শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ মার্চ, ২০২০ ২৩:৪৩

স্বাভাবিক চিকিৎসা সংকট বাড়ছে

বরিশালে সাড়ে ৭ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনা ইউনিটে দুজনের মৃত্যু, বগুড়ায় করোনা সন্দেহে ফেলে গেল বাসস্ট্যান্ডে, মানিকগঞ্জে নারীর মৃত্যুর পর করোনা পরীক্ষায় নমুনা সংগ্রহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাস আতঙ্কে সাধারণ রোগে আক্রান্ত রোগীরা স্বাভাবিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না। সাধারণ সর্দি জ্বর বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে পাচ্ছেন না চিকিৎসা। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সরকারি- বেসরকারি সব হাসপাতালেই একই পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও বসছেন না। কিছু হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের ভর্তিই নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে করোনাভাইরাসে শনাক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা না হলেও বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুসারে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) আইসোলেশনে থাকা সুলতান শেখ (৭০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে শুক্রবার তিনি চিকিৎসার জন্য খুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি হন। মৃত সুলতান শেখ নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার আবদুল গফুর শেখের পুত্র। খুমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ইনচার্জ ডা. শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানিয়েছেন, মৃত সুলতান শেখ করোনা ইউনিটে ভর্তি থাকলেও তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বিষয়টি ঢাকায় আইইডিসিআর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা জানিয়েছে তার নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। সে কারণে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বরিশালে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন দুই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ৭টা ২০ মিনিটে করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পটুয়াখালী সদর উপজেলার বহলগাছিয়া গ্রামের মো. জাকির হাওলাদার (৪৫) নামে ওই রোগীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ৭ ঘণ্টার ব্যবধানে এই হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন দুজন রোগীর (নারী ও পুরুষ) মৃত্যু হয়েছে। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন জানান, মো. জাকির হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি অ্যাজমা জনিত শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে ওই রোগীকে পটুয়াখালী হাসপাতাল থেকে গত শনিবার বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা প্রথমে তাকে মেডিসিন ইউনিটে প্রেরণ করেন। সেখান থেকে ওই রাতেই তাকে করোনা ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। রোগীর উপসর্গ দেখে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন করোনা ইউনিটের চিকিৎসকরা। শেবাচিমের পরিচালক জানান, ৭ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনা ইউনিটে দুজন রোগীর মৃত্যুর খবর আইইডিসিআর-কে জানানো হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মৃতদেহ সমাহিত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এর আগে গত শনিবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে শেবাচিমের করোনা ইউনিটে ভর্তির পরপরই নগরীর কাউনিয়া পুরানপাড়া এলাকার নিরু বেগম (৪৫) নামে আরেক রোগীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরপরই স্বজনরা ওই এলাকার মো. দুলালের স্ত্রী নিরু বেগমের মরদেহ নিয়ে যান। ওই মৃত নারীর স্বজনদের উদ্ধৃতি দিয়ে শেবাচিম পরিচালক জানান, নিরু বেগম ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চার দিন আগে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান তিনি। এরপর বাড়িতে তিনি জ্বর, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। গত শনিবার তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাত পৌনে ১২টার দিকে শেরেবাংলা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। তার ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ ছিল। জরুরি বিভাগ থেকে করোনা সন্দেহে করোনা ইউনিটে স্থানান্তরের পরপরই তার মৃত্যু হয়।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জ্বরে আক্রান্ত থাকার পর পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। শ্বাসকষ্টেও ভুগছিলেন তিনি। শনিবার বিকালে শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের খোনাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর এলাকাবাসী করোনা আতঙ্কে ভীত হয়ে পড়ে। তবে চিকিৎসক ও তার পরিবার বলছেন, করোনা নয়, তার মৃত্যু স্বাভাবিক। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ মার্চ শনিবার শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের খোনাপাড়া গ্রামের ইয়াসিন আলীর ছেলে গোলাম নবীর (৫০) হঠাৎ জ্বর হয়। এরপর শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এলাকাবাসী করোনা আতঙ্কে তার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি করোনাভাইরাসে নয় অতিরিক্ত জ্বরেই মারা গেছেন গোলাম নবী। চিকিৎসকরাও বলছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে গোলাম নবী মারা যায়নি। রাতে সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু। এক বছর ধরে তিনি লেফট ভেন্টিকুলার ডিজিজে ভুগছিলেন।

মানিকগঞ্জে এক নারীর মৃত্যু : মানিকগঞ্জে সদির্, কাশি ও পাতলা পায়খানায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ওই নারীর নাম সুচিত্রা সরকার (২৬)। তিনি হরিরামপুর উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের বড়ইছড়া গ্রামের ব্যবসায়ী নিতাই সরকারের স্ত্রী। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুচিত্রাকে আনা হলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই হাসপাতালে উপপরিচালক এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত সুচিত্রা সরকার সাত দিন ধরে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট এবং দুই দিন ধরে পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত ছিল। তিনি জানান সাত দিন আগে ওই নারীর শ্বশুর মারা যান। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বিভিন্ন লোকের সমাগম হয়েছিল। সেখানে আসা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি আক্রান্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুল আমিন আখন্দ বলেন, নির্দেশনা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কিনা- তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইতিমধ্যে নমুনা সংগ্রহ করা হযেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা পরীক্ষার জন্য ঢাকায়  প্রেরণ করা হবে।

বগুড়ায় করোনা সন্দেহে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিল শ্রমিককে, এগিয়ে আসেনি কেউ : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে গতকাল সকালে শাহ আলম (৫৫) নামে এক শ্রমজীবীকে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে বগুড়ার শিবগঞ্জের মহাস্থান বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ওই ব্যক্তি ঢাকা থেকে রংপুরের বাড়িতে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রংপুরের ধাপ মডার্ন মোড় এলাকার মৃত জমির উদ্দিনের ছেলে শাহ আলম ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে তিনি শনিবার রাতে ঢাকা থেকে রংপুরগামী পণ্যবাহী একটি ট্রাকে ওঠেন। গতকাল সকালে ট্রাক বগুড়ার শিবগঞ্জের মহাস্থান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছলে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সন্দেহে ট্রাকের চালক ও হেলপার তাকে মহাসড়কের পাশে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। শাহ আলম দীর্ঘক্ষণ মহাসড়কের পাশে পড়ে থাকলেও ভয়ে কেউ কাছে আসেনি। সকাল ৯টার দিকে এক পথচারী দেখতে পেয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর কবির স্থানীয় রায়নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামকে জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম ঘটনাটি শিবগঞ্জ থানাকে জানান। তখন থানার এসআই মোহাম্মদ আলী তাকে ভ্যানে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান।

মুন্সীগঞ্জে রোগীশূন্য হাসপাতাল : করোনা আতঙ্কের কারণে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল এখন রোগীশূন্য। আগে প্রতিদিন আন্তবিভাগ এবং বহির্বিভাগে হাজার হাজার রোগী বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা নিত। করোনার আতঙ্কের কারণে পুরো হাসপাতালটি এখন ফাঁকা রয়েছে। জেলা সিভিল সার্জনের দেওয়া তথ্য মতে, জেলার বিভিন্ন স্থানে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে ৩৬৮ জন। এদের মধ্যে ৩৬ জনকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। নতুন যোগ হয়েছে ৯ জন। বর্তমানে পুরো জেলায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে ৩৪১ জন। তবে এখনো জেলার আইসোলেশন ওয়ার্ডগুলোতে কোনো রোগী ভর্তি হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর