Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১৩:০১

'বিদেশে আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে তারপরও ভাবনা থেকে যায়'

রিমি রুম্মান

'বিদেশে আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে তারপরও ভাবনা থেকে যায়'

আমার বাবার দূর সম্পর্কের এক বোন থাকতেন আমাদের শহরে। আমরা ফুপু ডাকতাম। গ্রাম থেকে মফঃস্বল শহরে এসে আলিশান এক বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। বাড়িটির অন্দরমহল সাজানো গোছানো। রাজকীয় ব্যাপার স্যাপার। উদ্দেশ্য সন্তানদের শহরের স্কুলে পড়াবেন। সেই অনুযায়ী স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন তিন পুত্রকে। সবার বড়জন আমার সমবয়সী। ফুপা বিদেশ থাকতেন। মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে। মাঝে মাঝে ছুটিতে দেশে এলে ফুপুকে নিয়ে বেড়াতে আসতেন আমাদের বাসায়। তখন স্কুলে পড়তাম আমি। ছোট ছিলাম যদিও, তবুও কিছু ভালো লাগার অনুভূতি মনকে নাড়া দিয়ে যেতো। ফুপা-ফুপু দুপুরের কিছু পরে সূর্য যখন পশ্চিমাকাশের দিকে হেলে পড়তে শুরু করতো সেই সময়টায় ড্রইং রুমে চা-নাস্তা খেতে খেতে গল্প করতেন বাবা-মা'র সাথে।

সন্ধ্যা ঘনাবার কিছু আগে তারা দু'জন বেলকণিতে গিয়ে দাঁড়াতেন। ফুপুর মুখের উপর গোধূলিবেলার সোনালি আলো এসে পড়তো যখন, কী অদ্ভুত সুন্দরই না লাগতো তাকে। খোঁপায় বেলি ফুলের মালা। সেখান থেকে বেলি ফুলের মিষ্টি সুবাস আমাদের ঘরখানিতে ভরে থাকতো। বেলিফুল সংগ্রহ করে মালা গেঁথে খোঁপায় পরা, কতটা সৌখিন হলে এমনটি হতে পারে, ভাবতাম আমি। বড় হতে হতে জানলাম, প্লাস্টিকের বেলি ফুলের উপর 'জেসমিন' পারফিউম স্প্রে করে খোঁপায় পরতেন ফুপু। কী চমৎকার আইডিয়া! আর তাতেই তাজা ফুলের সুবাস ছড়াতো চারিদিকে। সুন্দর সাজগোজ এর জন্যে ফুপুকে ভালো লাগতো চিরকালই।

কখনো দুপুরের দিকে ফুপুর বাসায় বেড়াতে গেলে দেখতাম আমার সমবয়সী ফুপাত ভাইটি তখনো ঘুম থেকে উঠেনি। ঘরের কাজে সাহায্যকারী মেয়েটি সকালের রকমারি নাস্তা খাবারের ট্রলিতে সাজিয়ে, তা ঠেলে নিয়ে যেতো তার রুমের দিকে। ঘরময় বলিউডের নায়কদের পোস্টার। একই স্টাইলে ফুপাত ভাইটির নিজেরও পোস্টার সাইজের ছবি দেয়ালে শোভা পেতো। ফুপু আমাদের দুপুরের খাবার পরিবেশন করার সময়টায় ছেলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। বলতেন, রাত জেগে ছেলেটি পড়াশুনা করে, তাই বেলা করে ঘুম ভাঙ্গে। গল্পের সবটা জুড়েই থাকতো ছেলের প্রশংসা।

