শিরোনাম
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:১২

৫ কেজি চালের দামে ১ কেজি পিয়াজ!

রাহাত খান, বরিশাল

৫ কেজি চালের দামে ১ কেজি পিয়াজ!

বরিশালে পিয়াজের দাম সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। বৃহস্পতিবার বরিশালের পাইকারি বাজারে তুরস্ক ও মিশরের পিয়াজ কেজি প্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং মিয়ানমারের পিয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১৯০ টাকায়। 

অপরদিকে খুচরা বাজারে মিশর ও তুরস্কের পিয়াজ প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা এবং মিয়ানমারের পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকায়। বাজারে দেশি কিংবা ভারতীয় পিয়াজ নেই। 

আমদানি এবং সরবরাহ না বাড়লে পিয়াজের ঝাঁজ (দাম) আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। যদিও পিয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি রোধে কঠোর নজরদারী চলছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান। 

এক কেজি পিয়াজ কিনতে বুধবার রাতে নগরীর হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা বাজারে গিয়েছিলেন নগরীর সার্কুলার রোডের হুমাউন কবির। দোকানি দেড়শ’ টাকা কেজি হাঁকায় অস্বস্তি বোধ করে বাসায় ফিরে যান তিনি। ভেবে ছিলেন পরদিন নগরীর পাইকারি পিয়াজ বাজার ‘পিয়াজ পট্টি’তে আরও কম দামে পিয়াজ কিনবেন তিনি। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে পিয়াজ পট্টি গিয়ে দেখেন প্রতি কেজি পিয়াজ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। দিশেহারা হুমাউন তখন আরও দাম বাড়ার আশঙ্কায় ১৮০ টাকা দিয়ে মিশরের এক কেজি পিয়াজ কিনে বাসায় ফিরেন তিনি। 

তার মতো অনেকেই বাজারে পিয়াজ কিনতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন। কেউ কেউ পিয়াজ না কিনেই বাড়ি ফিরে গেছেন। 

শ্রমিক লিয়াকত আলী খান জানান, দৈনিক ৫শ’ টাকা মুজুরিতে কাজ করে তারা মাছ-ভাত খেতে পারেন না। কোনো মতে পিয়াজ-মরিচ ভর্তা দিয়ে দিন পাড় করতে হয়। এ অবস্থায় ২০০ টাকা কেজি দরে তাদের পক্ষে পিয়াজ কিনে খাওয়া সম্ভব নয়। 

গৃহিনী শিল্পি আক্তার বলেন, ২০০ টাকা কেজি পিয়াজ তার জীবনে দেখেননি। সংসারের নানা খরচ বহন করে ২০০ টাকা দরে পিয়াজ খাওয়া কি সম্ভব-প্রশ্ন রাখেন তিনি। 

রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বুধবারও বরিশালের বাজারে দেড়শ’ টাকা কেজি দরে পিয়াজ বিক্রি হয়েছে। অথচ এক রাতের ব্যবধানে পিয়াজের কেজি ২০০ টাকা। এই স্বল্প সময়ে প্রতি কেজি পিয়াজে ৫০ টাকা করে কিভাবে বাড়ে সেটা প্রশাসনের দেখা উচিৎ। 

মো. মাসুম বলেন, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পিয়াজ ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে ৫ কেজির বেশি চাল পাওয়া যায়। এভাবে লাগামহীনভাবে পিয়াজের দাম বাড়লে ভোক্তারা কি খেয়ে বাঁচবে-বলেন তিনি। 

ক্রেতা আব্দুল আউয়াল বলেন, বাণিজ্য সচিব বলেন পিয়াজের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। কিন্তু বাজারে ২০০ টাকার নিচে কোন পিয়াজ নেই। পিয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ না করার দায় কি বাণিজ্য মন্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীর। আর তারা দায় না নিয়ে সেই বোঁঝা চাপিয়েছেন জনগণের উপর। এটা কোনো ভাবে মেনে নেওয়া যায় না। 

মো. সুমন বলেন, পিয়াজের দাম হু হু করে বাড়ছে। এই দায় তো বাণিজ্য মন্ত্রীর নিতে হবে। পিয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পাড়ার ব্যর্থতায় তার (বাণিজ্য মন্ত্রী) পদত্যাগ করা উচিৎ। 

ঝালকাঠীর পাইকর মো. সোহেল বলেন, প্রতি সপ্তাহে তার দোকানে ১৫ বস্তা পিয়াজ প্রয়োজন। তুলনামূলক কম দাম হওয়ায় তিনি সব সময় বরিশালের আড়ৎ থেকে পিয়াজ কিনেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার বরিশালের আড়তে গিয়ে সোহালের মাথায় হাত। ২০০ টাকা কেজি দরে পিয়াজ কিনে নিয়ে খরচ বাদ দিয়ে কত টাকায় বিক্রি করবেন। এসব ভাবনা থেকে পিয়াজ না কিনেই ঝালকাঠী ফিরে যান তিনি। 

নগরীর সাগরদী বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. সাদি বলেন, পাইকারি ২০০ টাকা কেজি দরে পিয়াজ কিনে লেবার ও পরিবহন খরচসহ খুচরা কত টাকায় বিক্রি করবেন। তার উপর আবার পিয়াজে ঘাটতি আছে। এভাবে পিয়াজ ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 

বরিশালের পিয়াজ আড়তদার মো. মইনুল ইসলাম বলেন, বরিশালে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক পিয়াজের চাহিদা রয়েছে। এখন প্রতিদিন এক ট্রাকের বেশি পিয়াজ আসছে না। সরবরাহ কম থাকায় মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। পিয়াজের সরবরাহ না বাড়লে মূল্য বৃদ্ধি ঠেকানোর কোন উপায় নেই বলে তার দাবি। 

বরিশাল পেয়াজ আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. এনায়েত হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার ফরিদপুরে গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি পিয়াজ পাইকারি ২০৫ টাকা করে কিনেছেন বেপারীরা। লেবার এবং পরিবহনসহ বরিশাল আড়তে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে ২১৫ টাকার বেশি খরচ পড়বে। তাহলে তারা পাইকারি কত টাকায় প্রতি কেজি পিয়াজ বিক্রি করবেন। পিয়াজ নিয়ে হৈ চৈ করার সুযোগে বাজারে চাল, রসুন ও আঁদার মূল্য যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে তা কেউ দেখছেনা বলে দাবি করেন তিনি। 

বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, পিয়াজ বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত নজরদারী করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও পিয়াজ পট্টিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। কেউ পিয়াজে অস্বাভাবিকভাবে মুনাফা করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। 


বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন


আপনার মন্তব্য