Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:৩৫

জেব্রা ক্রসিংকে অবহেলা নয়

জয়শ্রী ভাদুড়ী

জেব্রা ক্রসিংকে অবহেলা নয়
জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে পথচারীদের সহায়তায় রোভার স্কাউট ছবি : জয়ীতা রায়

জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে পথচারী এসে দাঁড়ালেই চলমান গাড়ি থেমে যায়। চালক দূর থেকেই লক্ষ্য রাখে পথচারীর গতিবিধি। পথচারী রাস্তা পার হতে পারেন এই ভেবে চালক আগে থেকেই গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। এই বিরল দৃশ্য দেখা যায় প্রশান্তির দেশ ভুটানের রাস্তায়। দেশটিতে ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়া শুধু জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর ভর চলছে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা। আমাদের মতো কেউ ব্যস্ত রাস্তায় দৌড় দেয় না। চালকদেরও আগে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই।

প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই রাজধানীতে অফিস এবং স্কুল শুরু ও শেষের সময় রাস্তায় গিজ গিজ করে মানুষ। এই মানুষই এদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। অথচ তারাই যখন বিশৃঙ্খলভাবে রাস্তায় চলাচল করেন তখন মনে হয় বেশি মানুষই সমস্যার মূলে। একসঙ্গে অনেক মানুষ যখন ফুটপাথ, ফুটওভারব্রিজ রেখে রাস্তা দিয়ে এলোমেলোভাবে হাঁটে তখন সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর রাজধানীর রাজপথে জেব্রা ক্রসিংগুলো নতুন করে রং করা হয়েছে। অনেক জায়গায় স্কাউটরা পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের অনুরোধ জানাচ্ছেন। দীর্ঘ অনভ্যস্ততায় পথচারীরা অবশ্য ভুলেই গেছেন এর সঠিক ব্যবহার। যানবাহনের ফাঁকে ফাঁকে ঝুঁকি নিয়েই সড়ক পার হন তারা। অন্যদিকে ড্রাইভাররাও জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামাতে চান না। তারা পথচারী পার হচ্ছেন দেখেও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে যেতে চান। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। আবার বেশির ভাগ জায়গায় সিগন্যালের জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এমন হলে মানুষ রাস্তা পার হবে কীভাবে?

পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পার হওয়ার জন্য সাদা দাগ কেটে জেব্রা ক্রসিং তৈরি করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল, বিপণি বিতানসহ জনসমাগমের জায়গাগুলোতে পথচারীদের সহজ ও নিরাপদে পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং দেওয়া হয়। সাধারণ নিয়ম হলো, জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে সাদা দাগ সামনে রেখে গাড়ি থামতে হবে। কিন্তু কেউ সে নিয়ম মানছে না। রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যাল এলাকা এবং অন্য যেসব জায়গায় জেব্রা ক্রসিং রয়েছে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার হলে সড়কের বিশৃঙ্খলা রোধ করা সম্ভব। কমিয়ে আনা সম্ভব সড়ক দুর্ঘটনা।

রাজধানীতে লাল-হলুদ-সবুজ বাতির ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রায় হারিয়েই গেছে। নিয়ন্ত্রণহীন যানজটে বেহাল সড়কে হাতের ইশারায় চলছে যানবাহন। সিগন্যালের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় জেব্রা ক্রসিংগুলোও ব্যবহৃত হচ্ছে না। এগুলোও হারানোর পথে। অথচ এই জেব্রা ক্রসিংগুলোই হতে পারে সড়ক নৈরাজ্যের মোক্ষম সমাধান।

সম্প্রতি নগরীর রাস্তায় বিদ্যমান জেব্রা ক্রসিংগুলো ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কিন্তু নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেসব স্থানে জেব্রা ক্রসিং আছে, সেখানে এর ব্যবহার তেমন নেই। অনেক জায়গায় ক্রসিংয়ের সাদা দাগের ওপরেই যানবাহন থেমে থাকছে। জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছাকাছি এলে গাড়ির গতি কমানোর নিয়ম। কিন্তু অধিকাংশ ড্রাইভার সেটা মানেন না। অধিকাংশ ড্রাইভার জানেনই না জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামাতে হয়। কয়েকটি সিগন্যালে পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটা নিয়ে তাদের মধ্যেও তেমন কোনো ধারণা নেই। নগর ঘুরে দেখা যায়, জেব্রা ক্রসিংয়ে পথচারীদের পারাপারের সময় কিংবা হাত দিয়ে ইশারা দেওয়া হলেও গাড়ির গতি কমে না। পথচারীরা গাড়ির ফাঁকে ফাঁকে অথবা দৌড়ে রাস্তা পার হন। কাকরাইল মোড়ে দায়িত্ব পালন করা এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, অর্ধেকের বেশি গাড়ি চালক সঠিকভাবে ট্রাফিক আইন জানে না। তারা জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে গাড়ির গতি কমানো ও গাড়ি থামানোর ব্যাপারেও উদাসীন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সম্প্রতি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঢাকার বিভিন্ন সড়কে জেব্রা ক্রসিংয়ের কাজ শুরু করে। আরও অনেক জায়গায় বিদ্যমান জেব্রা ক্রসিংয়ে রং করার কাজ করছে। ডিএমপি সূত্র জানায়, ঢাকায় প্রতিদিন একজন করে পথচারী দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। তার মানে শুধু রাজধানীতে বছরে চারশ’র কাছাকাছি মানুষ দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। তাদের ৪১ শতাংশই সড়ক পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছেন।

স্থপতি নগরবিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পথচারীদের রাস্তা পারাপারে কোন জায়গাগুলোতে ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানকার ফুটপাথগুলো ঢালু করতে হবে। শুধু জেব্রা ক্রসিং তৈরি করলে হবে না তার আগে সীমারেখা টেনে গাড়ি থামানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পথচারী কতক্ষণ ধরে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হতে পারবেন সেই সময় নির্ধারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি কতক্ষণ পর পর মানুষের পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং এ গাড়ি দাঁড়াবে সেটাও সিগন্যালের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দিতে হবে। গাড়ি সীমারেখা লঙ্ঘন করলে কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা রাখতে হবে। জেব্রাক্রসিং ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এই উদ্যোগগুলো নিলে মানুষ আগ্রহ বাড়বে কমবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

বিডি-প্রতিদিন/২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮/মাহবুব


আপনার মন্তব্য