এইসব শুনে শুনে নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কিঞ্চিত ক্ষোভ জমা হতো মনের কোণে। আমার প্রায়ই মনে হতো, ইস আমাদের বাবা-মা যদি এমন করে আমাদের প্রশংসা করতো! কতোই না আনন্দিত হতাম। সবার বাবা-মা কত্তো ভালো, আমাদের বাবা-মা যেন ক্যামন! উল্টো অন্যের ছেলে কতো ভালো লেখাপড়া করে সেইসব নিয়ে আলোচনা করতেন তারা। কিন্তু বছর শেষে পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই তুলনামূলক ভালো হতো আমাদের। আর আমার সেই ফুপাত ভাইটি মোটামুটিভাবে পাশ করে যেতো।

পরে গল্পচ্ছলে জেনেছিলাম, রাত জেগে সে পড়াশুনা নয়, হিন্দি সিনেমা দেখে সময় কাটাত। যা তার মায়ের অজানা ছিল। আবার কখনো বা মনে হতো ওরা অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল, চাহিবামাত্রই সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের কতো সীমাবদ্ধতা! সেইসাথে আছে কঠোর শাসন, নিয়মানুবর্তিতা। ঘড়ির সময় ধরে পড়া, খাওয়া, ঘুম। এমন কী বাবার রুমে রাখা টিভিতে সীমিত কিছু অনুষ্ঠান দেখবার অনুমতি মিলত। অথচ ওদের নিজেদের শোবার ঘরেই টিভি। আছে তা দেখবার অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের নিয়ে বাড়িতে জন্মদিনের পার্টি করার স্বাধীনতা। ওদের বেশ সৌভাগ্যবান মনে হতো।

এরপর একদিন পৃথিবীর সকল কন্যা সন্তানদের মতোই হুট করে বড় হয়ে গেলাম আমি। স্বামীর সাথে চলে এলাম এই দূর পরবাসে। কর্মব্যস্ততা আর কঠিন বাস্তবতার কারণে দীর্ঘ অনেকগুলো বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম আমরা। ফুপা মারা গেছেন, সে খবর পাই স্বজনদের মারফতে। একদিন এই বিদেশের বাড়িতে বসে প্রযুক্তির কল্যাণে আমার শহরের লোকাল নিউজ পোর্টালে কিছু ছবি এবং সংবাদ দেখে চমকে উঠি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে আমার সেই ফুপাত ভাইর ছবি। হাতকড়া পরানো। মাথা নিচু করে নয়, সরাসরি ক্যমেরার যান্ত্রিক চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মাদকাসক্ত চোখ-মুখ। খবরের শিরোনাম 'মাদক ব্যবসায়ী আটক '। খবর নিয়ে জানলাম, আগেও বেশ ক'বার এমন আটকের ঘটনা ঘটেছিল।

মনটা বিষণ্ণ হোল। বহুদিন পর ফুপা-ফুপুর মুখ ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মনে হলো, এতো কষ্ট করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে ঘামঝরা অর্থ পাঠাতেন পরিবারের সুখের জন্যে, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে, এই তার ফলাফল! তীব্র মনঃকষ্টে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগলো। কেবলই মনে হচ্ছিল, আর্থিক চাকচিক্যই জীবনের সব নয়। অর্থ অর্জন করা আর ব্যয় করার মাঝে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। কেননা আর্থিক চাকচিক্য অনেক ক্ষেত্রেই কিশোর বয়সীদের উপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলে থাকে। কখনোই শিশু কিশোরদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা প্রদর্শন করা উচিত নয়। এতে তাদের নৈতিক অধঃপতন হয়।

