার্চ অকালে চিরবিদায় নেন তিনি।

পঞ্চম (মেয়ে)আঁখি বিশ্বাস ঢাকার শহীদ আনোয়ারা কলেজে অধ্যাপনা করছেন, তার স্বামী সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল নিজামউদ্দিন আহম্মেদ। ষষ্ঠ ছেলে অ্যাডভোটেক জামিলুর রহমান শিবলী বিশ্বাস ব্যবসা করছেন। সপ্তম (মেয়ে) রাখি বিশ্বাস গৃহিণী। তার স্বামীও সেনাবাহিনীর ঊধর্্বতন কর্মকর্তা। অষ্টম ছেলে ব্যারিস্টার রোমেন বিশ্বাস রুবেল বিদেশে অবস্থান করছেন। আবদুর রহমান বিশ্বাসের সহধর্মিণী হোসনে আরা রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস। বিশ্বাস পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তাদের পরিবারের কেউ এম এ পাসের নিচে নেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে শায়েস্তাবাদে একটি ফাউন্ডেশন করে গেছেন। ওই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করা হয়। অ্যাডভোকেট শিবলী বিশ্বাস বলেন, 'বাবার বয়স ৮৬ প্লাস। শারীরিকভাবে তিনি অসুস্থ। এ কারণে মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। বিভিন্ন পত্রিকা অফিস থেকে বাসায় ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেগুলো রিফিউজ (প্রত্যাখ্যান) করেন। কোনো বিষয়ে মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে আগ্রহী নন। ঘনিষ্ঠ কারও সঙ্গেও তেমন কথা বলেন না। আমার কথাই তার কথা।'

পারিবারিক উৎস থেকে পাওয়া বর্ণাঢ্য এই রাজনীতিবিদের জীবনী ঘেঁটে জানা যায়, ১৯২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর শায়েস্তাবাদের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার বড় ভাই আবদুল গফুর বিশ্বাস টানা ৩৬ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের। ১৯৪৩ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন রহমান বিশ্বাস। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এম ও আইন পাস করেন।

ষাটের দশকের শুরুতে কিছু দিন জেলার বাবুগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। এরপর শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে বরিশাল বারে আইন পেশায় জড়িয়ে পড়েন। আইয়ুব খানের শাসনামলে মুসলিম লীগে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতি শুরু তার। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্ট সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন এবং '৬৫ সালে ওই সংসদের সেক্রেটারি (হুইপ) ছিলেন। '৬৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ করেন। '৭৪ ও '৭৬ সালে দুবার বরিশাল বারের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রায় একই সময়ে ('৭৬-৭৭ মেয়াদে) বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। '৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। '৭৮ থেকে '৮০ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমান সরকারের পাটমন্ত্রী এবং '৮০ থেকে '৮১ সাল পর্যন্ত বিচারপতি আবদুস সাত্তার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন বরিশালের এই কৃতীসন্তান। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। পরে ওই সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। একই বছরের ৮ অক্টোবর দেশের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস।

 

 

up-arrow