শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৮

যশোর

১২ কিলোমিটার পরই দাম তিন গুণ

সাইফুল ইসলাম, যশোর

বৃহস্পতিবার সকালে যশোরের সবজি জোন খ্যাত সদর উপজেলার সাতমাইল বাজারে কৃষক প্রতি কেজি বরবটি বিক্রি করেন ২০ থেকে ২৩ টাকার মধ্যে। ঠিক একই সময়ে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে যশোর শহরের বড় বাজারে বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি! একই সময়ে সাতমাইল বাজারে ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হওয়া ১ কেজি ফুলকপি যশোরের বড় বাজারে ৬০ টাকা, ৫ থেকে ৭ টাকা কেজির মুলা ২০ টাকা, ২০ টাকার পাতাকপি ৩৫ টাকা, ২০-২২ টাকার শিম ৪০ টাকা, ৪০-৫০ টাকার উচ্ছে ৬০ টাকা, ২৬ টাকার কাঁচা ঝাল ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ২৫-৩০ টাকার লাউ বড় বাজারে ৪০ টাকা, ২২ থেকে ২৪ টাকা কেজি মিষ্টিকুমড়া ৩০ টাকা, ২০-২২ টাকার পটোল ৩৫ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। উৎপাদক থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরত্বে ভোক্তার কাছে যেতেই সবজির দাম দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে দাম বেড়ে যাচ্ছে আরও। মাঠের কৃষকও জানেন বিষয়টি। তবে তারা বলছেন, সাতমাইল হাট থেকে অন্তত পাঁচ-ছয় হাত ঘুরে সবজি যশোর শহরের ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায়! এভাবে হাত ঘুরতে ঘুরতেই বেড়ে যায় দাম। আর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি পাঠাতে বেশি খরচ হয় পরিবহন খাতে। চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে সবজি পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। সে কারণে সবজির দামও অনেক বেড়ে যায়। তারা মনে করেন, মাঠ থেকে সবজি সরাসরি খুচরা বাজারে নিতে পারলে, পরিবহন খরচ কমাতে পারলে এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করলে মানুষ অনেক কম খরচে সবজি কিনে খেতে পারবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের মধ্যে গতকাল যশোর শহরের বড় বাজারে দেশি পিয়াজ ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, বিদেশি পিয়াজ ১২০ টাকা, মোটা চাল ২৮ থেকে ৩২ টাকা, সয়াবিন ৯০ টাকা, মসুর ডাল বিদেশিটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি মসুর ডাল ১০০ টাকা কেজি, খোলা আটা ২৭. রান্নার লবণ ১৫ ও চিকন লবণ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সাতমাইল সবজি বাজারে মুলা ও বেগুনের আমদানি ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে মুলা বিক্রি করতে আসা চাষিদের মুখটা ছিল মলিন। সদর উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের কৃষক বাবর আলী বিশ্বাস নিজের খেত থেকে চার ঝুড়ি মুলা সাতমাইল বাজারে এনেছেন বিক্রির জন্য। বললেন, চার ঝুড়ি মুলা ধুয়ে পরিষ্কার করতে চারজন মজুর লেগেছে। এখন মজুরের দামও উঠছে না। ৫-৭ টাকা কেজির ওপরে কেউ দামই বলছে না। খেত থেকে বড় বড় সাইজের টাটকা পাতাকপি তুলে এনেছেন মাঝদিয়া গ্রামের সাইফুল। কাঠামারা গ্রামের নজরুল ইসলাম নসিমন ভর্তি করে এনেছেন ফুলকপি। তার ফুলকপির দাম ৩৫ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। এই সময়ে এ দাম পেয়েই তারা খুশি। নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে যে চর এলাকা আছে, সেসব জায়গায় খুব ভালোমানের সবজি উৎপাদন হয়। এই সময়ে সেসব শীতের সবজি বাজারে চলে আসে। আর চরের সবজি বাজারে উঠলেই যশোরের সবজির দাম পড়ে যায়। তবে সাইফুল বলেন, দাম পড়লেও সমস্যা নেই। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শীতের আগেই এসব সবজি কয়েক দফা চাষ করে যশোরের সবজি চাষিরা ভালোই লাভ করেছেন। আমবটতলা এলাকার ওহিদুল ইসলাম শীত আসার আগেই আট বিঘা জমিতে বেগুন ও মুলার চাষ করেছিলেন। সে সময় তিনি ৪০ টাকা কেজি দরে বেগুন ও ১৮ টাকা কেজি দরে মুলা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। শীত আসার আগেই বেগুন থেকে বিঘাপ্রতি তিনি দেড় লাখ টাকা করে লাভ করেছেন। গত কয়েক দশক সবজি উৎপাদনে একটানা শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে যশোর জেলা। এ জেলার সদর, চৌগাছা, মনিরামপুর, শার্শা ও বাঘারপাড়া উপজেলায় সারা বছরই চাষ হয় অন্তত ২০ রকম সবজি; যা যশোর ও আশপাশ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ১৮টি জেলায় পাঠানো হয়। সাতমাইল সবজি হাটের ব্যবসায়ী হারুন হোসেন চাষিদের কাছ থেকে সবজি কিনে ট্রাক বোঝাই করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। তিনি বলেন, ‘সোম, মঙ্গল, শুক্র- এ তিন দিন সাতমাইল হাটে সবচেয়ে বেশি সবজি কেনাবেচা হয়। এ কদিন শতাধিক ট্রাক সবজি সাতমাইল হাট থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রতিদিনই ১৫ থেকে ২০ ট্রাক সবজি যশোরের বাইরে যায়।’ আরেক পাইকার শরীয়তপুরের জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সাতমাইল হাট থেকে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও শরীয়তপুর, মাদারীপুর, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জসহ আরও অনেক জেলায় তিনি সবজি পাঠান। কৃষি সম্প্রসারণ অফিসসূত্রে জানা যায়, যশোরে সবচেয়ে বেশি সবজি চাষ হয় সদর, বাঘারপাড়া ও চৌগাছা উপজেলায়। এসব উপজেলার হাজারো কৃষক বছরজুড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন নানারকম সবজি উৎপাদন করেন। যশোর ও আশপাশ এলাকায় ৩ থেকে ৪ লাখ মেট্রিক টন সবজির চাহিদা রয়েছে। বাকি সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। সদর উপজেলার সাতমাইল, বারিনগর, মানিকদিহি, হৈবতপুর, তীরেরহাট, চূড়ামনকাটি, আমবটতলাসহ কয়েক শ গ্রামে মাঠের পর মাঠ সবজিতে ভরা থাকে সব সময়। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক এমদাদ হোসেন বলেন, যশোরে এবার ৬ হাজার হেক্টর জমিতে নানারকম আগাম শীতের সবজি চাষ করেছিলেন চাষিরা। আর এখন ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে শীতকালীন সবজি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর