১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। এবার অবশ্য নাম হচ্ছে বৈশাখী শোভাযাত্রা
বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। যা নতুন আশা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আবহে পালিত হয়। এর প্রধান উৎসব বৈচিত্র্যের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্ণিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, ছায়ানটের ‘রমনার অশ্বত্থমূলে’ প্রভাতি অনুষ্ঠান, পান্তা-ইলিশ ভোজন, বৈশাখী মেলা এবং লাল-সাদা পোশাকে উৎসব উদ্যাপন। এ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ‘বৈসাবি’ (বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু) উৎসব এই উদ্যাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
মানুষের জীবনযাত্রায় ঋতুর প্রভাব পাশাপাশি সাহিত্য বিশেষত কবিতার আকর্ষণ সহজাত। বৈশাখ নিয়ে রচিত প্রথম কবিতা কোনটি সেটি জানা যায় না। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যে বৈশাখের একটি স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (১৫৪০-১৬০০ খ্রি.) বৈশাখকে দাবদাহ আর প্রাকৃতিক বিক্ষুব্ধতার আলেখ্যে তুলে ধরেছেন। এমন রুদ্র প্রকৃতি, বাড়ি বাড়ি মাংস বিক্রেতা ফুল্লরার জীবনে কী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল, কাব্যে তা তুলে ধরা হয়েছে :
বৈশাখে অনলসম বসন্তের খরা।
তরুতল নাহি মোর করিকে পসরা
পায় পোড়ে খরতর রবির কিরণ।
শিরে দিতে নাহি আঁটে খুঞ্চার বসন
নিযুক্ত করিল বিধি সবার কাপড়।
অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের দুড়
পদ পোড়ে খরতর রবির কিরণ।
শিরে দিতে নাহি আঁটে অঙ্গের বসন
বৈশাখ হৈল আগো মোর বড় বিষ।
মাংস নাহি খায় সর্ব্ব লোকে নিরামিষ’
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩ খ্রি.) বৈশাখকে দেখেছেন প্রকৃতির মতো বহুমুখী ক্রিয়া আর বৈচিত্র্যিক রূপময়তার উৎস হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.) যেন বৈশাখের কবি। তাঁর জন্মও বৈশাখ মাসে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ এসেছে বহুমাত্রিকতার দ্যোতনায়- সুরে, ছন্দে, রুদ্রতায়, রুক্ষতা আর জীবনের মতো অনুভবের অভিজ্ঞতায়। তিনি বৈশাখে যেমন দেখেছেন ধ্বংস রূপ, তেমনি দেখেছেন নতুন বছরের নতুন প্রত্যাশার উল্লাস। ‘বৈশাখ আবাহন’ কবিতায় বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার রূপ দেদীপ্যমান :
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপসনিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক...
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক।’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.)- স্বভাব আর কাব্যভাবে বৈশাখের মতো রুদ্র, প্রকৃতির মতো অশান্ত। তিনি বিপ্লবী নতুন সৃষ্টিতে বৈশাখ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি বৈশাখের তাণ্ডবে ভীত নন, বরং উল্লসিত :
‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর
প্রলয় নূতন সৃজন বেদন
আসছে নবীন জীবন ধারা
অসুন্দরে করতে ছেদন
তাই যে এমন কেশে-বেশে
মধুর হেসে
ভেঙে আবার গড়তে জানে
সে চির সুন্দর।’
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪ খ্রি.) প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ আর ইতিহাসকে বিলীন করে দিয়ে চিরজীবী করে রেখেছেন। তাঁর কবিতায় হৃদয়ানুভূতি যেমন অবিনাশী তেমনি বিস্তৃত। বৈশাখকে তিনি দেখেছেন শুভ্রতার প্রতীক, মেঘের ভেলা আর সাদা কড়ির মিলন রূপে। ‘ঘুমিয়ে পড়ব আমি’ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে প্রাকৃতিক অনাবিলতায় :
‘ঘুমিয়ে পড়ব আমি একদিন
তোমাদের নক্ষত্রের রাতে
শিয়রে বৈশাখ মেঘ সাদা
যেন কড়ি শঙ্খের পাহাড়।’
কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৯-১৯৭৪ খ্রি.)। ‘বৈশাখ’ ও ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ নামে যে দুটি কবিতা রচনা করেছেন, তা বৈশাখের কবিতায় ভিন্নমাত্রা দান করেছে। বৈশাখ তাঁর কাছে মহাশক্তির প্রতীক, যা কল্যাণ সাধনের জন্যই আবির্ভূত হয় :
‘ধ্বংসের নকীব তুমি হে দুর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ
সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কণ্ঠে
শুনি আজ অকুণ্ঠিত প্রলয়ের ডাক।’
