পড়শি সজ্জন হলে কানা মেয়েরও বিয়ে হয়ে যায়। এই প্রবচনের তাৎপর্য হচ্ছে, পাত্রীর পিত্রালয়ের আশপাশের বাড়িতে পাত্রীবিষয়ক বিশদ তথ্য সংগ্রহের জন্য আসা পাত্রপক্ষের লোকদের কাছে পাত্রীর খুঁত চেপে রেখে তার গুণাবলি তুলে ধরা। পড়শি নিজেই যদি ‘কানা’ হয়ে বাঁকা দৃষ্টিতে অবস্থা বিচারে লেগে যান, তাহলে?
তাহলে যা ঘটে সেটা বুঝবার জন্য পাকিস্তানি জমানায় ঢাকা শহরের নবাবপুর রোডে ডা. অশোক রঞ্জন সেনের চেম্বারে ঢুকতে হবে। প্রখ্যাত এই চিকিৎসক বিকাল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। জটিল রোগে ভোগা সব রোগী আসে দেশের নানা প্রান্ত থেকে। ১৬৫ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চেম্বারে এসে পৌঁছেছেন আবদুল ওয়াহেদ, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আজিফা খাতুন আর শিশু বয়সি ছেলে।
ছেলের বয়স পৌনে চার বছর। ছেলেটি শুধু ‘মা’ আর ‘বা’ উচ্চারণ পারে। তা-ও অনেক টেনেটুনে। আজিফার শাশুড়ি বলেন, কোনো কোনো শিশু দেরিতে কথা বলে। আমার নাতিও দেরিতে বলবে। চিন্তার কিছু নাই। পড়শি নারীরা বলেন, চিন্তার অবশ্যই আছে। যে বয়সে পোলার আওয়াজে এই বাড়ি ওই বাড়ি সেই বাড়ি কাঁইপ্যা উঠার কথা, সেই বয়সে পোলা পুরাপুরি ‘বাবা’ না কইয়া খালি ‘বা’ কয়! পোলায় বোবা কিনা আল্লা মালুম।
‘ওরে আল্লারে! তুমি কেন আমার ছেলেরে এমন করলে!’ ব্যস, শুরু হয়ে গেল আজিফা খাতুনের আহাজারি। কয়েক শুভার্থী ‘ছেলে দ্রুত কথা বলবে’ আশ্বাস দিয়ে বলে, এটা কর ওটা কর। তাই তিনি এক গুনিনের কাছ থেকে কবচ এনে ছেলের বাম বাহুতে পরিয়ে দেন, তো বাম হাতের কবজিতে বেঁধে দেন মন্ত্রপূত রঙিন সুতো। আল্লার প্রিয় বান্দা হিসেবে নামকরা ব্যক্তির ফুঁ দেওয়া পানি খাওয়াতে থাকলেন সকাল-দুপুর-রাতে।
আজিফার চাচাতো ভাই আবদুস সাত্তার বলেন, বুবু, কী সব আলতুফালতু করতেছ! মুরাদ মওলবির ঘাড়ে ঘা হইছে। তিন বছরেও সারতেছে না। পানিপড়ায় যদি কাজ হইতো তাইলে তো ব্যাডা ফুঁ দেওয়া পানি ঢাইল্লা নিজের ঘাও কত্ত আগে শুকাইয়া ফেলত।
বোনকে ‘বেক্কইল্লা কাম’ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সাত্তার বলেন, ভাইসাবের (মানে আজিফার স্বামী) লগে কথা হইছে। উনি তোমারে আর ভাগিনারে সামনের সপ্তাহে ঢাকায় নিয়া যাবেন। গেলে দেখবা ডা. সেন তোমার ছেলের মাথায় হাত বুলানোর সঙ্গে সঙ্গে ছেলের সাউন্ড প্রবলেম একেবারে হাওয়া। এভাবেই ঢাকায় এলেন ওয়াহেদ-আজিফা দম্পতি।
ডা. অশোক রঞ্জন সেন খুবই আদুরে ভঙ্গিতে আজিফার ছেলেকে কোলে নেন। তারপর বসিয়ে দেন তাঁর টেবিলে। দুজন এখন মুখোমুখি। পাঁচ-ছয়টি চকলেট দেন তাকে। ছেলেটি মোড়ক খুলে যেই চকলেটটি মুখে দিতে যাবে অমনি ডাক্তারের ইশারায় তাঁর চেম্বারের এক কর্মচারী পিতলের ছোট্ট একটি বাটি ফেলে দিল মেঝেতে। ঝন ঝনান ঝন ঝনাৎ শব্দ হতেই সচকিত শিশুটি পেছনে তাকায়। ডা. সেন বলেন, এ ছেলে বোবা নয়।
ডাক্তারের ঘোষণায় পরমানন্দে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন দম্পতি। কান্নার শব্দে ফের পেছনে তাকায় শিশু এবং টেবিল থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মায়ের বুকে। সেই ছেলেটিই আজকের অমিতবাক আমি। মা বলতেন, আমার ছেলে অনেক অনেক কথা বলবে বলেই হয়তো কথা বলা শুরু করতে বিস্তর সময় নিয়েছে।
২.
