শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:০২

মাফিয়া গোল্ড স্মাগলার মনির আটক

অভিযোগের পাহাড়, ৬০০ ভরি সোনা জব্দ, ১ কোটি টাকা অস্ত্র মদ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাফিয়া গোল্ড স্মাগলার মনির আটক
অবশেষে গ্রেফতার গোল্ডেন মনির -বাংলাদেশ প্রতিদিন

কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী থেকে সোনা চোরাকারবারি। এরপর বাড্ডা, গুলশান এলাকায় জাল-জালিয়াতি করে একের পর এক ভূমি দখল। রূপকথার গল্পের মতো হঠাৎ করেই বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন মনিরুল ইসলাম ওরফে গোল্ডেন মনির। চলন-বলন, এমনকি লাইফস্টাইলেও চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আসে নব্বইয়ের দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী মুরগি মিলনের এই ক্যাশিয়ারের। এর পরও থেমে ছিল না তার অপকর্ম। হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল হিসেবে পর্দার আড়ালে থেকে তার ইশারাতে একের পর এক ঘটে যাচ্ছিল অনেক অপরাধ কান্ড। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের বিভিন্ন দফতরে তার বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগগুলোকে বিশেষ কায়দায় আটকে দিলেও এবার আর শেষ রক্ষা হয়নি। রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মনিরের বাসায় শুক্রবার রাতভর অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। অভিযানে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, ৫টি বিলাসবহুল গাড়ি, স্বর্ণালঙ্কার, অস্ত্র ও মাদক জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিযানে থাকা র‌্যাব কর্মকর্তারা। অস্ত্র ও মাদক মামলার তদন্তভার নিতে র‌্যাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আবেদন করবে বলে জানিয়েছেন তারা। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে গোল্ডেন মনিরের বাসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় অভিযান চালায় র‌্যাব। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এ অভিযান চলে। ছয়তলা ভবনটি ঘিরে এ সময় বিপুলসংখ্যক র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। ভবনের বিভিন্ন তলায় তল্লাশি চালিয়ে মাদক ও অস্ত্র জব্দ করা হয়। অভিযানকালে অবৈধভাবে আমদানি করা দুটি বিলাসবহুল গাড়ি পাওয়া যায়, যার মূল্য ৩ কোটি টাকার ওপরে। এ ছাড়া শোরুমে তার আরও তিনটি গাড়ি পাওয়া যায়। জানা গেছে, বাড্ডা, গুলশান এলাকার জমি দখল ও জাল-জালিয়াতির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সেকেন্ড হোম করেছেন মালয়েশিয়ায়। তিনি পলাতক বিএনপি নেতা বাড্ডার এক সময়ের ওয়ার্ড কমিশনার কাইয়ুমের সেকেন্ড ইন কমান্ড। মনির বিএনপি-জামায়াতে অর্থায়ন করতেন বলেও জানিয়েছে র‌্যাব। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মনিরের বাবা রাজাকার। বিএনপি জোট আমলে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের সহযোগিতায় মনির রাজউকের কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় নামে-বেনামে প্লট বরাদ্দ করিয়ে নেন। ২০০০ সালের শেষের দিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিজ বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও জমির জাল দলিলসহ গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করা হয়। ১১ মাস জেলহাজতে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। অপহরণ, চোরাচালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে তার নামে একাধিক মামলা। ২০০৩ সালের জুনে তৎকালীন র‌্যাবের সার্জন শহিদুল ইসলামকে গোল্ডেন মনির তার লাইসেন্স করা অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বাড্ডা থানায় মামলা হয়। মামলা নম্বর ৮(৬)২০০৩ ও ৯(৬)২০০৩। পুলিশ সদস্য হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একই থানায় ২০০৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়। জিডি নম্বর ৪৪০। তার বাবার নামে সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল স্কুল থেকে উপার্জিত অবৈধ টাকা দিয়ে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে ‘জমজম টাওয়ার’ নামে বিশাল বিপণিবিতান গড়ে তুলেছেন মনির, যার আনুমানিক মূল্য কয়েক শ কোটি টাকা। গুলশানের ন্যাম ভিলায় ৬ নম্বর রোডে তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ফ্ল্যাট। ডিআইটি প্রজেক্টে ১৪ নম্বর রোডের আরেকজনের নামে থাকা ১ নম্বর প্লটটি দখল করে নিয়েছেন গোল্ডেন মনির। একই এলাকার ১৩ নম্বর রোডের ৩ নম্বর প্লট এবং ৪ নম্বর রোডের ১০ নম্বর প্লটও দখল করে নিয়েছেন তিনি। র‌্যাব জানায়, গোল্ডেন মনিরের আরেকটি পরিচয় আছে, তা হচ্ছে ভূমি দখলদার। রাজউকের অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঢাকা শহরের ডিআইটি প্রজেক্ট, এর পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে ২০০টির বেশি প্লট রয়েছে তার। ইতিমধ্যে ৩০টির কথা তিনি র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। কর ফাঁকির বিষয়টির সঙ্গে এনবিআর ও বিআরটিএর লোকজন জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখছেন র‌্যাবের তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। অবৈধভাবে সোনা আমদানি ও ভূমি দখল বাণিজ্য করে গোল্ডেন মনির হাজার কোটি টাকার অধিক মূল্যের সম্পদ গড়েছেন- গোয়েন্দা সংস্থার এমন তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে র‌্যাব। গতকাল সকাল পর্যন্ত এ অভিযান চলে। এর আগে শুক্রবার রাত ১১টা থেকে মনিরের মেরুল বাড্ডার ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অভিযান শেষে ঘটনাস্থলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সোনা  চোরাচালানের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা হয়। গোল্ডেন মনিরের আরও একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি ভূমি দখলদার। রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া সিল বানিয়ে বিপুল পরিমাণ ভূমি দখল করে অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। ডিআইটি প্রজেক্ট ছাড়াও বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জে তার ২০০টির বেশি প্লট আছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। রাজউকের সম্পত্তি বেদখল করে এবং সোনা চোরাচালান করে বর্তমানে তার সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকারও বেশি।