ফররুখ তার ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ কবিতায় বৈশাখকে বিমূর্ত করেছেন মহাশক্তিধররূপে। বৈশাখকে জীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়ার আহ্বান :
‘বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো। বন্দর, শহর
পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে,
অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে
প্রচণ্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর।’
তাঁর ‘বৈশাখ’ কবিতায় :
‘সংগ্রামী তোমার সত্তা অদম্য, অনমনীয় বজ্র দৃঢ় প্রত্যয় তোমার
তীব্র সংঘর্ষের মুখে বিশাল সৃষ্টিকে ভেঙে অনায়াসে কর একাকার
সম্পূর্ণ আপসহীত, মধ্যপথে কোন দিন থামে না তো জানে না বিরতি
তোমার অস্তিত্ব আনে ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে অবিচ্ছিন্ন অব্যাহত গতি
প্রচণ্ড সে গতিবেগ ভাঙে বস্তি, বালাখানা, ভেঙে পড়ে জামশিদের জাক
লাভ-ক্ষতি সংজ্ঞাহীন, নিঃশঙ্ক, নিঃসঙ্গ তুমি
হে দুর্বার, দুর্জয় বৈশাখ।’
কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬ খ্রি.)-এর বৈশাখ দারিদ্র্যের বিমূর্ত রূপ। বৈশাখে তিনি দেখতে পান মানুষের অসহায়ত্ব-
‘রাত্রি ফুরালে জ্বলে ওঠে দিন
বাঘের থাবায় মরছে হরিণ
কাল বোশেখের তাণ্ডবে কাঁপে পড়ো পড়ো চাল
শূন্য ভাঁড়ারে বাড়ন্ত চাল ইচ্ছে তার ইচ্ছে।’
আল মাহমুদ ‘বোশেখ মাসে এ কোন খরা’ কবিতায় বৈশাখকে শান্তির পরশ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন :
‘ঋতুর রাজা বোশেখ এসো,
খোলো স্রোতের মুখ
তৃষ্ণাকাতর হাজার বুকে
লাগুক পানির সুখ।’
কবি হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩) অনুভবে প্রকৃতির মতো চঞ্চল আর প্রকৃতির উপাদানসমূহের মতো বর্ণিল আবেগে সবাক :
‘এসো বৈশাখ, আবেগস্নিগ্ধ অভিষেকে
নিজকে তুমি স্থাপন করো
ভালোবাসায় আপ্লুত হও আরো...।’
পান্তা ইলিশের শহুরে সংস্কৃতির কথা ধারণ করলেন মোহাম্মদ আমীন :
‘পান্তা ভাতের পানি আর পদ্মা নদীর ইলিশ
কাঁটাগুলো সরিয়ে দাও হে চৌদ্দশ ছাব্বিশ
এটাই আমার প্রার্থনা গো লবণ মাখা হাতে
প্রতি বছর এসো তুমি ভর্তা-ভাজির সাথে
মাটির থালায় শুকনো মরিচ হলেই চলে বেশ
তাতেই হেসে গড়াগড়ি সোনার বাংলাদেশ।’
মূলত, বাংলা নববর্ষ বাঙালির হাজার বছরের পুরনো অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। পুরোনো বছরের হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলার ‘হালখাতা’ উৎসব সম্রাট আকবরের সময় থেকে চলে আসছে। পার্বত্য জেলাগুলোতে ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমারা যথাক্রমে বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু (সংক্ষেপে বৈসাবি) উৎসবের মাধ্যমে বিদায়ি বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে নববর্ষ অত্যন্ত আনন্দ উল্লাসে উদযাপিত হয়। শিশু-যুবা-বৃদ্ধ সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার সব সম্প্রদায়ের জনগণ এ উৎসবমুখর দিনটি প্রবল উৎসাহে উদযাপন করে। এ উৎসবে প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা। এ ছাড়া আমানি উৎসব, হালখাতা, গাজনের গান, গাঙ্গিখেলা, ঘোড়ার দৌড় ইত্যাদি গ্রামীণ অনুষ্ঠান বিভিন্ন অঞ্চলভেদে এখনো উদযাপিত হয়।
মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম, শেখ আবুল ফজল ইবনে মুবারক রচিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি প্রামাণিক দলিল। এ গ্রন্থে বিক্রমাদিত্য নামে একজন প্রাচীন ভারতীয় নরপতির নাম পাওয়া যায়। তার সিংহাসনারোহণের দিন থেকে তিনি একটি নতুন অব্দ প্রচলন করেছিলেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বের ৪০তম বর্ষে ওই সালটির ১৫১৭তম অব্দ চলছিল। ধারণা করা হয়, এই প্রাচীন সালটিই আমাদের বর্তমান বাংলা সনের উৎস।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তাদের মতে, বাংলা নববর্ষের সূচনা মুসলমানদের হাত ধরেই হয়েছিল এবং হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করেই বাংলা সনের উৎপত্তি। সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) শাসনামলে বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনকে মূলভিত্তি ধরে প্রথম বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৬১০ সালে যখন ঢাকাকে সর্বপ্রথম রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তখন রাজস্ব আদায় আর ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য পয়লা বৈশাখকে সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি তার বাসভবনের সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই পয়লা বৈশাখ আজও আমাদের কাছে অতুলনীয় আনন্দের একটি দিন।
