বারবার গর্ভপাত বা সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণ। Recurrent Miscarriage বা ঘন ঘন গর্ভপাত বলতে বুঝায় “২০ সপ্তাহ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভের শিশুটি দুই বা আরও বেশিবার নষ্ট হয়ে যাওয়া।” দেখা গেছে, এটি সাধারণত ১-৫% নারীকে আক্রান্ত করে থাকে। যে সকল নারীরা এই পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতে ভুগে থাকেন, তারা মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েন। তাদেরকে সাহায্যের হাত বাড়ানো সকলের উচিত।
কি কারণে পুনরাবৃত্ত বা বারবার গর্ভপাত ঘটে:
-
জিনগত অস্বাভাবিকতা: সবচাইতে বড় কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রোমোজোমের সমস্যা। তবে পরিবেশগত কারণেও ক্রোমোজোম বা জিনের সমস্যা হয়ে থাকে, যা বারবার গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।
-
জরায়ু সংক্রান্ত বিষয়: অনেক সময় জরায়ুতে জন্মগত ত্রুটি থাকে যা তার গঠনে হেরফের করে; যেমন—জরায়ুর মাঝখানে পর্দা থাকা, জরায়ু দুভাগে বিভক্ত থাকা। এছাড়া জরায়ুতে টিউমার (ফাইব্রয়েড) বা প্রদাহ বা ক্ষত চিহ্নও পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।
-
হরমোনজনিত সমস্যা: PCOS (পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম), অনিয়মিত থাইরয়েড রোগ বা প্রোজেস্টেরন হরমোনের ঘাটতি বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের অন্যতম কারণ। প্রোলেক্টিন-এর অসামঞ্জস্যতাও গর্ভপাত ঘটিয়ে থাকে।
-
রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা: (Thrombophilia Disorder) থ্রম্বোফিলিয়া, অ্যান্টিফসফোলিপিড, SLE (এসএলই) রোগগুলোর ক্ষেত্রে বারবার গর্ভপাত ঘটে থাকে।
-
অজানা বা অব্যক্ত: প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। শরীরের Immunity (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) ও স্বামীর শুক্রাণুর ত্রুটি থাকলেও গর্ভপাত ঘটে।
সাধারণত যে সকল দম্পতির বারবার গর্ভনষ্ট হয়েছে, তারা যখন ডাক্তারের কাছে আসেন, ডাক্তার তখন তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত হিস্ট্রি (ইতিহাস) নিয়ে থাকেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। তারপর ডাক্তার তাদের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন যা থেকে বোঝার চেষ্টা করেন যে, তাদের কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা। যেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার—যেমন ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করার পর সন্তান নিতে বলেন। একইভাবে এ সকল দম্পতিকে পরবর্তী সন্তান ধারণের আগেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে বলা হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট রোগ রয়েছে কিনা সেটা নির্ধারণ ও তার চিকিৎসা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সকল দম্পতিকে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেগুলো হচ্ছে—অধিক বয়সের আগেই সন্তান ধারণ করা উচিত। সুষম খাদ্য গ্রহণ ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধূমপান, অধিক মদ্যপান ও কফিপান থেকে বিরত থাকতে হবে; কেননা এগুলো সন্তান ধারণে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়:
| বয়স | গর্ভপাতের সম্ভাবনা (%) |
| ৩৫ এর নিচে | ১১-১৫% |
| ৩৫-৩৮ বৎসর | ২৫% |
| ৪০-৪৪ বৎসর | ৫১% |
| ৪৫ এর বেশি | ৯৩% |
সুতরাং ৩০-৩৫ বছরের মধ্যে সন্তান নিয়ে নেওয়া ভালো।
চলুন এবারে দেখে নেওয়া যাক কী কী পরীক্ষা করা প্রয়োজন:
রক্তের হিমোগ্লোবিন, APS Test বা Thrombophilia Screen Test, ডায়াবেটিস, Thyroid Test, Prolactin Test, TORCH পরীক্ষা এবং জরায়ুর USG করতে হয়; এতে PCOS বা ফাইব্রয়েড আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়।
Genetic Testing: যেহেতু পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের জন্য ক্রোমোজোম দায়ী, বেশ অনেক ক্ষেত্রে মা ও বাবা দুজনের ক্রোমোজোম অ্যানালাইসিস করা হয়। সবকিছু করার পর ডাক্তারগণ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
চিকিৎসাসমূহ:
-
পরিবর্তিত জীবনযাপন: ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। উভয়ের কফি ও অ্যালকোহল গ্রহণ কমাতে হবে। শরীরচর্চা করতে হবে। ঠিকমতো ঘুমাতে হবে এবং দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে।
-
থ্রম্বোফিলিক অথবা অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোমের ক্ষেত্রে: রোগীকে হেপারিন ইনজেকশন দিতে হতে পারে। অনেক সময় অ্যাসপিরিন (Aspirin) দেওয়া হয়ে থাকে। অ্যাসপিরিন ও হেপারিন রক্ত জমাট বাঁধাকে প্রতিহিত করে পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতকে অনেকাংশে ঠেকাতে পারে।
-
অন্যান্য: থাইরয়েড, প্রোলেক্টিন ও ডায়াবেটিস থাকলে সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা করে তবেই সন্তান গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
-
শল্য চিকিৎসা: অনেক সময় জরায়ুর ফাইব্রয়েড ও পর্দা বা সেপ্টাম অপারেশন করে সরিয়ে ফেলতে হতে পারে। যে সকল নারীদের জরায়ুর মুখ (Cervix) ঢিলা থাকে, তাদেরকে সুতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয় (Cerclage)। যা পরবর্তীতে প্রসবের আগে কেটে দেওয়া হয়।
-
হরমোন চিকিৎসা: সন্তান ধারণের পরেও হেপারিন/অ্যাসপিরিন বা হরমোনের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হতে পারে। প্রোজেস্টেরন হরমোন গর্ভকালীন অবস্থায় জরায়ুকে শান্ত রাখে এবং সংকোচন করতে দেয় না, ফলে পুনরাবৃত্ত গর্ভপাত রোধ করা সম্ভব হয়।
যেসব ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের সঠিক কোনো কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে কোনো বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই বলে যে আবার গর্ভপাত হবে এমনটিও নয়। ভবিষ্যতে গর্ভধারণ সফল হতে পারে। তাই সেক্ষেত্রে দম্পতিদের ডাক্তারের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ রাখার উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে।
যে সকল দম্পতির বারবার গর্ভপাত হয়, তাদের অনেক রকম মানসিক যন্ত্রণা হয়ে থাকে। সেজন্য তাদেরকে অত্যন্ত যত্ন, ভালোবাসা ও আদর দিয়ে আগলে রাখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক ডাক্তারের সাহায্যও নিতে হতে পারে। তবে বারবার সন্তান নষ্ট হয়েছে বলে আবার এমনটি হবে তা নয়; এবং এই পুনরাবৃত্ত গর্ভপাতের জন্য স্ত্রী বা স্বামী কারও একক দোষ নেই। এটি কোনো জিন-ভূতের ব্যাপারও নয়। সঠিক কারণ নির্ধারণ করে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে আপনার কোল জুড়ে একটি সুন্দর ফুটফুটে সন্তান আসতে পারবে।
লেখক: গাইনোকলজি, প্রসূতি, ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস, ধানমন্ডি