Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ জুন, ২০১৬ ২৩:২২

প্রসঙ্গক্রমে

তাপহরা, তৃষাহরা রমজান

শারমিনী আব্বাসী

তাপহরা, তৃষাহরা রমজান

দুয়ারে যখন নতুন বৈশাখ আসে সেই সঙ্গে নিয়ে আসে নতুন গান, নতুন একটি শাড়ি, নিয়ে আসে নতুন দিনের নতুন আলো। নবীন জাগে নব উৎসাহে বসন্তের আগমনে যেমন অংকুরিত বৃক্ষে নতুন নতুন পাতা। তেমনি জীবন পল্লবিত হয় নতুন সাজে। বসন্তও নিয়ে আসে কত নতুন গান। হেমন্ত নিয়ে জীবনানন্দ দাশের অপূর্ব ভাব সম্পদে ভেসে থাকি বছরজুড়ে। যদিও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই ঘোরায় আমাদের প্রতিকার জীবনের ঘূর্ণন, তবে বোধের রাজ্যই তো প্রকৃত মনোভূমি। তাই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, বসন্তের মতো বাঙালি মুসলিমের জীবনে মহরম, শাবান, রমজান, জিলহজ ইত্যাকার মাসেরও রয়েছে অসীম ব্যঞ্জনা। যে শাখায় ফুল ফোটেনি, পাতা নেই, শুধুই বাকল— তেমন বৃক্ষসম সকাতর বিশ্বাসী মানবকুল আজ বড়ই মধুর কারণ মাসটি  রমজানের। মনে পড়ে অমল ধবল কৈশোরে বাড়ির সবুজ লনে কাঠের দোলনায় দোল খেতে খেতে দাদু আব্বাস উদ্দীন আর প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের শত শত হামদ ও নাত যা বাবা ও ফুফুর কণ্ঠে শ্রুত গাইতাম। সে সব গানের সুর ও বাণীর গভীরতার সিঞ্চনে আল্লাহ ও তার হাবিবকে ভালোবাসার হাতেখড়ি। গাইতে গাইতে বুঝতাম। বুঝতে বুঝতে বাঁধভাঙা ভালোবাসা। কি তীব্র সে ভালোবাসার অভিঘাত। জীবন নদীর উজানে কত না আঘাত, শোক, প্রলয় আর বঞ্চনা এলো— কিন্তু নজরুল আব্বাসের হামদ ও নাত-এর তেজী বুলন্দ চিরদিন ঢেলেছে শিরনি তৌহিদের দুঃখ রাতে, সুখের দিনেও। বিটিভির কল্যাণে যখন শুনতাম ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’, প্রভু আমি উপস্থিত, প্রকম্পিত হতো স্নায়ু, ভেবেছি, কেঁদেছি কবে প্রভু আমাকে কবুল করবেন। দেখব আল্লাহর ঘর। ভাবিনি এই চিরঅধম চিরপাপীকেও তিনি কৃষ্ণ অলিক কাবা শরিফে হজ মোবারক করার তাজ পরাবেন। শোনাবেন বেলালী আজানের মূর্ছনা। সেদিন খুব ভোরে মক্কা অভিমুখে যাওয়ার আগে ফেসবুকে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে লিখে গিয়েছিলাম দাদুর সেই গান যা চিরদিন অশ্রুধারায় গেয়েছি কোনোদিন ভাবিনি তা সত্য হবে।

‘দুখের সাহারা পার হয়ে আমি চলেছি কাবার পানে’। আমার পিতৃব্য প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল ছোটবেলা থেকে বলতেন, ‘মা গো, দিনের শুধু একটি সালাতে প্রভুর জন্য শয্যা ত্যাগ। শুধু এই অভ্যাসটি কর। জীবনে হারবে না।’