অনেক আগে বইয়ের পাতায় পড়েছিলাম, 'নৈতিকতা এমন এক আচরণ, যার চমক কখনোই ক্ষীণ হয় না, তার উপর কোন বাহ্যিক প্রভাব পড়ে না। তার উপর কখনো জং ধরে না।' টিভি দেখার অবাধ স্বাধীনতা ছিল না বলে কিশোর বয়সে বাবা-মা'র প্রতি যে অসন্তোষ ছিল, তা নিয়ে লজ্জিত হলাম, একদিন যখন নিজেই সন্তানের মা হলাম। বুঝতে পারলাম, টিভির মাধ্যমে দেশী-বিদেশী চ্যানেল দ্বারা প্রদর্শিত কিছু সামাজিক তথ্য শিশু কিশোরদের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু কিছু দৃশ্য তাদের হিংস্র প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। সামাজিক অপরাধে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে। টিভি আর সিনেমা শিশু কিশোরদের সামনে যে জীবনশৈলী তুলে ধরে, তার প্রভাবে তাদের মানসিকতা সঠিক বয়সের আগেই বড়দের মতো হয়ে যায়। তারা হয়ে উঠে অকালপক্ব। আবার সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা যখন অন্ধ ভালোবাসায় রূপ নেয়, তখনই তারা অবাধ্য হতে শুরু করে। এ বিষয়ে বন্দনা অরোরা'র একটি উক্তি মনে পড়ছে , 'বুদ্ধিমান মা-বাবা সন্তানের জন্যে ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ '।

আমার বাসার পাশেই একটি হাইস্কুল আছে। বাসার পিছনের পার্কিং স্পেসের জায়গাটা খানিক নির্জন। সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু কিশোর-কিশোরীকে ড্রাগ নিতে দেখা যায়। কেউবা সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে বন্ধুদের সাথে জটলা করে। এইসব দেখে দেখে আমার ভেতরে একরকম ভয়, শংকা কাজ করতে থাকে। এতটুকুন ছেলেমেয়েরা কেমন করে এপথে গেলো! আমার ছেলেটি যখন মিডল স্কুল শেষ করে হাইস্কুলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেই সময়ে একদিন তাকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম। নিজের ভয়, শংকার কথা জানালাম। সতর্ক করে দিলাম। সে জানালো, এ বিষয়ে ইতিমধ্যে সে জেনেছে সোশ্যাল স্টাডিজ ক্লাসে টিচারের কাছ থেকে। হাইস্কুলে যাবার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তাদেরকে মিডল স্কুলে এ বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে।

অবশেষে সে যখন নিউইয়র্কের অন্যতম সেরা হাই স্কুল 'স্টাইভেসেণ্ট' এর গর্বিত ছাত্র হবার সুযোগ পেলো, আমি যতোটা না খুশিতে আত্মহারা হয়েছি, তারচেয়েও অধিক অজানা আশঙ্কায় দিন কাটিয়েছি। স্কুল থেকে ফেরার পর নানান বিষয়ে আলোচনা করেছি। লেখাপড়া, ভালো ফলাফল নিয়ে উৎসাহ দিতে চেষ্টা করেছি। ভালো নাম্বার না পেলে ভেঙে না পড়তে আশ্বস্ত করেছি। আমার অনেক কিছু জানবার আগ্রহ আর উপর্যুপরি প্রশ্নে কখনো সে বিরক্তি প্রকাশ করলে কিংবা উচ্চস্বরে কথা বললে মনখারাপ করেছি। দিনশেষে সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে জড়িয়ে ধরে দুঃখ প্রকাশ করেছে, ক্ষমা চেয়েছে। তারপরও ভাবনা থেকে যায় বিদেশে বেড়ে উঠা আমাদের টিনএজার ছেলেমেয়েদের নিয়ে।

কথাগুলো মনে এলো যে কারণে, এইতো এই পহেলা বৈশাখে বরের কিনে দেয়া নকল বেলি ফুলের মালা খোঁপায় পরেছিলাম (যদিও দেখতে একেবারে সতেজ ফুলের মতোই)। বন্ধু মাক্সুদার কাছ থেকে উপহার পাওয়া 'জেসমিন' নামের সুগন্ধি স্প্রে করে দিলাম তাতে। ঘরময় বেলি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়লো। আচমকা আমার ফুপুর মিষ্টি মুখখানা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মালাগুলো খুলে আবার প্যাকেটবন্দি করে রেখে দিলাম। মনে হলো এটি শুধু একজনকেই মানায়। আমার সেই শ্যাম বর্ণের ফুপুকে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য