গোল্ডেন মনিরের উত্থান : মনির নব্বইয়ের দশকের দিকে গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। পরে ক্রোকারিজ ও লাগেজ ব্যবসায় যুক্ত হন। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন মাল দেশে আনার কাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে সোনা চোরাকারবারিদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এবং বিপুল পরিমাণ সোনা অবৈধভাবে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তার সোনা চোরাচালানের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর ও ভারত। এসব দেশ থেকে তিনি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ সোনা বাংলাদেশে নিয়ে আসতেন। এ কারণে তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির। গাউছিয়ায় রয়েছে তার একটি সোনার দোকান।

যা জব্দ করা হয়েছে : মনিরের বাসা থেকে প্রায় ১০টি দেশের বিভিন্ন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চায়নিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম ও ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্য ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া একটি পিস্তল, চারটি গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল এবং প্রায় ৬০০ ভরি সোনা জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি জব্দ করা হয়েছে নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

বিলাসবহুল গাড়ি : গোল্ডেন মনিরের অটোকার সিলেকশনের শোরুম রয়েছে। তবে আমদানি-নিষিদ্ধ ৫টি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে তার, যার প্রতিটির মূল্য ৩ কোটি টাকা করে। গাড়িগুলোর দুটি রাখেন বাসায় আর শোরুমে তিনটি।

চার সংস্থাকে তদন্তের অনুরোধ : গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পেয়েছে র‌্যাব। এগুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য দুদক, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে এনবিআরকে তদন্তের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

রাজনৈতিক দলকে আর্থিক সহযোগিতা : একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে র‌্যাব জানতে পেরেছে, মনির ১০-১৫ বছর ধরে বিএনপি-জামায়াতকে সহযোগিতা করে আসছিলেন। ওই দলের যেসব নেতা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন তার কাছ থেকে, তাদেরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

মনিরের বিরুদ্ধে মামলা : বিদেশি অনুমোদনবিহীন মুদ্রা রাখার জন্য মনিরের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া অস্ত্র ও মাদক রাখার অপরাধে অস্ত্র ও মাদক আইনে করা হয়েছে পৃথক দুটি মামলা।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর