শিরোনাম
প্রকাশ : ২৫ মার্চ, ২০১৯ ১৪:১০
আপডেট : ২৫ মার্চ, ২০১৯ ১৪:১২

একটি চিঠি, একজন শহীদ বাকী এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

রেশমী আহমেদ:

একটি চিঠি, একজন শহীদ বাকী এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

একটি চিঠি। একজন তরুণ। একজন মা। একটি দেশ। একটি দেশের জন্মকথা। হ্যাঁ, এক মাকে লেখা একটি চিঠি একটি দেশের জন্মের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে। কাগজের টুকরায় লিপিবদ্ধ সেই কয়েকটি লাইন বাংলাদেশের জন্মলগ্নের লাখো তরুণের আত্মত্যাগের এক দলিলও বটে। যা মুক্তিযুদ্ধ না দেখা প্রজন্মকে সেই অপরীসিম আত্মত্যাগ কিঞ্চিত অনুভব করতে সাহায্য করবে। ১৯৭১ এর ১৮ এপ্রিল চিঠিটি তার মাকে লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল বাকী। চিঠির কয়েকটি লাইন ছিল এমন....

...দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। তাই ঢাকার আরো ২০টা যুবকের সাথে আমি পথ ধরেছি ওপার বাংলায়। মা তুমি কেঁদো না, দেশের জন্য এটা খুবই নূন্যতম চেষ্টা। মা তুমি এদেশ স্বাধীনের জন্য দোয়া কর।......

দেশ স্বাধীনের নেশায় মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছেন, যেখানে মৃত্যু পদে পদে। তারপর সেই চেষ্টাটা ছিল তাঁর কাছে নূন্যতম চেষ্টা। মায়ের কাছে নিজের জন্য না দোয়া চাইছেন দেশের জন্য। কতটা ভালোবাসা, কতটা সম্মান আর কতটা সাহস থাকলে একজন তরুন এভাবে চিন্তা করতে পেরেছিলেন তা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে কষ্ট হওয়ার কথা না।  

রাজধানীর খিলগাঁও এর আমেনা খাতুন এবং মো. আব্দুল বারীর ৬ সন্তানের একজন ছিলেন বাকী। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর  আগে ৬৯ এর অসহযোগ আন্দোলনে চলাকালে ৮ মার্চ তিনি গর্ভনর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবনে) বোমা নিক্ষেপ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। আশেপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে ঐ বিস্ফেরণে। ৭১ এর এপ্রিলে মেলাঘর প্রশিক্ষণ নিতে যান। মে মাসে ফেরত এসে কিছু অপারেশনে অংশ নিয়ে আবারো উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ফেরত এসে বৃহত্তর ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। একটি ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন বাকী। ৪ ডিসেম্বর রাতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ  খিলগাঁও  এ মায়ের সাথে দেখা করে ফেরার পথে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর মুজাহিদদের আক্রমেনর প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হন সূর্যসন্তান বাকী।

বীর প্রতীক শহীদ বাকীর মেলাঘরে যাবার আগে মাকে লেখা সেই চিঠিটি সংরক্ষিত আছে আগারগাঁও এর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৪ নম্বর গ্যালরীতে। কেবল একটি চিঠি নয় বাকীর প্রজ্ঞা আর সাহসিকতার আরো অনেকগুলো নির্দশন নিয়ে সাজানো হয়েছে একটি কর্ণার। যা সাক্ষ্য বহন করে চলেছে শহীদ বাকীর মত অসংখ্য সাহসী যুবকের মহান আত্মত্যাগ।

স্বাধীনতার এই মাসে এসে অর্ন্তজালে বিচরণ করা আধুনিক প্রজন্মের কাছে শহীদ বাকীর চিঠির মত এমন আরো মুক্তিযুদ্ধের নির্দশন উপস্থাপন করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইটে যুক্ত হয়েছে একটি বিশেষ পাতা। শহীদ আজাদের বুলেটবিদ্ধ বই, মুক্তিযুদ্ধকালীন সপ্তম শ্রেণীতে পড়া ছোট্ট মেয়ে স্বাতী চৌধুরীর বর্ণনায় একাত্তরের ২৫মার্চের ঢাকার কালো রাত, বিখ্যাত সানডে টাইমস ম্যাগাজিনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত প্রচ্ছদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অটোগ্রাফসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্মারক। প্রতিটি স্মারক যেন এক একটি ইতিহাস যাত্রার দরজা।

ওয়েবসাইটের প্রদত্ত ইতিহাস স্মারকের চুম্বক অংশগুলো নতুন প্রজন্মকে লক্ষ প্রাণের আত্মত্যাগে পাওয়া স্বাধীনতাকে আরো ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে আরো ভালোভাবে জানতে উদ্বুদ্ধ করবে। ‘ক্ষুদ্র প্রয়াস রক্ষা করবে ইতিহাস’ শীর্ষক এই উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে https://www.liberationwarmuseumbd.org/bkash/ এই লিংককে ক্লিক করতে হবে।  

বাঙালীর মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস বহন করা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার ভাড়া বাড়িতে যাত্রা শুরু করে। দেশের বহু মানুষের প্রচেষ্টায় এবং সরাসরি অংশগ্রহনে সমৃদ্ধ হয়ে আগারগাঁও এর স্থায়ী ভবনে বর্তমানে কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাঠামো তৈরি হয়েছে, তবে এর প্রসার, প্রচার, বিকাশ, বিস্তারের জন্য অনেক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অনেক অর্থ প্রয়োজন, অনেক রকম সম্পৃক্তি প্রয়োজন। মুক্তিযদ্ধ জাদুঘর যে বিশেষ পাতাটি উদ্বোধন করেছে সেখানে রয়েছে সরাসরি অনুদান দেওয়ারও সুযোগ। ১০০, ৫০০ বা ১০০০ টাকার অনুদান খুব সহজেই এখন বিকাশের মাধ্যমে এই বিশেষ পাতা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তহবিলে দেয়া যাচ্ছে।

কেবল আর্থিক অনুদান দেওয়া বা গ্রহণের জন্য এই উদ্যোগ নয়। বরং যে কয়েক কোটি মানুষ অর্ন্তজালের দুনিয়ায় বিচরণ করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই জনগোষ্ঠিকে ইতিহাসের পরিক্রমায় সংযুক্ত করতেই এই প্রচেষ্টা নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। শুরুতে দশটি স্মারকের বিবরণ সংযুক্ত হয়েছে বিশেষ এই পাতায়। তবে ক্রমান্বয়ে এটা আরো বাড়বে।

স্বাধীনতার এই মাসে ভার্চুয়াল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রবেশ করে অমূল্য ইতিহাসকে জানার প্রচেষ্টার শুরু করা এবং তা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্থিক অনুদান সংগ্রহের কার্যক্রমকে আরো বেগবান করার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে তা সকলের অংশগ্রহণে সাফল্য মন্ডিত হয়ে উঠবে এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য