নিজের শৈশবের বাকসমস্যার ছবিটি অনেক দিন পর আমায় দেখিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মানবের উচ্চারিত শব্দাবলির হ্রাস-বৃদ্ধি’ বিষয়ক গবেষণার ফল। গবেষণা বলছে, একজন মানুষ এখন প্রতিদিন গড়ে আগের চেয়ে ৩৩৮টি শব্দ কম বলছে। সেই হিসাবে বছরে একজন মানুষ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শব্দ কম বলছে। এতে করে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধনের ধরন নেতিবাচকভাবে বদলে যাচ্ছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ভ্যালেরিয়া ফাইফার বলেন, কথা কম বলার অর্থ হচ্ছে অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সময় কমিয়ে দেওয়া। মানুষ কথা বলা কমিয়ে দিলে নানা সামাজিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কথা বলার মধ্য দিয়ে যে তাৎক্ষণিক প্রশান্তি ও আবেগপ্রবণ সংযোগ তৈরি হয়, বন্ধন দৃঢ় করার জন্য তা জরুরি। কথা বলা কমলে এসব সুবিধা হারিয়ে যেতে পারে।
‘কথা কম, কাজ বেশি’ মর্মে যে উপদেশ এত দিন আমরা শুনেছি এবং শোনাচ্ছি, তা কি বন্ধ করে দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে? তা হলে তো দেয়ালে ঝুলন্ত হিতকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে-‘কাজও বেশি, কথাও বেশি।’ মানুষ নাকি প্রায় দুই লাখ বছর ধরে কথা বলে মনের ভাব বিনিময় করছে। ভরসা করছে কণ্ঠস্বরের ওঠানামা আর আবেগপ্রবণ ইশারার ওপর। এগুলোর মাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে এসএমএস, ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
সেজন্য আমরা কি আফসোস আর বিলাপের নীলবেদনা গায়ে মেখে চিৎপাত শুয়ে দূর আকাশের তারা গুনতে থাকব? না, তার দরকার নেই। আমার মতে, অতিকথন হৃতকথন স্বল্পকথনের চক্রে নিহিত মজাগুলো সংরক্ষণ স্বাস্থ্যপ্রদ হতে পারে।
‘বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করুন’-অনুরোধ করা হয়েছিল আমাদের ছাত্রকালের বন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানকে। বত্রিশ মিনিট ভাষণের পরে এই অনুরোধ। মুস্তাফিজ বললেন, বন্ধুগণ! আমি জানি, আপনারা সংগীতানুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষমাণ। তাই আমি, দুই মিনিটের মধ্যে শেষ করছি...। প্রায় পাঁচ মিনিট বক্তৃতার পর তিনি বলেন, আমি আর বেশি সময় নিচ্ছি না। খুব সংক্ষেপে যেটা বলতে চাই, তা হলো...। আরও তিন মিনিট ভাষণ দেন মুস্তাফিজ। চতুর্থ মিনিটেও থামেন না।
মুস্তাফিজের অতিভাষণে রুষ্ট ফখরুল ইসলাম চিৎকার করেন, মাফ কররে, দোস্ত! দয় আল্লার ক্ষ্যামা দে। ফখরুলের সমর্থনে প্রবল করতালি শুরু হলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুস্তাফিজ বলেন, ভঁইষের মতন চিল্লানের কী আছে! পরক্ষণেই শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন : এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার কথা শোনার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
আমার বামে বসা হিমাংশু বণিক বলেন, বুকে হাত দিয়া কন তো ভাই, আমরা কি উনার বকবকানি ধৈর্যের সঙ্গে শুনছিলাম? ধৈর্য তো কারও ছিল না। তাইলে উনি ধন্যবাদ দিতাছেন কোন আক্কেলে?