দিনের প্রথম প্রণতি অন্তর থেকে উৎসরিত ফজরের নামাজ নতুন একটি দিন ও সূর্যোদয় যখন সম্মুখে। আজ তিনি নেই, আদেশটি ধ্রুবতারা করে নিয়েছি। দেখলাম হজরত ইব্রাহিমের পুনঃনির্মিত আল্লাহর ঘর যা প্রতিটি বিশ্বাসীর বক্ষে আঁকা। দেখলাম লাখো মানুষ ছুটে আসছে পাগলের মতো মক্কার পানে। একশ দশ কোটি মুসলমানের প্রাণের কাবা। দেখলাম তপ্ত আরাফাতের ময়দানে জিকিররত মানুষের বক্ষফাটা ক্রন্দন। প্রভু তখন স্বয়ং চতুর্থ আসমানে। যতদূর চোখ যায় শুধু এক কাপড়, কাফনের কাপড় আচ্ছাদিত মানুষ কে কালো, কে এশীয় কে প্রাচ্যের, কে প্রতীচ্যের বোঝার কোনো উপায় নেই। শিউরে উঠে মনে হয় এই তো হবে শেষ বিচারের দিনের চিত্র। আরাফাতে সবার সঙ্গে কেঁদেছি। নিজের জীবনের শত ভুলের জন্য। তবুও ভুল করে চলেছি। কেঁদেছি জগতের সর্বজীবের কল্যাণের জন্য।

কাবার সামনে প্রথম বিহ্বল দাঁড়িয়ে দেখি যতদূর চোখ যায় শুধুই নামাজি। শুধু্ই প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশী মুমিন। তাহাজ্জতের পর শিউলি ফুলের মতো নির্মল প্রভাতে বাবার হাত ধরে ধীরে ধীরে প্রথম কাবা শরিফ তাওয়াফের স্মৃতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই প্রশ্নবিদ্ধ জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন ও তর্পণ। মরুভূমিরও রয়েছে এক আলাদা সৌন্দর্য। মনে করায় কী ভীষণ দুর্গম ছিল ইসলামের সওদাগর শেষ নবীর দীনকে পূর্ণতা দেওয়ার লড়াই। কারবালা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে স্মরণে এলো—

“নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিরা কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারের ছোরাতে”।

অশ্রুধারা বাঁধ মানল না। আমার বাবা আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন আমার পুত্রকে। আল্লাহর হাবিবের দৌহিত্রকেও প্রাণ হারাতে হলো। তবে আমরা কেন বুঝি না বিপদাপদই মারেফাতের দরজা! আরও অশ্রু ঝরল নজরুলের জন্য। যার জন্যই বাঙালি মুসলিমের হৃদয়ে এসেছে ইসলামের প্রেমের অবিস্মরণীয় জোয়ার।

রমজান দুয়ারে। রমজান মাসে উন্মুখ তাই বিশ্বাসীদের প্রাণের তন্ত্রী। এই তো সুযোগ নিজেকে নতুন করে রাঙাবার, পরিশুদ্ধ করার। জলের গুণে মনটা যদি শুদ্ধ হতো তেমনি প্রতিটি বিশ্বাসী এক বুক আশা নিয়ে প্রতীক্ষা করে, রমজান যেন পুড়িয়ে দেবে আমাদের সব অপরাধ, শত জানা-অজানা ক্লেদ, অশুদ্ধতা। আমরা তো বলিনি আমরা নিরপরাধ। নিছক শুকনো ঠনঠনে মাটির আদম আমরা। কাদায় তৈরি তাই ধূলিসিক্ত হওয়াই আমাদের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি। রমজানই দেয় সুযোগ, দেয় সেই পরশমণি যা মাটিকে করবে সোনা।

মানুষ ক্ষমাহীন, মানুষ ক্ষমা চায় কিন্তু ক্ষমা করতে শেখেনি। তাই শর্ষের ভিতর ভূত নিয়েই প্রতিবার রজমান আসে আর যায়। কিন্তু প্রভু স্বতত ক্ষমাশীল। তিনি করুণাময়। তিনিই রমজান পাঠান। ধরার ধূলিতে করপোরেট ইফতারের রমজান, শপিং মলের রমজান, কেনাকাটার রমজান না— শুধু অশুদ্ধকে পুড়িয়ে দেওয়ার বাসনার রমজান, শুধু ক্রন্দনের নিভৃতি আনার রমজান, দয়া, ক্ষমা, ধ্যানের রমজান, শুধু বিলিয়ে দেওয়ার, শুধু ক্ষমা পাওয়ার প্রবল প্রতীক্ষার প্রাবল্যে আন্দোলিত যে পথ চাওয়া— সে নিদ্রাহারা, পিপাসিত বিশ্বাসীর জন্য তাপহরা, তৃষাহরা রমজানের প্রতীক্ষায় আমরা।

     লেখক : আইনজীবী।


আপনার মন্তব্য