তবে অন্য মতে, আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীর বাংলা সন প্রবর্তনের ভিত্তি ছিল শক বর্ষপঞ্জি বা শকাব্দ, সে পঞ্জিকা অনুসারে বাংলার ১২ মাস আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র, কিন্তু ৯৬৩ হিজরিতে ফতেহউল্লাহ সিরাজীর বর্ষপঞ্জি সংস্করণের সময় চন্দ্র সনের প্রথম মাস মহররম ছিল বাংলার বৈশাখ মাসে, তাই তখন থেকেই বৈশাখকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণনা শুরু হয়।
এখন যেমন বাংলা নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির। কারণ কৃষিকাজ ছিল বিশেষ ঋতুনির্ভর। ফসল বোনা, ফসলের সময়ভিত্তিক যত্ন বা পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ যাবতীয় কৃষিকাজ বাংলা সন-তারিখ পঞ্জিকা অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা হতো। বাংলার গ্রামগঞ্জে অনুষ্ঠিত হরেক রকম মেলার দিন-তারিখও নির্ধারিত ছিল বাংলা সনের সঙ্গে। শুধু ফসল আর উৎসব নয়, বাঙালি কৃষকের পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্ম, বিবাহ, জন্মমৃত্যুসহ জীবনের সব বিষয়েই বাংলা সন ছিল একক ও অনন্য।
সম্রাট আকবরের আমল থেকেই নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে কিছু উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, যাকে রাজপুণ্যাহ্ বা রাজকর আদায়ের উৎসবও বলা যায়। তখন প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে ফেলে আসা বছরের বকেয়া খাজনা মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকতেন এবং জমিদারের কাচারি থেকে নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। ভূস্বামী ও জমিদাররা এই দিনটিতে প্রজাদের নিয়ে পুণ্যাহ করতেন। সেই আমলে রাজপুণ্যাহ আর নববর্ষ ছিল সমার্থক। তাই জমিদাররা পরের দিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানোর সঙ্গে সঙ্গে গান-বাজনা, যাত্রা, মেলা প্রভৃতি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রকৃতপক্ষে তাদের অর্থশোক ভোলানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথার বিলোপ হলে সেই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় পয়লা বৈশাখের এই রাজপুণ্যাহ উৎসব। শুধু রয়ে যায় খাওয়া-দাওয়া আর উৎসবের অংশটুকু তবে সেই যুগের রাজপুণ্যাহ যে বর্তমান হালখাতা হিসেবে আজও বাঙালির জীবনে অমলিন হয়েই রয়ে গেছে, তা তো এখন বলাই বাহুল্য। পরে সময়ের বিবর্তনে পয়লা বৈশাখ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলেমিশে আরও আনন্দময় ও উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে এবং সেই সঙ্গে বাংলা নববর্ষ প্রতিটি বাঙালির জীবনে কল্যাণ ও নবজীবনের প্রতীক হয়ে বছরের একটি শুভ ও কল্যাণময় দিন হিসেবেও উদযাপন হয়ে আসছে।
বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিস্টীয় সালের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সাল চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সাল সূর্যের আবর্তনের হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরি সালে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যাকালে নতুন চাঁদের আগমনে। খ্রিস্টীয় তারিখ শুরু হয় মধ্যরাতে। আর বাংলা সনের দিন শুরু হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্তমান পরিচিতি পাওয়া পান্তা-ইলিশ খাওয়া বাঙালির পয়লা বৈশাখের উৎসব।
পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এর আগে দেশে উৎসবের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নানা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে দেখা গেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। এ বছর অবশ্য নাম হচ্ছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসবে। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে দেশের মানুষ।
পরিশেষে বলা যায়, সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত ও যুগোপযোগী বাংলা সন নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গৌরবের। আর বাঙালি জাতি হিসেবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে চির জাগরূক থাকুক।