৩.
শাহবাজ করিম আর মুস্তাফিজুর একই স্টাইলের কথক। শুরু করেন, থামতে ভুলে যান। আসলে বলা উচিত, থামতে জানেন না। প্রকৃতপক্ষে জগৎসংসারে সত্যিই কিছু কিছু ব্যাপার থাকে, যা শুরু হলে থামানো কঠিন। যেমন স্ট্যালিনের শাসনকালের রাশিয়ায় পুলিসের তদন্তকার্য।
স্ট্যালিন এক প্রভাতে ঘুম থেকে জেগে দেখেন, তাঁর হাতঘড়ি হাতে নেই। অথচ ওটা হাতে-পরা অবস্থাতেই তিনি ঘুমিয়েছিলেন। স্ট্যালিনকে মস্কো নগরীর পুলিস প্রধান বেরিয়া বলেন, উদ্বিগ্ন হবেন না কমরেড। ঘড়িচোরকে দুপুরের মধ্যেই আমরা পাকড়াও করতে সক্ষম।
স্ট্যালিন চা-নাশতা খেয়ে চুরুট ধরান। তামাক সেবন শেষে দাপ্তরিক কিছু কাজ সেরে তিনি ফের একটু বিছানায় গড়িয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। এমন সময় দেখেন, হাতঘড়িটি বালিশের খোলের ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে। তিনি মস্কো পুলিস চিফকে ফোন করেন, বেরিয়া! তোমার কী খবর।
তদন্ত চলছে কমরেড। আমরা আশাবাদী...। স্ট্যালিন বলেন, তদন্ত বন্ধ কর। বেরিয়া বলেন, বললেই তো বন্ধ করা যায় না। আমরা অলরেডি পাঁচ চোর ধরে এনেছি। এদের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদে তিনজন স্বীকার করেছে যে তারা আপনার ঘড়ি চুরি করেছে। এমতাবস্থায় তদন্ত থামানো যায়? নাকি থামানো উচিত? স্ট্যালিন বলেন, কিন্তু আমার ঘড়ি তো চুরি যায়নি। বেরিয়া বলেন; তাতে কী! আজ চুরি হয়নি। সামনে যেকোনো দিন চুরি হওয়া সম্ভব। সেজন্য আগাম তদন্ত করে রাখছি।
৪.
শাহবাজ করিম কথা শুরু করলে শ্রোতা মনে মনে দোয়া করেন, ‘এরে বোবা করে দাও প্রভু। সম্ভব না হলে আমারে বধির কর দয়াময়।’ তাঁর কিছু সদগুণও রয়েছে। যেমন টাকা ধার নিয়ে ওয়াদামতো শোধ করা। অতিশয় উজ্জ্বল গুণ হলো, অতিকথন যে ভয়ংকর বদগুণ সেটা পুরোপুরি উপলব্ধি করা।
জনরব এই যে অতিকথনের দোষবশত শাহবাজ চাকরিতে থিতু হতে পারেন না। বিষয়টি তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রশ্নকর্তাকে প্রহারোদ্যত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা। তাই, জনরব জিন্দাবাদ।
সত্তর হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরি তিনি তিন মাসও করতে পারেননি। পদত্যাগ করেছেন। শুনে আমরা আহারে উহুরে করেছি। চাকরি ছাড়ার দিন দশেক পরে তাঁর সঙ্গে দেখা। দুনিয়ার কোথায় কে অনাচার করছে সবিস্তারে বলতে থাকলেন। প্রশ্ন করি, সুন্দর চাকরিটা কেন ছাড়লেন?
‘আর কয়েন না ভাই!’ বলেন শাহবাজ, ‘বস্ ব্যাটা বকবক করতে করতে মাথার পোকা বার করায় ফেলতেছিল। আত্মরক্ষার জন্য রিজাইন করতে বাধ্য হয়েছি।’
♦ লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন