Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২০:৪০

আসামি না হয়েও মায়ের সাথে শিশুর কারাবাস!

পঞ্চগড় প্রতিনিধি:

আসামি না হয়েও মায়ের সাথে শিশুর কারাবাস!

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় মাদক মামলার আসামিকে না পেয়ে তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগমকে পিস্তলসহ গ্রেফতার দেখিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। এসময় ঝর্ণার সাথে তার এক বছরের মেয়ে মাসুমা আক্তারকেও নিয়ে যায় তারা। 

সোমবার দুপুরে পিস্তলসহ (ওয়ান সুটার গান) গ্রেফতারের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আব্দুল মান্নান মাদক মামলার আসামি লিটন মিয়া ও তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগমকে আসামি করে তেঁতুলিয়া থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় ঝর্ণাকে তার শিশু সন্তানসহ মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। ফলে আসামি না হয়েও মায়ের সাথে কারাবাসে থাকতে হবে শিশু মাসুমাকেও। যতদিন না তার মায়ের জামিন হচ্ছে ততদিন কারাগারের মধ্যে কাটাতে হবে শিশুটিকে। 

এদিকে মঙ্গলবার লিটনের পরিবারের সদস্যরা এই বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যসের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছে। 

অভিযোগ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার প্রেমচরণ জোত সীমান্ত এলাকার মৃত মখলেছুর রহমানের ছেলে লিটনের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের খাতায় লিটন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। এ সময় পঞ্চগড় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এসআই মাহবুবুর রহমান, কনস্টেবল আব্দুর রহমান, কনস্টেবল খায়রুল ইসলাম এবং ওয়ারলেস অপারেটর মামুনুর রশিদসহ ৪ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। লিটন বাড়িতে না থাকায় ঘর তল্লাসী শুরু করেন তারা। এরপর লিটনের ভাই খাজা ময়নউদ্দিনকে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন তারা। এসময় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা ময়নউদ্দিনকে ঘরে নিয়ে গিয়ে তার কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে ময়নউদ্দিনের স্ত্রী ৪৫ হাজার এবং স্থানীয়  ব্যক্তি ওমর ফারুক ৫ হাজার টাকা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদের হাতে দেয়। টাকা পেয়ে ময়নউদ্দিনকে ছেড়ে দিয়ে তার ভাই মূল আসামি লিটনকে ফের খুঁজতে শুরু করেন তারা। এসময় ঘরে লিটনের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম শিশু সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা ঝর্ণা বেগমকে তার ঘরে আটক করেন। এসময় তারা জানায় যে, ঝর্ণা বেগমের কাছে পিস্তল পাওয়া গেছে। পরে তাকে তেঁতুলিয়া থানায় নিয়ে গিয়ে তাকে ও তার স্বামীকে আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা দেয়া হয়। 

ঝর্ণাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করায় তার ছোট সন্তানদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তার পরিবার। তার তিন মেয়ে। তিনজনই ছোট। বড় মেয়ে লামিয়া আক্তারের বয়স সাত বছর, তার ছোট লাবিবা আক্তারের বয়স চার বছর আর সবার ছোট মাসুমা আক্তারের বয়স এক বছর। ছোট মেয়ে মাসুমাকে সাথে নিয়ে যেতে পারলেও বাকি দুজনকে রেখে যেতে হয়েছে। মায়ের খোঁজে প্রতিনিয়ত কান্না করছে অবুঝ শিশু দুটি। 

মাদক মামলার আসামি লিটনের ভাই মানিক মিঞা বলেন, মা ও লিটন দুজনই অসুস্থতার কারণে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে বেশ কয়েক দিন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে রবিবার বাড়ি ফিরেন। সোমবার আকস্মিক এই অভিযান চালানো হয়। মঙ্গলবার গ্রেফতার ঝর্না বেগমকে তার এক বছরের মেয়েসহ আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। নিরাপরাধ শিশুটি কান্না করছিল। আমার আরেক ভাই ময়নুদ্দিনকে প্রথমে আটক করে। পরে তার কাছে ৫০ হাজার টাকা নেয়। লিটন গাজা খায় এটা সত্যি কিন্তু তার বউ কোন অপরাধ করেনি। লিটনকে নিয়ে গেলে আমাদের কোন আপত্তি নেই।আমার আরেক ভাই নিরাপরাধ। তাকে জোড় করে আটক করার ভয় দেখিয়ে টাকাও নিয়েছে। এক বছরের শিশুটির কি অপরাধ। আমার ভাইয়েরা কখনো অস্ত্রের সাথে যুক্ত নয়। এই ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। 

ঝর্ণার স্বামী লিটন মিয়া বলেন, আমি যদি কোন অপরাধ করে থাকি, আমার কাছে যদি তারা কোন মাদক পেতো তাহলে আমাকে নিয়ে যেতো। কিন্তু মাদক ধরতে এসে মাদক না পেয়ে তারা আমার নিরাপরাধ স্ত্রীকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। বিনা দোষে আমার ছোট মেয়েটিকেও জেল থাকতে হবে। বড় দুটি মেয়ে সব সময় মায়ের জন্য কান্না করছে। বিনা দোষে কেন পরিবারের ওপর এমন নির্যাতন করা হচ্ছে। কোন দোষে আমার সন্তানদের এই শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আমি নিরপেক্ষ তদন্ত করে এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

পঞ্চগড় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আব্দুল মান্নান বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। লিটন তালিকাভূক্ত মাদকের আসামি। আমরা তাকে আটক করতে গিয়েছি, এসময় তার স্ত্রীর কোমরে পিস্তলটি পাওয়া যায়। অস্ত্রসহ পাওয়া গেছে বলে লিটনের স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। তার শিশুটি এখনো মায়ের দুধ খায় বলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অন্য কাওকে আটক করা হয়নি। টাকা নেয়ার অভিযোগটি সাজানো। 


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য